মিডল ইস্ট মনিটরের প্রতিবেদন
ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পকে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে ইসরাইল
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে কয়েক দিনের টানা বোমা হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিল ইসরাইল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাধায় সেই অভিযান পিছিয়ে দেওয়া হয়। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে হামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। কিন্তু এতে যুদ্ধের পরিকল্পনা বাতিল হয়নি, বরং হামলার সময়সূচি পরিবর্তন হয়েছে মাত্র।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ইরান যুদ্ধের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কি ওয়াশিংটনের হাতে, নাকি নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে যুদ্ধের গতি নির্ধারণ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল?
গত ২১ অক্টোবর ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ১০ অক্টোবরের সপ্তাহান্তে ইরানের বিরুদ্ধে কয়েক দিনব্যাপী বোমা হামলার প্রস্তুতি নিতে সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
প্রস্তাবিত হামলায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, পারমাণবিক স্থাপনা এবং ইরানের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা ছিল। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ অভিযানের তুলনায় এবারের হামলা আরও তীব্র হওয়ার কথা ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের আপত্তিতে অভিযানটি পিছিয়ে দেওয়া হলেও বাতিল করা হয়নি। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একজন ব্যক্তি বলেন, হয় চুক্তি হবে, নয়তো হামলা হবে। অর্থাৎ, কূটনৈতিক সমাধান না হলে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা এখনো রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সম্প্রতি নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করতে ইসরাইল সফর করেন। এ সময় ইসরাইলি কর্মকর্তারা নতুন করে লক্ষ্যবস্তুর তালিকা উপস্থাপন করেন। এতে বছরের শুরুর দিকের হামলায় আঘাত না করা বেসামরিক অবকাঠামোও অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচন ঘিরে হামলার সময়সূচি
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ ইসরাইলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন। তবে সমালোচকদের মতে, হামলা সাময়িকভাবে পিছিয়ে দেওয়া আর যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করা এক বিষয় নয়। ট্রাম্পের আপত্তি মূলত ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগের সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ। যুদ্ধের লক্ষ্য নির্ধারণ, সমাপ্তির সময়সীমা ঘোষণা কিংবা কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট পরিবর্তন আসেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে নিবন্ধটিতে মন্তব্য করা হয়েছে। নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। দেশটিতে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম ৪ দশমিক ২৮ ডলারে পৌঁছেছে, যা এক বছর আগের তুলনায় ১ দশমিক ২০ ডলার বেশি। নিবন্ধ অনুযায়ী, নিবন্ধিত ভোটারদের অর্ধেক জীবনযাত্রার ব্যয়কে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্পের জনসমর্থনও নেমে এসেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন ৩১ শতাংশে।
তবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, আরও বিস্তৃত করা কিংবা বন্ধ করার বিষয়ে ভোটারদের সরাসরি সিদ্ধান্ত জানানোর সুযোগ নেই। ফলে নির্বাচনটি এমন এক যুদ্ধের ব্যবস্থাপকদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিণত হয়েছে, যার বিষয়ে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়া হয়নি।
রাজনৈতিক স্বার্থে যুদ্ধের লাগাম
যুদ্ধের বিষয়ে নিজেদের ভূমিকা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে মার্কিন কংগ্রেসও। প্রতিনিধি পরিষদ তিনবার যুদ্ধক্ষমতা-সংক্রান্ত প্রস্তাব পাস করেছে। সিনেটও দশম প্রচেষ্টায় একটি প্রস্তাব অনুমোদন করে। কিন্তু ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনার পরের দিনই রিপাবলিকান সিনেটররা অবস্থান পরিবর্তন করেন বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও হামলার সময় নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে। দেশটিতে ২৭ অক্টোবর নির্বাচন হওয়ার কথা। নেতানিয়াহু বলেছেন, নির্বাচনের আগে আগাম হামলা চালানো ‘অসুবিধাজনক’ হবে। ইসরাইলি ভাষ্যকারদের বরাতে নিবন্ধে বলা হয়েছে, নির্বাচনের শেষ সময়ে সামরিক অভিযান শুরু হলে তার দল লিকুদ ক্ষমতা হারাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
অর্থাৎ, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকানদের আসন রক্ষায় হামলা পিছিয়ে দিতে চাইছেন, আর নেতানিয়াহু নিজের দলের নির্বাচনি স্বার্থ বিবেচনায় সময় নির্ধারণ করছেন। যুদ্ধ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত থেকে নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক সময়ের অপেক্ষা থেকেই এই বিরতি এসেছে বলে নিবন্ধটির বিশ্লেষণ।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে পরবর্তী পদক্ষেপ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নির্বাচন শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিই হবে বড় পরীক্ষা। হামলা পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যদি কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করে, তাহলে ট্রাম্পের পদক্ষেপের বাস্তব তাৎপর্য থাকবে। কিন্তু নতুন লক্ষ্যবস্তুর তালিকা অনুযায়ী যদি আবারও হামলা শুরু হয়, তাহলে পরিবর্তন হবে শুধু সময়সূচিতে।
নিবন্ধটির মূল বক্তব্য হলো, কোনো যুদ্ধ সাময়িকভাবে পিছিয়ে দেওয়াই স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রমাণ নয়। বরং যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, কোন শর্তে শেষ হবে এবং সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে কী যুক্তি দেওয়া যাবে, সেটিই প্রকৃত নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা।
মূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর

-6adb6b847fdc2.jpg)
