অক্সিজেন নেই, জ্বালানি নেই, বন্ধ ইনকিউবেটর— বিপর্যয়ে ইয়েমেনের হাসপাতাল
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইয়েমেনের অবরুদ্ধ তাইজ শহরে জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে হাসপাতালগুলো। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, একটি হাসপাতালে নবজাতকদের জন্য ব্যবহৃত ইনকিউবেটরের সংখ্যা ৪০টি থেকে কমিয়ে মাত্র ১০টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। এতে অকালজাত ও অসুস্থ শিশুদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে অক্সিজেন, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকটও তীব্র হচ্ছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
তাইজের ইয়েমেনি-সুইডিশ হাসপাতালের নবজাতক পরিচর্যা বিভাগের নার্স নাদা আহমেদ বলেন, ‘অক্সিজেন নেই, ইনকিউবেটর চালানোর জ্বালানি নেই, শিশুদের উষ্ণ রাখারও ব্যবস্থা নেই।’
বিভাগটির তত্ত্বাবধায়ক নওয়াল নাজিব সতর্ক করে বলেন, জ্বালানি সরবরাহ না এলে হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে নবজাতকদের মৃত্যু ও স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৩ অক্টোবর থেকে তাইজ শহরটি অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুতি আন্দোলনের মধ্যে সংঘর্ষ বেড়ে যাওয়ায় মানবিক সহায়তা প্রবেশ এবং বেসামরিক মানুষের শহর ছাড়ার পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তাইজ-আদেন করিডরসহ গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ বন্ধ থাকায় খাদ্য, পানি ও জ্বালানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে বাস্তুচ্যুত আড়াই লাখ মানুষের প্রায় অর্ধেকই তাইজ শহরে আশ্রয় নিয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেয়ার জানান, তাইজ শহরের ৪২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জ্বালানি, অক্সিজেন, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
রয়টার্সকে স্থানীয় গাড়িচালক আবদুল্লাহ আল-রাদফানি জানান, শহরে প্রতি লিটার জ্বালানির দাম বেড়ে দুই হাজার ইয়েমেনি রিয়ালে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। অক্সফাম ইয়েমেনের নীতি ও গণমাধ্যমবিষয়ক ব্যবস্থাপক ফাতমা জাফর শোতাহ জানান, এক কিডনি রোগীকে নিয়মিত যাতায়াতের খরচ বহন করতে না পেরে চিকিৎসাকেন্দ্রেই দুই রাত থাকতে হচ্ছে। আগে যাতায়াতে যেখানে প্রায় আধা ডলার খরচ হতো, এখন তা বেড়ে প্রায় ১০ ডলারে পৌঁছেছে।
তাইজের বাইরেও একই সংকট ছড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা মেডিসিনস স্যানস ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় আদেন ও লাহিজ প্রদেশের হাসপাতাল এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে অস্ত্রোপচারকক্ষ ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি খাদ্যাভাব ও অপুষ্টিও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, তাইজ ও আশপাশের এলাকায় আট লাখের বেশি মানুষ খাদ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) মুখপাত্র রিকার্ডো পিরেস জানান, চলতি বছরে তাইজে পরীক্ষা করা এক লাখ ৬৮ হাজার শিশুর মধ্যে ৫২ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। তাদের মধ্যে ১১ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি শিশু গুরুতর তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত।
ইউনিসেফ প্রায় আট হাজার কার্টন জীবনরক্ষাকারী বিশেষ পুষ্টিকর খাবার মজুত করেছে। সংস্থাটির হিসাবে, এসব খাবার দিয়ে প্রায় তিন মাস চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো সম্ভব। তবে নিরাপত্তাহীনতা ও চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে ভবিষ্যতে এসব খাবার সরবরাহ এবং অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এমএসএফ জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিম উপকূলের লড়াই থেকে পালিয়ে আসা পরিবারগুলোর কারণে দক্ষিণ ইয়েমেনে শিশুদের অপুষ্টির পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত আদেন ও লাহিজে সংস্থাটির ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৯৯ শিশুর পুষ্টি পরীক্ষা করা হয়। তাদের মধ্যে ৪৪ শিশু বা ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ মাঝারি মাত্রার তীব্র অপুষ্টিতে এবং ২৮ শিশু বা ৯ দশমিক ৪ শতাংশ গুরুতর অপুষ্টিতে ভুগছিল। গুরুতর অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে চিকিৎসা প্রয়োজন।
এমএসএফের ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্য কার্যক্রমের ব্যবস্থাপক সারা ঘানেম বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন যে স্থানেই যাই, সেখানে অন্তত এক বা দুই শিশুকে গুরুতর তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত অবস্থায় দেখতে পাই।’

-6ae0682f69469.jpg)