Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

নির্বাচনি সমীকরণে আটকে গেলেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহু

Icon

আবদুস সামাদ আজাদ

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৪৪ পিএম

নির্বাচনি সমীকরণে আটকে গেলেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহু

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

Advertisement

নির্বাচনকেন্দ্রিক সংকটে পড়েছেন দুই বন্ধু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একদিকে ট্রাম্প সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে হেরে নাস্তানাবুদ হয়েছেন, অন্যদিকে নেতানিয়াহু তার প্রধানমন্ত্রিত্ব হারানোর পথে। নির্বাচনি সমীকরণে আটকে গেছে দুই নেতার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নেতানিয়াহু দুই দিক থেকে বড় ধাক্কা খেয়েছেন। ভোটে তার জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচনের দিনই ট্রাম্প ইসরাইলকে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের মার্কিন সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। একসঙ্গে দুটি চাপে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়েছে।

ফরেন পলিসি ও সিএনএন লিখেছে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ-রাজনীতি এখন নতুন অনিশ্চয়তার মুখে। নেতানিয়াহুর নির্বাচনি জোট, যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সমর্থন এবং যুদ্ধের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার রাজনীতি—তিনটিই একসঙ্গে চাপে পড়েছে।

বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, বর্তমানে ওয়াশিংটন ইসরাইলকে বার্ষিক ৩৮০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। ২০১৬ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে স্বাক্ষরিত ১০ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় এ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যা ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলার কথা। ট্রাম্পের ঘোষণা চুক্তিটিকে কেন্দ্র করে ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে ‘সহায়তা-নির্ভর’ মডেল থেকে ‘ক্রয় ও অংশীদারত্ব-নির্ভর’ মডেলে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ট্রাম্পের যুক্তি, প্রগতিশীল ও বামপন্থি রাজনীতিকরা এই সহায়তাকে অন্যায্যতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাই এ সহায়তা বন্ধ করা দরকার। অর্থাৎ এটি কেবল ইসরাইল-নীতির সিদ্ধান্ত নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। ফরেন পলিসি আগেই লিখেছিল, ইরান যুদ্ধ ও ইসরাইলকে সহায়তা—এই দুটি বিষয়ই মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

কী লাভ, কী ক্ষতি নেতানিয়াহুর

মার্কিন সহায়তা বন্ধ হওয়া নেতানিয়াহুর জন্য বড় ক্ষতি। ইসরাইলের গণমাধ্যম হারেৎজ বলছে, ইসরাইল এখন গাজা, লেবানন ও ইরানকেন্দ্রিক সংঘাতে জড়িয়ে আছে। এমন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা কমে যাওয়া মানে গোলাবারুদ, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়া। ট্রাম্পের ঘোষণা ইসরাইলের কৌশলগত অবস্থানের অবনতি ও দুর্বলতার সংকেত হিসেবে প্রতিপক্ষের কাছে বিবেচিত হতে পারে।


তবে হারেৎজের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সহায়তা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেতানিয়াহুর প্রস্তাবিত সময়ের চেয়ে আগে এলেও এটি তার ‘সুপার স্পার্টা ইসরাইল’ ধারণার সঙ্গে মিলে যেতে পারে। এ ধারণার মূল কথা হলো, ইসরাইল নিজস্ব অর্থে অস্ত্র কিনবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে নতুন অস্ত্র উন্নয়ন ও উৎপাদন করবে। গত মে মাসে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ‘সহায়তা থেকে অংশীদারত্বে’ রূপান্তরিত হওয়া উচিত।

 নেতানিয়াহুর রাজনীতি কি শেষ?

ইসরাইলের সাম্প্রতিক নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। তবে তার রাজনীতি এখনই শেষ হয়ে যায়নি। দ্য হিল লিখেছে, নির্বাচনের ফল একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। সেটি হলো, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া শক্তি বড়। তারা একটি স্থিতিশীল বিকল্প সরকার গঠনে একমত হতে পারলেই নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বড় সংকটে পড়বে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি তার রাজনৈতিক ভিত্তিকে আরও দুর্বল করবে।

দ্য হিলের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ, অমীমাংসিত ইরান যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ইসরাইলের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতাকে আরও গভীর করেছে। ফলে নেতানিয়াহুর রাজনীতি এখন শুধু ইসরাইলি ভোটারদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করছে না; এটি যুক্তরাষ্ট্রের জনমত, কংগ্রেসের রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপরও নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

ইসরাইলের নির্বাচন মধ্যপ্রাচ্যে কী প্রভাব ফেলবে?

বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ইসরাইলের নির্বাচনের ফল মধ্যপ্রাচ্যে তিনটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন সরকার গাজা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, নাকি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজবে—তা স্পষ্ট হবে। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্ত করার পেছনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী না থাকলে এ নীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। আর ইসরাইলের আরব দলগুলো সরকার গঠনে প্রভাব বিস্তার করতে পারলে ফিলিস্তিন প্রশ্নে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিতর্কও নতুন রূপ পেতে পারে।

ব্লুমবার্গের বিশ্লেষকরা বলছেন, জোট গঠনের আলোচনা কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত ঝুলে থাকতে পারে। কারণ, ইহুদি-নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর অনেকেই আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি জোট গঠনে রাজি নয়।

দুই নির্বাচনের সমীকরণ কী বলছে?

