এলডিসি উত্তরণ পেছাল তিন বছর
রপ্তানিতে আপাতত স্বস্তি এলেও সামনে প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ
টেকসই উত্তরণের প্রস্তুতি নিতে হবে : অধ্যাপক আবু আহমেদ * সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য : বাংলাদেশ মিশন * এ সিদ্ধান্ত রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য বড় সাফল্য : বিজিএমইএ সভাপতি
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময় তিন বছর পিছিয়ে যাওয়ায় আপাতত বড় ধরনের বাণিজ্যিক চাপ থেকে স্বস্তি পেল বাংলাদেশ। তবে এই স্বস্তি সাময়িক। ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বরের মধ্যে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। এ কারণে বাড়তি তিন বছরকে সংস্কার বাস্তবায়ন ও অর্থনীতির ভিত শক্ত করার শেষ সুযোগ হিসাবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।
তাদের মতে, এলডিসি উত্তরণ থেকে পিছিয়ে থাকার আর সুযোগ নেই। ২০২৯ সালে বাংলাদেশকে উত্তরণ করতেই হবে। এ সময়ের মধ্যে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার সৃষ্টি, বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন, ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতের সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করা কঠিন হবে। এ প্রসঙ্গে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, তিন বছর পেছানোর এই স্বস্তি সাময়িক। ১০ বছর ধরে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু যখনই উত্তরণের সময় আসছে, তখনই পিছিয়ে যাচ্ছি। ২০২৯ সালের পর কী হবে, আমরা কোথায় যাব?
কতদিন স্বল্পোন্নত বা গরিব দেশ হিসাবে থাকব? আসলে এলডিসি উত্তরণের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই টিকে থাকতে পারি।
তিনি বলেন, উত্তরণের পরও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডাসহ কয়েকটি বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকবে। এগুলো কাজে লাগাতে হবে। ভিয়েতনাম এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ভালো করছে। বাংলাদেশও পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
জাতিসংঘে সর্বসম্মত অনুমোদন : বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়। ফলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত প্রস্তুতির সুযোগ পেল বাংলাদেশ। একই সময় পেয়েছে নেপালও। জি-৭৭ ও চীনের পক্ষে উরুগুয়ের প্রতিনিধি এ সংক্রান্ত খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি খলিলুর রহমান। এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে আরও তিন বছর সময় চেয়ে আবেদন করে। জাতিসংঘের উন্নয়ননীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) আবেদনটি পর্যালোচনা করে ইতিবাচক সুপারিশ দেয়। পরে ২১ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সাধারণ পরিষদে পাঠায়। এদিকে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এ সিদ্ধান্তকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসাবে দেখছে। মিশনের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়ানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং এলডিসি-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যসুবিধা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা হারানোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় বাড়তি সময় কাজে লাগাতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিকারকরা ৩৮টি দেশ ও বাণিজ্য জোটে এলডিসি হিসাবে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পাচ্ছেন। দেশের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৭৩ শতাংশ এ ধরনের বিশেষ বাণিজ্যসুবিধার আওতায় রয়েছে। উত্তরণ হলে বিভিন্ন বাজারে শুল্ক সুবিধা হারানোর কারণে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ শুল্কের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। বাড়তি প্রস্তুতিকাল পাওয়ায় আপাতত সেই ঝুঁকি থেকে স্বস্তি মিলেছে। তবে বাজারভেদে সুবিধা বহাল থাকার সময় ও শর্ত সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য অংশীদারের নিয়মের ওপর নির্ভর করবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত এ সিদ্ধান্তে স্বস্তি পেয়েছে। কারণ দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে এ খাত থেকে। তবে শুধু শুল্কমুক্ত সুবিধার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি, পরিবহণ, বন্দর ও লজিস্টিকস ব্যয় কমানো এবং পণ্যের মান ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এ সিদ্ধান্তকে রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য বড় সাফল্য হিসাবে দেখছেন। তিনি বলেন, এটি সবার সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো পদক্ষেপ ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও জাতিসংঘের মহাসচিবের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ চেয়ে চিঠি লিখেছেন। বেসরকারি খাত থেকেও আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারকে বিষয়টি বুঝিয়ে আসছিলাম। তিনি আরও বলেন, এখন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আগামী তিন বছরের মধ্যে সফল ও টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে হবে।
সংস্কার ও বাণিজ্য চুক্তিতে জোর : বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, বাড়তি তিন বছর কাজে লাগিয়ে সরকার বিনিয়োগ আকর্ষণ, স্থানীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং বন্দরের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেবে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ ও বাণিজ্য জোটের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার করাও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বাড়তি তিন বছর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে গতিশীলতা ও টেকসই সক্ষমতার সঙ্গে উত্তরণ নিশ্চিত করতে হবে। মসৃণ উত্তরণ কৌশলটি ভালো দলিল হলেও বাড়তি সময়ের প্রেক্ষাপটে এর কিছু বিষয় পুনর্বিবেচনা ও হালনাগাদ করা প্রয়োজন। পছন্দনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতানির্ভর অর্থনীতিতে যেতে হবে। ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করাও জরুরি। সব মিলিয়ে তিন বছর বাড়তি সময় পাওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ। কিন্তু এই সুযোগ কাজে লাগানোর সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। আগামী তিন বছরে সরকার ও বেসরকারি খাতকে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। লক্ষ্য হতে হবে শুধু এলডিসি থেকে উত্তরণ নয়, বরং শুল্কসুবিধা ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার মতো শক্তিশালী, বহুমুখী ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা।
