এতিম মেয়েদের ‘উকিল বাবা’ সাজ্জাদ পারভেজ
Advertisement
মনিকা চৌধুরী, বরিশাল
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাবা নেই, পরিবার নেই। সমাজের মূল স্রোত থেকেও তারা অনেক দূরে। কারও ঠাঁই হয়েছে পথে, কেউ আবার ভাসমান জীবন কাটিয়েছে। পরিবার ও সমাজের অবহেলায় তাদের অনেকেরই বিয়ে বা নতুন জীবন শুরুর সুযোগ ছিল না। সেই মেয়েদের জীবনে বাবা হয়ে পাশে দাঁড়ান সাজ্জাদ পারভেজ। শুধু বিয়ের আয়োজন করেই দায়িত্ব শেষ করেননি; বিয়ের সময় হয়েছেন ‘উকিল বাবা’। এরপর মেয়েদের সংসার কেমন চলছে, স্বামী-সন্তান কেমন আছে, বিপদে পড়লে কী প্রয়োজন-সব কিছুর খোঁজ রেখেছেন নিজ সন্তানের মতো।
২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৫ জন সুবিধাবঞ্চিত ও মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তিনি। প্রত্যেকের বিয়েতেই ছিলেন তাদের উকিল বাবা। বর্তমানে তিনি একটি আঞ্চলিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রের অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাজ্জাদ পারভেজ দীর্ঘদিন সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে (বর্তমানে সুরক্ষাবঞ্চিত মেয়েদের প্রশিক্ষণকেন্দ্র) ব্যবস্থাপক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানে কাজ করতে গিয়েই এসব মেয়েদের সঙ্গে বাবার মতো সম্পর্কের বন্ধন তৈরি হয়। সেই সম্পর্কের শুরু ইয়াসমিনকে দিয়ে। ইয়াসমিন ও খালেকের বিয়ে দেন তিনি। এরপর একে একে তানজিলা, রহিমা, বৃষ্টি, তামান্না, লামিয়াসহ ১৫ জন মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব নেন।
বিয়ের সময় তাদের পাশে জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ছিলেন। তবে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে মেয়েদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন সাজ্জাদ পারভেজ। বিয়ের পরও যোগাযোগ রাখতেন তিনি। কোনো সমস্যা হলে মেয়েরা ফোন করতেন সেই ‘উকিল বাবাকে’। সময় গড়িয়েছে। সেই মেয়েদের অনেকেই এখন নিজেদের সংসারে ভালো আছেন। কারও ঘরে সন্তান এসেছে। কিন্তু মেয়েদের সঙ্গে সাজ্জাদ পারভেজের সম্পর্ক বদলায়নি।
বরং ‘উকিল বাবা’ পরিচয় ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন আপন বাবা। কিছুদিন আগের ঘটনা লামিয়ার। সন্তান জন্মের সময় তার রক্তের প্রয়োজন। রাতে খবর পান সাজ্জাদ পারভেজ। দেরি না করে ছুটে যান। সেই রাতেই রক্তের ব্যবস্থা করে দেন। লামিয়ার সন্তান জন্মের পরও নানা হিসাবে তাকে দেখতে যান তিনি। শুধু লামিয়া নয়, অন্য মেয়েদের ঘরেও সন্তান এলে সময় করে তাদের দেখতে যান।
মেয়েদের স্বামীদেরও নিজের মতো করে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। সংসারে যেন তারা স্বাবলম্বী হতে পারেন, সেই বিষয়েও সহযোগিতা করেছেন। লামিয়া বলেন, ‘বিয়ের পরেও বাবা আমাদের ছেড়ে দেননি। আমরা বিপদে পড়লে প্রথমে যার কথা মনে হয়, তিনি হলেন বাবা। আমার সন্তান হওয়ার সময় রাতে রক্তের প্রয়োজন হয়েছিল। খবর পেয়েই তিনি ছুটে আসেন। রক্তের ব্যবস্থা করেন। আমার সন্তানকে নিজের নাতির মতোই দেখেন। আমাদের কাছে তিনি শুধু উকিল বাবা নন, সত্যিকারের বাবা।’
মেয়েদের কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেন না সাজ্জাদ পারভেজ। একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেন তিনি। সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, ‘আমার নিজের একটি মাত্র ছেলে। মেয়ে না থাকার যে অভাব, সেটা এই মেয়েদের মধ্যে পূরণ হয়েছে। বিয়ের সময় উকিল বাবা হয়েছিলাম। কিন্তু এখন আর শুধু উকিল বাবা মনে করি না। ওরা আমার সন্তান। ওদের কোনো বিপদ হলে নিজের সন্তানের বিপদ মনে হয়।’ কথা বলতে বলতে তিনি আবার থেমে যান। চোখ মুছে বলেন, ওদের কারও বিপদের কথা শুনলে এখনো মনে হয় আমার নিজের মেয়ের বিপদ হয়েছে। তাই যতটুকু পারি পাশে থাকি। মেয়েদের সন্তানদেরও নিজের নাতি-নাতনির মতো দেখি।
