ইসরাইলে ফিলিস্তিনি নাগরিক, কারা তারা? কী ধরনের নিপীড়ন সইতে হয়
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসরাইলে মোট জনসংখ্যার প্রায় এক পঞ্চমাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক। দেশটির নাগরিকত্ব থাকলেও কয়েক দশক ধরে বৈষম্য, প্রান্তিকীকরণ ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন তারা। আবাসন, ভূমির অধিকার, শিক্ষা ও সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের পাশাপাশি তাদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে সহিংস অপরাধ ও পুলিশের অপর্যাপ্ত সুরক্ষার মতো সমস্যা।
১৯৪৮ সালে ইসরাইলের প্রতিষ্ঠার সময় ফিলিস্তিনিদের একটি বড়ো অংশ বাস্তুচ্যুত হন। ওই সময় মাতৃভূমিতে থেকে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের বংশধরদেরই বর্তমানে ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাদের পূর্বপুরুষদের অনেকেই ফিলিস্তিনিদের কাছে নাকবা বা মহাবিপর্যয় হিসেবে পরিচিত ওই সময়ের সহিংসতা ও উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন।
বর্তমানে ইসরাইলে ফিলিস্তিনি নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। ইসরাইলি নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় দমন পীড়নের অভিযোগ তুলে আসছেন।
অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভ করতে গিয়েও তাদের অনেকে পুলিশি সহিংসতা ও গ্রেফতারের শিকার হয়েছেন।
এ পরিস্থিতির মধ্যেও সমান নাগরিক ও রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়েছেন ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন আন্দোলনেও যুক্ত হয়েছেন তারা।
নিজ মাতৃভূমিতেই সংখ্যালঘু
১৯৪৭ সালের আগে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন ফিলিস্তিনি আরবরা। বর্তমানে এই ভূখণ্ডের মধ্যে রয়েছে ইসরাইল, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা।
১৯৪৭ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় ইহুদিবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং পরবর্তী সময়ে দখলদ্বার ইসরাইলি বাহিনীর অভিযানে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হন। ধ্বংস করা হয় শত শত গ্রাম। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হন ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০ শতাংশ।
১৯৪৯ সালে প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে দখলদ্বার ইসরাইলের যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। এর মধ্যে ইসরাইল ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের প্রায় ৭৮ শতাংশ ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
বর্তমান ইসরাইলের ভূখণ্ডে তখন প্রায় দেড় লাখ ফিলিস্তিনি থেকে যান। তাদের কেউ কেউ ইসরাইলি বাহিনী পৌঁছানোর আগেই নিজেদের এলাকায় অবস্থান করছিলেন। অন্যরা উচ্ছেদের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
তবে থেকে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের প্রায় এক-চতুর্থাংশও নিজ এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত হন। তাদের অনেককে ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্রাম কিংবা পরিত্যক্ত বাড়িঘরে ফিরতে দেওয়া হয়নি।
বর্তমানে ইসরা ইলের প্রায় এক কোটি জনসংখ্যার মধ্যেফিলিস্তিনি নাগরিকদের অংশ প্রায় ২০ শতাংশ। তারা মূলত উত্তরাঞ্চলের গ্যালিলি, মধ্যাঞ্চলের ট্রায়াঙ্গল এবং দক্ষিণের নেগেভ মরুভূমির বিভিন্ন শহর ও জনপদে বসবাস করেন। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ মুসলিম, ১০ শতাংশ খ্রিষ্টান এবং ১০ শতাংশ দ্রুজ সম্প্রদায়ের।
ইসরাইলি রাষ্ট্র ও সমাজের বড় একটি অংশ তাদের ইসরাইলি আরব বা ইসরাইলের আরব নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেয়। তবে তাদের অনেকে নিজেদের ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিক, ‘১৯৪৮ সালের ফিলিস্তিনি’ কিংবা ‘ইসরাইলের অভ্যন্তরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। এর মাধ্যমে তারা ইসরাইলের নাগরিকত্বের পাশাপাশি নিজেদের ফিলিস্তিনি পরিচয়ও তুলে ধরেন।
সামরিক শাসন ও প্রতিরোধ
