কৃষ্ণসাগরে যুদ্ধবিরতি
যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও মিসরের পর এবার কি সফল হবে ভারত?
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তাপ কমাতে জ্বালানি স্থাপনা, কৃষ্ণসাগরের বন্দর ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধের প্রস্তাব দিয়েছে ভারত।
ইউক্রেনের মতে, আলোচনায় থাকা চারটি উদ্যোগের মধ্যে নয়াদিল্লির প্রস্তাবই সবচেয়ে বিস্তৃত। তবে মস্কো ও কিয়েভকে একই শর্তে রাজি করানোই হবে ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে সীমিত সময়ের জন্য যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নিয়েছে ভারত।
দেশটির প্রস্তাবে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ, কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য ও জ্বালানি পরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের কিয়েভ সফরের সময় ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। উদ্যোগটি সফল হলে যুদ্ধের তীব্রতা কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পথ তৈরি হতে পারে।
ভারতের উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে ইউক্রেন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেছেন, আলোচনায় থাকা চারটি প্রস্তাবের মধ্যে ভারতের উদ্যোগটি সবচেয়ে বিস্তৃত।
তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, জ্বালানি স্থাপনা ও কৃষ্ণসাগরকেন্দ্রিক একটি সমন্বিত যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছে কিয়েভ।
প্রস্তাবটির বিশেষত্ব হলো, এতে শুধু সামরিক সংঘাত বন্ধের বিষয়টি নয়, যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জ্বালানি স্থাপনা ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করা গেলে দুই দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারও উপকৃত হতে পারে।
তবে ইউক্রেনের ইতিবাচক মনোভাবই প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। রাশিয়ার সম্মতি এবং যুদ্ধক্ষেত্রে উভয় পক্ষের অবস্থানই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে উদ্যোগটির ভবিষ্যৎ।
ভারতের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে রাশিয়াও। তবে ক্রেমলিনের অবস্থান, যেকোনো সমঝোতার লক্ষ্য হতে হবে ‘টেকসই ও ন্যায্য শান্তি’। মস্কোর দৃষ্টিতে, স্বল্প সময়ের জন্য যুদ্ধ বন্ধ করলেই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের সমাধান হবে না।
রাশিয়ার কর্মকর্তারা আগেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যুদ্ধবিরতির সুযোগে ইউক্রেন নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে এবং নতুন অস্ত্র সংগ্রহ করতে পারে। ফলে শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে রাজি করানো কঠিন হতে পারে মস্কোকে।
এখানেই ভারতের কূটনৈতিক উদ্যোগের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। একদিকে ইউক্রেনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ, অন্যদিকে রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য—দুইয়ের মধ্যে গ্রহণযোগ্য সমঝোতা তৈরি করা সহজ হবে না।
কেন কৃষ্ণসাগর এত গুরুত্বপূর্ণ?
কৃষ্ণসাগর আন্তর্জাতিক শস্য ও জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এই পথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে খাদ্যপণ্য পরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। বিশেষ করে ইউক্রেন থেকে শস্য রপ্তানি ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে খাদ্যের সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
একইভাবে, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা তেল ও অন্যান্য জ্বালানির উৎপাদন এবং সরবরাহব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে, বাড়ে পরিবহন ব্যয় এবং তৈরি হয় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
ভারতের মতো দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির জন্য এসব ঝুঁকি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে উন্নীত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্বাভাবিক থাকা নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি সম্পর্কও বড় বিবেচনা
ভারতের এই উদ্যোগের পেছনে দেশটির জ্বালানিস্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া ভারতের অপরিশোধিত তেলের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি বাণিজ্য বাড়ায় যুদ্ধের কারণে উৎপাদন, পরিশোধন ও পরিবহনে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে তার প্রভাব ভারতের অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এবং পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। এ প্রেক্ষাপটে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে পরিশোধিত জ্বালানির বাণিজ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি সীমিত করা গেলে ভারতের জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজেদের ভূমিকা বাড়াতে পারে নয়াদিল্লি।
যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও মিসরের উদ্যোগ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও মিসরও বিভিন্ন সময়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে। তবে দেশগুলোর অগ্রাধিকার এক নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম উদ্বেগ বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহের স্থিতিশীলতা। তুরস্কের কাছে কৃষ্ণসাগর দিয়ে নিরাপদে জাহাজ চলাচল এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সচল রাখা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, মিসরের জন্য ইউক্রেন থেকে শস্য আমদানি ও খাদ্যনিরাপত্তা বড় বিবেচ্য বিষয়।
ভারতের প্রস্তাবে এসব স্বার্থের পাশাপাশি জ্বালানি স্থাপনা এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তাকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে খাদ্য সরবরাহ, জ্বালানি বাণিজ্য ও সমুদ্রপথে পরিবহনের ক্ষেত্রে একাধিক পক্ষ লাভবান হতে পারে।
তবে আগের উদ্যোগগুলো প্রত্যাশিত ফল না দেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, অর্থনৈতিক স্বার্থের মিল থাকলেই যুদ্ধরত পক্ষগুলো সহজে সমঝোতায় পৌঁছায় না। সামরিক লক্ষ্য ও নিরাপত্তার প্রশ্নগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সফল হওয়ার পথে বড় বাধা
ভারতের প্রস্তাবের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা রাশিয়া ও ইউক্রেনের পারস্পরিক অবিশ্বাস। দুই পক্ষই নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়েছে বলে মনে করে না। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে চাপ বজায় রেখে আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা অব্যাহত থাকতে পারে।
এ অবস্থায় সীমিত সময়ের যুদ্ধবিরতি নিয়ে সমঝোতা হলেও তা কত দিন কার্যকর থাকবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। হামলা বন্ধের শর্ত কী হবে, কোন স্থাপনাগুলো এর আওতায় আসবে, লঙ্ঘনের অভিযোগ কীভাবে যাচাই করা হবে এবং চুক্তি ভাঙলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট সমঝোতা প্রয়োজন।
এ ছাড়া যুদ্ধবিরতি যেন কোনো পক্ষের সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানোর সুযোগে পরিণত না হয়, সে বিষয়েও নিশ্চয়তা চাইতে পারে রাশিয়া। অন্যদিকে, ইউক্রেনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবে নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার নিশ্চয়তা পাওয়া।
শেষ পর্যন্ত কি সফল হবে নয়াদিল্লি?
ভারতের উদ্যোগের গুরুত্ব রয়েছে, কারণ এটি যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনাকে শুধু ভূখণ্ড ও সামরিক অবস্থানের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে জ্বালানি, খাদ্য সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মতো অভিন্ন স্বার্থের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
জ্বালানি স্থাপনা, বন্দর ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করা সম্ভব হলে রাশিয়া ও ইউক্রেনের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিও উপকৃত হতে পারে। একই সঙ্গে দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভারতের অবস্থান আরও জোরালো হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে প্রস্তাবের ব্যাপ্তি যতই বড় হোক, বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সম্মতি, যুদ্ধবিরতির শর্ত এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ব্যবস্থার ওপর।
যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও মিসরের মতো দেশগুলোর উদ্যোগের অভিজ্ঞতাও দেখায়, যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানোর স্বার্থকে সামরিক ও রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে তোলা কঠিন।
তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মস্কো ও কিয়েভ কি সামরিক লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানোর স্বার্থেও সমঝোতায় রাজি হবে? সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে কৃষ্ণসাগরে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় ভারতের উদ্যোগ কতটা সফল হয়।
