যে কারণে আকাশপথে হামলা জোরদার করছে রাশিয়া
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩৬ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পূর্ব ইউক্রেনে স্থলযুদ্ধে আশানুরূপ অগ্রগতি করতে না পেরে রাশিয়া এখন আকাশপথে হামলা বাড়াচ্ছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় আগের বছরগুলোর তুলনায় দ্রুতগতির হামলা চালাচ্ছে।
একই সঙ্গে ইউক্রেনের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করতে হামলার লক্ষ্যবস্তুও বাড়িয়েছে ক্রেমলিন।
জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গত সপ্তাহে জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ সালের তীব্র শীতের সময় ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় পরিকল্পিত হামলা চালিয়ে রাশিয়া যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আসন্ন শীতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে হামলার মাত্রা আরও বাড়িয়ে চলেছেন।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিস সেন্টারের আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ববিষয়ক প্রধান জন লফ বলেন, রাশিয়ার বর্তমান বিমান হামলার লক্ষ্য এখন স্পষ্টতই ইউক্রেনের অর্থনীতি ধ্বংস করা।
তিনি সিএনএনকে বলেন, ইউরোপের অনেক মিত্র দেশ এখনো ইউক্রেনের পরিস্থিতির ভয়াবহতা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউরোপীয় অংশীদারদের ওপর কতটা আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে, সেটিও তারা যথাযথভাবে বুঝতে পারছে না।
লফের মতে, পুতিন বুঝতে পেরেছেন, আরও বেশি সেনা পাঠিয়ে কিংবা স্থলযুদ্ধে অগ্রসর হয়ে দনবাস অঞ্চলে জয় পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, গ্রীষ্মকালে ইউক্রেনীয় বাহিনী তুলনামূলকভাবে ভালো প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতি ভাঙার একমাত্র উপায় হিসেবে পুতিন এখন ইউক্রেনের অর্থনীতিকে ধ্বংস করার পথ বেছে নিয়েছেন। পরিকল্পিতভাবেই তারা সেই কাজ করছে।’
আন্তর্জাতিক সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির পূর্ব ইউরোপবিষয়ক গবেষক ক্রিশ্চিয়ান ভ্লাস আশঙ্কা করে বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার শীতের শুরুতেই ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখা দিতে পারে।
২০২৬ সালে ইউক্রেনে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি যুদ্ধ শুরুর প্রথম কয়েক মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত রুশ হামলায় ইউক্রেনের ২ হাজার ৭০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
২০২৬ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার সংখ্যাও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। জানুয়ারিতে রুশ হামলার সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৬৫০। অক্টোবরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৩২-এ।
অন্যদিকে, রাশিয়ার ভেতরে ইউক্রেনের হামলাও বেড়েছে। অক্টোবরে দেশটির বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ২ হাজার ৩০২টি হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, গত মাসে অস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত রাশিয়ার অন্তত সাতটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, তিনটি সামরিক বিমানঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ রাডার ও সামরিক যোগাযোগব্যবস্থায় হামলা চালানো হয়েছে। এর আগে গ্রীষ্মে রাশিয়ার বৃহত্তম অনলাইন বিপণন প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ডবেরিজের গুদামেও হামলা চালায় ইউক্রেন।
শিল্পকারখানা ও শস্য রপ্তানিও রাশিয়ার লক্ষ্য
কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেনের পণ্য রপ্তানি, দানিয়ুব নদীর বন্দর, শিল্পপণ্যের গুদাম, রেল যোগাযোগব্যবস্থা এবং ইস্পাতশিল্পে রাশিয়ার হামলা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এসব অবকাঠামোর কিছু সামরিক ও বেসামরিক—উভয় ধরনের কাজে ব্যবহৃত হলেও সাম্প্রতিক অনেক হামলায় সরাসরি বেসামরিক স্থাপনাকেই লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।
গত আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের ক্রিভি রিহ ও জাপোরিঝঝিয়ার বড় দুটি ইস্পাত কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে কারখানা দুটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজারো পরিবারের আয় ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ক্রিভি রিহের স্থানীয় প্রশাসন। তারা সতর্ক করে বলেছে, এর গুরুতর আর্থসামাজিক প্রভাব পড়তে পারে।
ভ্লাস বলেন, ‘এ ধরনের হামলা শুধু শিল্পকারখানার ক্ষতি করে না, ইউক্রেনের রাজস্ব আয়ের ভিত্তিকেও দুর্বল করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের বেতন ও জীবিকার ওপর।’
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের রাশিয়াবিষয়ক দলের প্রধান কাতেরিনা স্টেপানেনকো বলেন, রাশিয়া এখন বিপণিবিতান, পণ্য সংরক্ষণের স্থান ও বিভিন্ন গুদামেও হামলা চালাচ্ছে। এর ফলে পণ্য সরবরাহ, বিক্রি ও সামগ্রিক বাণিজ্যব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আগে রাশিয়া মূলত রাতের বেলায় হামলা চালাত। কিন্তু এখন দিনের বেলায়ও হামলা বাড়িয়েছে। এর একটি উদ্দেশ্য হলো ইউক্রেনের স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত করা।
শীতের আগে বাড়ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট
জ্বালানি অবকাঠামোয় রুশ হামলার প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। ইউক্রেনের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেগুলো আর মেরামত করে চালু করা সম্ভব নয়।
জন লফ বলেন, ‘এই যুদ্ধের ক্রমাগত প্রভাব এবং ইউক্রেনের মানুষের ওপর তৈরি হওয়া বিপুল ক্লান্তির বিষয়টি আমাদের মাথায় রাখতে হবে। অর্থনীতির ভিত্তি এভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত বিপজ্জনক।’
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার পর্যন্ত ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের প্রায় ৪০ শতাংশ ভবনে গরমের ব্যবস্থা ছিল না।
এদিকে, ইউক্রেনে বছরের প্রথম তুষারপাতের পর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
চলমান পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার এই আকাশ হামলা শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশটির অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। আসন্ন শীত সেই সংকটকে আরও গভীর করে তুলতে পারে।
সূত্র: সিএনএন