১৯৪৮ সালের পর ইসরাইলের নাগরিকত্ব পেলেও ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সন্দেহের চোখে দেখত দেশটির প্রাথমিক সরকারগুলো। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তাদের ওপর সামরিক শাসন জারি ছিল। অন্যদিকে ইহুদি নাগরিকেরা বেসামরিক আইনের অধীনে পরিচালিত হতেন।
ওই সময় ফিলিস্তিনি নাগরিকদের চলাচলে বিধিনিষেধ, কারফিউ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখোমুখি হতে হয়।
এই সময়ের অন্যতম নৃশংস ঘটনা কাফর কাসিম হত্যাকাণ্ড। ১৯৫৬ সালের ২৯ অক্টোবর ফিলিস্তিনি গ্রাম কাফর কাসিমে হঠাৎ কারফিউয়ের সময় এগিয়ে আনে ইসরাইলি বাহিনী। গ্রামের বাইরে কাজ করতে যাওয়া অনেক বাসিন্দা এ পরিবর্তনের খবর জানতেন না।
কারফিউ অমান্যকারীদের গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয় সেনাদের। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় গ্রামের প্রবেশমুখে তাদের থামিয়ে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নারী ও শিশুসহ ৪৯ জন ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হন।
১৯৬৬ সালে সামরিক শাসনের অবসান ঘটে। পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দখলদ্বার ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। বিশেষ করে ১৯৬৭ সালে ইসরাইল পশ্চিম তীর গাজা উপত্যকা দখল করার পর এ সম্পর্ক জোরদার হয়।
বৈষম্যমূলক আইন ও অপরাধের সংকট
রাষ্ট্রীয় সহিংসতার পাশাপাশি কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন বৈষম্যমূলক আইন ও নীতিরও শিকার হচ্ছেন ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা। ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা হাইফাভিত্তিক আইনি সংস্থা আদালাহর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালের পর ইসরাইলে প্রণীত ৬৫টিরও বেশি আইন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। এসব আইন ভূমির মালিকানা, আবাসন, সরকারি অর্থায়ন ও পরিবার পুনর্মিলনের মতো বিষয়কে প্রভাবিত করে।
১৯৫০ সালে প্রণীত অ্যাবসেন্টিজ প্রপার্টি ল বা অনুপস্থিত ব্যক্তিদের সম্পত্তি আইন এর অন্যতম উদাহরণ। ১৯৪৮ সালের নাকবার সময় বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়া, পালিয়ে যাওয়া কিংবা জোরপূর্বক উচ্ছেদ হওয়া ফিলিস্তিনিদের এ আইনে অনুপস্থিত ব্যক্তি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। তাদের জমি, বাড়িঘর ও অন্যান্য সম্পত্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। এমনকি পরে ইসরাইলের নাগরিক হওয়া কিছু ফিলিস্তিনির সম্পত্তিও এর আওতায় পড়ে।
২০০৩ সালে দখলদ্বার ইসরাইল এমন একটি আইন পাস করে, যার মাধ্যমে ইসরাইলের নাগরিকদের সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকার বাসিন্দাদের বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে পরিবার পুনর্মিলনের সুযোগ সীমিত করা হয়।
২০১১ সালের আরেকটি আইনে নির্দিষ্ট কিছু কৃষিভিত্তিক ও ছোট জনপদের ভর্তি কমিটিকে সেখানে বসবাসের আবেদনকারীদের মূল্যায়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়। সমালোচকদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট জনপদের ইহুদিবাদী-ইহুদি চরিত্রের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিবেচনা করে আবেদন প্রত্যাখ্যানের সুযোগ থাকায় আইনটি ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতি বৈষম্যের পথ তৈরি করেছে।
২০১৮ সালে ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেট ইহুদি জনগণের জাতিরাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইল শীর্ষক মৌলিক আইন পাস করে। এতে ইসরাইলে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার শুধু ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত করা হয়। পাশাপাশি আরবি ভাষার মর্যাদা সরকারি ভাষা থেকে কমিয়ে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ভাষায় নামিয়ে আনা হয়। ইহুদি বসতি স্থাপনকেও রাষ্ট্রের উৎসাহিত করার মতো একটি জাতীয় মূল্যবোধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
আইনগত বৈষম্যের পাশাপাশি ফিলিস্তিনি জনপদগুলোতে সংগঠিত অপরাধ ও সহিংস হত্যাকাণ্ডের সংকটও ক্রমেই গভীর হচ্ছে। ফলে নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও সমান অধিকার, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছেন ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই