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ও ইসরাইলের নির্বাচনের মধ্যে সংযোগ এখন বেশ সরাসরি। ফরেন পলিসি লিখেছে, ইরান যুদ্ধ ও ইসরাইলকে সহায়তা—এই দুটি বিষয়ে মার্কিন ভোটাররা ট্রাম্পের ওপর নাখোশ। কারণ, ইরান যুদ্ধের ফলে গ্যাস ও ডিজেলের দাম বেড়েছে। একটি হিসাবে দেখা গেছে, এর ফলে গড় মার্কিন পরিবারের অতিরিক্ত দুই হাজার ডলার খরচ হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের সহায়তা বন্ধের ঘোষণাকে অনেকে নির্বাচনি রাজনীতির চাপ মোকাবিলার একটি চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। এর ফলে নেতানিয়াহু-ট্রাম্প সম্পর্কের ধরনও বদলে যেতে পারে। আগে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন। ফলে নতুন করে সহায়তা বন্ধের ঘোষণা ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কেও বিস্মিত করেছে।


দ্য হিল লিখেছে, নেতানিয়াহুর ট্রাম্পকেন্দ্রিক কৌশল স্বল্পমেয়াদে কিছু সামরিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিদলীয় সমর্থন ভেঙে দিয়েছে। তরুণ, স্বতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ভোটারদের মধ্যে ইসরাইলের প্রতি সহানুভূতি কমছে।

এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরাইলকে দেওয়া সামরিক সহায়তা কমানো বা বন্ধ করার পক্ষে। এটি নেতানিয়াহুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপদের কারণ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রই ইসরাইলের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা-নিশ্চয়তাদাতা।

নেতানিয়াহুর সামনে দুই পথ

ফরেন পলিসি ও দ্য হিল বলছে, ভবিষ্যতে নেতানিয়াহুর রাজনীতি দুটি পথে এগোতে পারে। একটি পথ হলো, তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে ‘সহায়তা থেকে অংশীদারত্ব’ মডেলে যাবেন এবং ইসরাইলকে আরও স্বনির্ভর সামরিক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলবেন। অন্য পথ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের চাপে তিনি আরও কোণঠাসা হয়ে পড়বেন।

ইসরাইল কি এখন যুদ্ধ থেকে সরে আসবে, নাকি আরও বেশি সামরিক স্বাধীনতার পথে হাঁটবে—এই প্রশ্নই এখন মধ্যপ্রাচ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর জবাব শুধু তেলআবিবের জোট গঠনের আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তা নির্ভর করবে ওয়াশিংটনের কংগ্রেস, ইরানের প্রতিক্রিয়া এবং ইসরাইলের আরব দলগুলোর রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর।

তথ্যসূত্র: ফরেন পলিসি, সিএনএন, দ্য হিল ও হারেৎজ।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ইরানকে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে যে কঠোর হুঁশিয়ারি দিল যুক্তরাষ্ট্র

ইরানকে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে যে কঠোর হুঁশিয়ারি দিল যুক্তরাষ্ট্র

রাতভর সোশ্যাল মিডিয়া, সকালে দেরিতে কাজ শুরু— কেমন দৈনন্দিন জীবন ট্রাম্পের?

রাতভর সোশ্যাল মিডিয়া, সকালে দেরিতে কাজ শুরু— কেমন দৈনন্দিন জীবন ট্রাম্পের?

ভরাডুবির পর ট্রাম্পের দলজুড়ে একে অপরকে দোষারোপ

ভরাডুবির পর ট্রাম্পের দলজুড়ে একে অপরকে দোষারোপ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ৪ বাংলাদেশি-মার্কিনের জয়

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ৪ বাংলাদেশি-মার্কিনের জয়

রাজনৈতিক ক্ষতি হলেও ইরানে হামলা জরুরি ছিল: ট্রাম্প

রাজনৈতিক ক্ষতি হলেও ইরানে হামলা জরুরি ছিল: ট্রাম্প

গাজার সেই চিকিৎসক এবার যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে

গাজার সেই চিকিৎসক এবার যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে

আরও পড়ুন

নির্বাচনি সমীকরণে আটকে গেলেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহু

নির্বাচনি সমীকরণে আটকে গেলেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহু

ইরানকে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে যে কঠোর হুঁশিয়ারি দিল যুক্তরাষ্ট্র

ইরানকে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে যে কঠোর হুঁশিয়ারি দিল যুক্তরাষ্ট্র

হরমুজে দুই তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন

হরমুজে দুই তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন

‘সকাল ১১টাতেই মুখে মদের গন্ধ’, কাকে ইঙ্গিত করলেন রাহুল গান্ধী?

‘সকাল ১১টাতেই মুখে মদের গন্ধ’, কাকে ইঙ্গিত করলেন রাহুল গান্ধী?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম