যোগাযোগমাধ্যমে বিয়ের দাওয়াত, গাড়ি-ফ্রিজ-খাবার নিয়ে হাজির হাজারো মানুষ
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:২৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চীনের এক তরুণের বিয়ের দাওয়াত পেয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজির হয়েছেন হাজার হাজার অপরিচিত মানুষ। কেউ এসেছেন খাবার নিয়ে, কেউ উপহার হিসেবে দিয়েছেন ফ্রিজ ও আসবাবপত্র। এমনকি নবদম্পতির জন্য গাড়ির ব্যবস্থাও করেছেন কেউ কেউ। পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনের অভাবে বিয়ের অনুষ্ঠান নিরানন্দ হয়ে যেতে পারে— এমন আশঙ্কা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উন্মুক্ত আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ২৪ বছর বয়সী ওই তরুণ। তার সেই আহ্বান ঘিরেই ঘটে যায় ব্যতিক্রমী ঘটনা।
চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশের ঝাওতং শহরের ইলিয়াং কাউন্টির বাসিন্দা শু চেংহং। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ‘শিয়াওশিয়াওশু’ নামে পরিচিত। চায়না নিউজ সার্ভিস ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিয়ের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করে নেটিজেনদের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান তিনি।
শুর বয়স যখন মাত্র তিন বছর, তখন তার বাবা মারা যান। দুই বছর পর মা দ্বিতীয় বিয়ে করলে বড় ভাইয়ের সঙ্গে দাদির কাছে বড় হতে থাকেন তিনি। পরে দাদিও মারা যান। পরিবারের অন্য সদস্যদের হারিয়ে দুই ভাই একে অপরের ওপর নির্ভর করে জীবন কাটান। অল্প বয়সেই পড়াশোনা ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে কাজে নামতে হয় শুকে। নানা ধরনের কাজ করে বিয়ের জন্য ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ ইউয়ান সঞ্চয় করেন তিনি।
প্রায় তিন বছর আগে অনলাইনে পরিচয় হয় তার বর্তমান স্ত্রীর সঙ্গে। জীবনের কঠিন সময়ে পাশে থাকার কারণে স্ত্রীকে নিয়ে নতুন জীবন শুরুর স্বপ্ন দেখছিলেন শু। কিন্তু বিয়ের আয়োজন সামনে আসতেই অতিথি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন তিনি। ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও বন্ধুদের নিয়ে অনুষ্ঠান করলে মাত্র দুই-তিনটি টেবিল পূর্ণ হবে বলে ধারণা করেছিলেন। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত মানুষদের বিয়েতে আমন্ত্রণ জানান।
শুর ধারণা ছিল, হয়তো ২০ জনের মতো অপরিচিত মানুষ তার আমন্ত্রণে সাড়া দেবেন। কিন্তু ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর হাজারো মানুষ বিয়েতে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। অনেকে কয়েক শ থেকে হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
অতিথিদের অনেকে শুধু শুভেচ্ছা জানাতেই আসেননি, বিয়ের আয়োজনেও সহযোগিতা করেছেন। কেউ নিয়ে আসেন শূকর, মাছ, সবজি ও অন্যান্য খাবার। কেউ উপহার দেন ফ্রিজ, খাবার গরম রাখার সরঞ্জাম, টেবিল ও চেয়ার। আবার কেউ বাড়ি সাজানো, কনের সাজসজ্জা এবং বিয়ের গাড়ির ব্যবস্থা করতে এগিয়ে আসেন।
হুনান প্রদেশের হুয়াইহুয়া শহর থেকে এক বিয়ের আয়োজক প্রায় ১২ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে এসে অনুষ্ঠানস্থল সাজানোর কাজে সহযোগিতা করেন। সিচুয়ান প্রদেশের এক কৃষক উপহার হিসেবে নিয়ে আসেন প্রায় ২০ হাজার ইউয়ান মূল্যের দুটি গরু। নবদম্পতির জন্য একটি বিলাসবহুল মেবাখ গাড়ির ব্যবস্থাও করেন এক শুভাকাঙ্ক্ষী বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অতিথির সংখ্যা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় স্থানীয় এলাকায় তৈরি হয় নানা ধরনের চাপ। আশপাশের হোটেল ও অতিথিশালাগুলোর কক্ষ পূর্ণ হয়ে যায়। রেস্তোরাঁগুলোতেও বাড়তে থাকে ক্রেতার সংখ্যা। অতিথিদের সামলাতে মূল অনুষ্ঠানস্থল থেকে আয়োজন সরিয়ে কাছের একটি বড় সাংস্কৃতিক চত্বরে নেওয়ার ব্যবস্থা করে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
সাংহাই ডেইলির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিয়ের ভোজে প্রায় দুই টন মুরগির মাংস রান্না করা হয়। অতিথিদের খাবার পরিবেশনের জন্য প্রায় ৫০টি রান্নার চুলা একটানা চালু ছিল। দেরিতে আসা অতিথিদেরও ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি; রাত ২টা পর্যন্ত তাদের খাবার পরিবেশন করা হয়।
অতিথির সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ভিন্ন তথ্য এসেছে। কিছু প্রতিবেদনে বিয়েতে ১০ হাজারের বেশি মানুষের উপস্থিতির কথা বলা হলেও ১ নভেম্বর শু নিজে জানান, তার বিয়েতে তিন হাজারের বেশি অতিথি এসেছিলেন।
ব্যতিক্রমী এই আয়োজন ঘিরে স্থানীয় পর্যটন খাতেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিথিরা যাতে বিয়েতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি আশপাশের দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে পারেন, সে বিষয়ে স্থানীয় সংস্কৃতি ও পর্যটন কর্তৃপক্ষ আলোচনা শুরু করেছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ এত বড় আয়োজনের পেছনে পরিকল্পিত প্রচারণা বা বিপণন কৌশল থাকতে পারে বলে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে অধিকাংশ ব্যবহারকারী অপরিচিত মানুষের প্রতি অন্যদের সহমর্মিতা ও সহযোগিতার প্রশংসা করেছেন।
এক নেটিজেন মন্তব্য করেছেন, ‘আমরা অপরিচিত হতে পারি, কিন্তু একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারি। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মানুষ পরিবারের সদস্য হয়ে উঠতে পারে।’
