নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষুব্ধ ‘একসময়ের বন্ধু’ বেন-গভির
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গাদি আইজেনকোটের সঙ্গে ‘ঐক্য সরকার’ গঠনের পরিকল্পনার অভিযোগ তুলে তীব্র সমালোচনা করেছেন দেশটির উগ্র ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। এমন সরকার গঠিত হলে তা ইসরাইলের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
দ্য জেরুজালেম পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেন-গভির বলেন, ‘নেতানিয়াহু আইজেনকোট এবং আরও কয়েকজন নেতাকে নিয়ে ঐক্য সরকার গঠন করতে চান। এতে হয়তো বিশ্বের কিছু মানুষের কাছে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো মনে হবে। কিন্তু বাস্তবে এটি ইসরাইলের কোনো উপকারে আসবে না। বরং ইসরাইলের ক্ষতি করবে।’
পরবর্তী সরকার গঠনের পরিকল্পনা এবং বেন-গভিরের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে এ মন্তব্য করলেন তিনি।
রোববার বেন-গভির অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে পরবর্তী সরকারে তাকে রাখা হবে না। তবে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এ ছাড়া নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন, বেন-গভিরকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হবে না। অথচ এ পদে বসার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছেন জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী।
বেন-গভিরের উগ্র ডানপন্থি দল ওতজমা ইয়েহুদিত নেতানিয়াহুর জোট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, পরবর্তী নেসেট নির্বাচনে দলটি প্রায় আটটি আসন পেতে পারে।
ডানপন্থি সরকার চান বেন-গভির
বেন-গভির বলেন, ‘আমরা এমন সরকার চাই না, যেখানে দুই পক্ষের মধ্যে সমানভাবে বিভক্তি থাকবে। সরকারকে যেকোনো একটি দিকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা রাখতে হবে। আমি ডানপন্থি সরকার চাই।’
তবে সাম্প্রতিক অধিকাংশ জনমত জরিপে দেখা গেছে, আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট কিংবা বিরোধী জোট কোনোটিই এককভাবে ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারছে না।
এ পরিস্থিতিতে কীভাবে সরকার গঠন সম্ভব, জানতে চাইলে আরেকটি ডানপন্থি সরকার গঠনের বিষয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন বেন-গভির। তার মতে, নির্বাচনের দিন ভোটারদের উপস্থিতি বাড়াতে পারলে নেতানিয়াহুর জোট নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে।
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা সরকার গঠন করতে পারব। এ জন্য আমাদের সব ভোটারকে ভোট দিতে কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।’
নেতানিয়াহুর সঙ্গে মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনের পর তাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান বলে জানিয়েছেন বেন-গভির। তার মতে, আইজেনকোটের সঙ্গে জোট গঠনের পরিবর্তে নেতানিয়াহুর উচিত তার পাশে দাঁড়ানো।
বেন-গভির বলেন, ‘আমি নেতানিয়াহুকে অনেক ভালোবাসি। আমি চাই না আইজেনকোট প্রধানমন্ত্রী হোন।’
তিনি আরও বলেন, ‘নেতানিয়াহুকে ডানপন্থিদের সঙ্গে থাকতে হবে এবং পুরোপুরি ডানপন্থি সরকার গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। একমাত্র এভাবেই আমরা ইসরাইল রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে পারব।’
আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটের বিরোধী বেন-গভির
কোন দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের ক্ষেত্রে তার আপত্তি রয়েছে, জানতে চাইলে প্রথমেই আরব দল রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের সমালোচনা করেন বেন-গভির। তিনি দাবি করেন, দল দুটি ‘সন্ত্রাসীদের পক্ষ নেয়’ এবং ইসরাইলের ক্ষতি করতে চায়।
বিরোধী জোটের অন্য নেতাদের সঙ্গেও সরকার গঠনের বিরোধিতা করেন তিনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের মতো নেতাদের সঙ্গে জোট করলেও তা দেশের ক্ষতি করবে বলে মন্তব্য করেন বেন-গভির।
