ইউরোপ-আফ্রিকার পর যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ভারতীয় ‘ডিজিটাল ভাড়াটে’ বাহিনী
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৪৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতের রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে গোপনে প্রচারণা চালানো এবং ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে। কেনিয়া থেকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ সুরিনাম, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনেও এসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছেন গবেষকেরা। ভুয়া পরিচয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট, বট ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রার্থী বা রাজনৈতিক পক্ষের পক্ষে জনমত তৈরির কাজ করছে এসব চক্র।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় গুজরাটের আহমেদাবাদের একটি সাধারণ ফ্ল্যাটে বসে ২০২২ সালে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উইলিয়াম রুটোর পক্ষে প্রচারণার কনটেন্ট তৈরি করতেন ২২ বছর বয়সী রাজন কুমার। প্রতিদিন মাত্র ৭ ডলারের বিনিময়ে তিনি পোস্টার তৈরি ও ভিডিও সম্পাদনার কাজ করতেন। তবে তার তৈরি কনটেন্ট রুটোর আনুষ্ঠানিক প্রচারমাধ্যমে প্রকাশ করা হতো না। পরিচয় গোপন রাখা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হতো, যাতে সমন্বিত প্রচারণাকে স্বতন্ত্র ব্যবহারকারীদের মতামত বলে মনে হয়।
কুমারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিরোধী নেতাদের বক্তব্যের কিছু অংশ কেটে এমনভাবে উপস্থাপন করা হতো, যাতে তাদের বক্তব্যের অর্থ বদলে যায়। কখনো কোনো প্রার্থীর জনপ্রিয়তা ও নির্বাচনী সম্ভাবনা নিয়ে মিথ্যা দাবি ছড়ানোর পোস্টারও তৈরি করা হতো। নারী রাজনীতিকদের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে তাদের সঙ্গে অন্য ব্যক্তির সম্পর্কের গুজব ছড়ানোর কৌশলও ব্যবহৃত হতো বলে জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনেও ছায়া প্রচারণা
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভারতীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টগুলোকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রচারণায় যুক্ত থাকতে দেখা গেছে। গত ৪ আগস্ট মিশিগানে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রাইমারির আগে রাজনীতিক হ্যালি স্টিভেনসের পক্ষে এমন প্রচারণার তথ্য প্রথম প্রকাশ করে নিউইয়র্ক টাইমস। ওই প্রাইমারিতে তিনি আবদুল এল-সাইয়েদের কাছে পরাজিত হন।
অনলাইনে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা পর্যবেক্ষণকারী গোষ্ঠী অ্যান্টিবট৪নাভালনি আলজাজিরাকে জানিয়েছে, স্টিভেনসের পক্ষে ভিডিও ছড়ানো অন্তত ২৮টি সমন্বিত অ্যাকাউন্টের সন্ধান পেয়েছে তারা। এসব পোস্ট মোট ৭০ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে। আলজাজিরার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শনাক্ত করা অ্যাকাউন্টগুলোর অন্তত ১৫টি ভারত থেকে পরিচালিত হচ্ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া ফরেনসিক হাবের গবেষকেরাও স্টিভেনসের পক্ষে ভারতীয় অ্যাকাউন্ট ও পেজ ব্যবহার করে একই ধরনের প্রচারণার তথ্য পেয়েছেন।
ভুয়া পরিচয়, গোপন অর্থায়ন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারণায় বিতর্কিত বা অতিরঞ্জিত কনটেন্ট ছড়াতে রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে। কখনো আগে থেকে থাকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়, কখনো নতুন পেজ তৈরি করে, আবার কখনো অন্যের কাছে থাকা পেজ ভাড়া করে। এসব পেজের মাধ্যমে এমন প্রচারণা চালানো হয়, যা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নীতিমালায় ভুয়া পরিচয় ব্যবহার, অ্যাকাউন্ট কেনাবেচা এবং রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের অর্থদাতার পরিচয় গোপন রাখার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে ভারতীয় পরামর্শকেরা এসব নিয়মের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে কাজ চালানোর কথা জানিয়েছেন। প্রয়োজনে ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএন ব্যবহার করে অন্য দেশের পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা ও বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়।
অর্থ লেনদেনেও গোপন পদ্ধতি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন পরামর্শক আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া কাজের চুক্তি দেখিয়ে অর্থ পাঠানো হয়। এ ছাড়া প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে হুন্ডি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেও সীমান্ত পেরিয়ে অর্থ লেনদেন করা হয়।
বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত কার্যক্রম
আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভারতের এক রাজনৈতিক পরামর্শক তুষার গিরি দাবি করেন, ভারত এখন গোপন রাজনৈতিক প্রচারণার বড় বাজারে পরিণত হয়েছে। কম খরচে ভারত থেকে বিশ্বের যেকোনো দেশের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের প্রচারণা পরিচালনা করা সম্ভব।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেনিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে ভারতীয় রাজনৈতিক পরামর্শকদের কাজ করার তথ্য পাওয়া গেছে। সুরিনামের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় যুক্ত হওয়ার জন্যও ভারতীয় পরামর্শকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে এসব গোপন কার্যক্রমের ঝুঁকিও রয়েছে। ২০২২ সালে কেনিয়ার নির্বাচনের আগে উইলিয়াম রুটোর প্রচারণায় কাজ করা দুই ভারতীয় পরামর্শক জুলফিকার আহমেদ খান ও মোহাম্মদ জায়েদ সামি কিদওয়াই নাইরোবিতে নিখোঁজ হন। পরে অক্টোবরে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের অপহরণের ঘটনায় কেনিয়ার একটি বিশেষ পুলিশ ইউনিটের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। তবে ২০২৬ সালের আগস্টে প্রসিকিউশনের আবেদনের পর দেশটির হাইকোর্ট হত্যা মামলার অভিযোগ বাতিল করেন।
