জাপান ও চীনকে এক সুতোয় বেঁধে নতুন ভোরের পথে বাংলাদেশ
Advertisement
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম
ছবি: এআই দিয়ে নির্মিত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের হাত ধরে নতুন এক ভোরের প্রত্যাশায় দিন গুনছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক জাপান সফর কেবল কিছু চুক্তি সই কিংবা আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত স্বৈরাচারী শাসনের শিকল ভেঙে উঠে দাঁড়ানো একটি দেশের নতুন রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রকাশের স্পষ্ট বার্তা। জনগণের রায়ে নির্বাচিত একটি সরকারের জন্য পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, শক্তিশালী শিল্প খাত ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি বড় শক্তিগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই এ ক্ষেত্রে মুখ্য।
এ যাত্রায় জাপানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা-পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন থেকে শুরু করে মেট্রোরেল, ঢাকার বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপানের অবদান অনস্বীকার্য। জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকে স্বাক্ষরিত ‘বিগ-বি’ প্রকল্প বাংলাদেশকে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে জাপানি বেসরকারি খাতের সম্ভাব্য এক ট্রিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগের আশা প্রকাশ করা হয়েছে, যা প্রায় ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে দেশের শুল্ক ব্যবস্থা, লাইসেন্সিং ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো জরুরি।
টোকিওর সাথে সম্পর্কের এই নতুন উচ্চতা কিন্তু বেইজিংয়ের সাথে ঢাকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বে কোনো টানাপোড়েন তৈরি করবে না। চলতি বছরের জুনে চীনের সাথে স্বাক্ষরিত যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও চট্টগ্রামে শিল্প অঞ্চল গড়ে তোলার চুক্তিগুলো দেশের অর্থনীতির জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবতা হলো, অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতের মান বাড়লে তার সুফল সব ধরনের বিনিয়োগকারীই পাবেন—টাকা যে দেশ থেকেই আসুক না কেন। চাইনিজ সরঞ্জাম, জাপানি শিল্পপ্রযুক্তি এবং উদীয়মান বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের মেলবন্ধন দেশের বিকাশমান অর্থনীতিকে কেবল সমৃদ্ধই করবে।
অন্যদিকে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের আশ্রয় দান এবং নিজ ভূখণ্ড থেকে তার রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেওয়াকে কেন্দ্র করে ঢাকার সাথে নয়া দিল্লির সম্পর্কের টানাপোড়েন স্পষ্ট। একটি স্থায়ী বন্ধুত্ব কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা দলের সাথে নয়, বরং সে দেশের জনগণের সাথে গড়ে ওঠে। সমান অধিকার, পারস্পরিক বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে এই সম্পর্ক পুনরুদ্ধার এখন সময়ের দাবি।
বিগত ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি যেভাবে ভারতের প্রতি অতিরিক্ত ঝুঁকে ছিল, স্বৈরাচার-পরবর্তী এই নতুন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন সেটিকে পুনঃমূল্যায়ন করার দারুণ সুযোগ তৈরি করেছে। জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো চুক্তির স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং নতুন নতুন প্রকল্পের ফাঁদে না পড়ে বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। জাপানের সাথে কৌশলী অংশীদারিত্ব এবং চীনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে বাংলাদেশ যদি নিজের স্বার্থরক্ষা করতে পারে, তবেই এই নতুন ভোরের আলো দেশের সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে।
মতামত: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে অনূদিত।