তবে অতি-গোঁড়া ইহুদি বা হারেদি সম্প্রদায়ের দল শাস এবং ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের (ইউটিজে) সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা এখনো দেখছেন তিনি। হারেদিদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের প্রশ্নে সাম্প্রতিক মতবিরোধ সত্ত্বেও দল দুটিকে সম্ভাব্য জোটসঙ্গী হিসেবে বিবেচনা করছেন বেন-গভির।
বেন-গভিরের বক্তব্যকে প্রায়ই চরমপন্থি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে এমন বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে ভূমিকা রেখেছে বলে বিরোধীরা মনে করেন। এ ছাড়া তার সরকারের মেয়াদে, বিশেষ করে আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে অপরাধের হার বেড়ে যাওয়ার বিষয়েও সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হলে সেনাবাহিনীতে পরিবর্তন আনতে চান
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে বেন-গভির বলেন, ‘পুলিশের ক্ষেত্রে আমি যা করেছি, ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) ক্ষেত্রেও তা করতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘আমি যদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হই, তাহলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ভেঙে দিতে পারব, ফিলিস্তিনিদের অভিবাসনে উৎসাহিত করতে পারব, বর্তমানে সেনাবাহিনীতে যোগ না দেওয়া অনেক হারেদিকে নিয়োগ দিতে পারব এবং সামরিক অভিযানের নিয়ম পরিবর্তন করতে পারব বলে বিশ্বাস করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে আমি অনেক কিছু করতে চাই। এ কারণেই আমি এ পদের জন্য নিজের প্রার্থিতা সামনে আনতে চাই।’
সামরিক বাহিনীতে চাকরি না করার কারণে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা নিয়ে যে সমালোচনা রয়েছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে ৭ অক্টোবরের আগেই হামাস সম্পর্কে সতর্ক করার বিষয়টি তুলে ধরেন বেন-গভির।
তিনি বলেন, ৭ অক্টোবরের আগে যখন আমি গাজায় বোমা হামলা চালানোর কথা বলেছিলাম, তখনও আমাকে ঠিক একই কথা বলা হয়েছিল। কক্ষে বসে থাকা সব জেনারেল আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনি বোঝেন না। আপনি সেনাবাহিনীতে চাকরি করেননি। আমরা হামাসকে বুঝি। হামাস শান্তি চায়, উত্তেজনা কমাতে চায়। হামাস শুধু নিজের অর্থনীতি গুছিয়ে নিতে চায়। আপনি বোঝেন না, কারণ আপনি সেনাবাহিনীতে চাকরি করেননি।’
বেন-গভির বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, আমি সঠিক ছিলাম আর সব জ্যেষ্ঠ জেনারেল ভুল ছিলেন।’
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের ভাবমূর্তি নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে বেন-গভির বলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হলে সমালোচকদের তিনি প্রশ্ন করবেন, তাদের নিজ নিজ দেশে একই ধরনের হুমকি দেখা দিলে তারা কী করতেন।
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, শেষ পর্যন্ত যেকোনো ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করার মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আপনার নিজের দেশে এমন ঘটনা ঘটলে আপনি কি তা মেনে নিতেন?’
এই কট্টর ডানপন্থি নেতা বলেন, ‘আপনার সীমান্তে হামাস অবস্থান করবে, আপনাকে ধ্বংস করতে আসবে, আপনাকে হত্যা করতে চাইবে, আপনার শিশুদের মেরে ফেলতে চাইবে, আর আপনি তা মেনে নেবেন? যেকোনো দেশের নেতা বলবেন, না, আমি এটা মেনে নেব না। তাহলে আমরা কেন তা মেনে নেব?’
এ সময় যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন বেন-গভির। তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাসভবনে তিনি ‘উষ্ণ অভ্যর্থনা’ পেয়েছেন। এ ছাড়া ইসরাইলে অবস্থানরত মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ রয়েছে।
বেন-গভির বলেন, ‘আমি মনে করি, অনেক কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত আমার বক্তব্য বুঝতে পারেন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জিহাদিদের বিরুদ্ধে, আইএসের বিরুদ্ধে এবং যারা আমাদের ঘৃণা করে ও ধ্বংস করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি, এ বিষয়ে একটি উপলব্ধি রয়েছে।’ সূত্র: জেরুজালেম পোস্ট



