এআই দিয়ে হাত বা ভাগ্য গণনা— ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রযুক্তির এই দ্রুতগতির যুগে মানুষ যেন এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে। জ্ঞান, তথ্য ও বিশ্লেষণের এই শক্তিশালী মাধ্যম যেমন জীবনকে সহজ করছে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে মানুষের বিশ্বাস ও আকীদার সঙ্গে সূক্ষ্মভাবে সংঘর্ষও তৈরি করছে। বিশেষ করে ভবিষ্যৎ জানার আকাঙ্ক্ষা— যা মানুষের চিরন্তন প্রবণতা— এখন এআই-এর মাধ্যমে নতুন রূপে সামনে আসছে। কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য প্রশ্নটি কেবল প্রযুক্তিগত নয়; বরং এটি ইমান, আকিদা ও তাওহিদের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি বিষয়।
এআই দিয়ে ভাগ্য গণনা—ইসলাম কী বলে?
বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি নতুন কিছু বিভ্রান্তির পথও তৈরি করেছে। সম্প্রতি অনেকে এআই টুলস ব্যবহার করে হাতের রেখা বিশ্লেষণ করে নিজের ভবিষ্যৎ জানার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, নতুন প্রজন্মের এআই মডেল ব্যবহার করে অনেকে নিজের হাতের ছবি আপলোড করে তথাকথিত ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণ নিচ্ছেন।
এরপর সেই ছবি বিশ্লেষণ করে এআই ভিজ্যুয়াল ব্যাখ্যা প্রদান করছে। বিষয়টি অনেকের কাছে কৌতূহল বা নিছক বিনোদন মনে হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। কারণ এটি সরাসরি গায়েব (অদৃশ্য জ্ঞান) জানার দাবির সঙ্গে সম্পর্কিত।
ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস হলো— ভবিষ্যৎ বা অদৃশ্য জগতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই সীমাবদ্ধ। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে—
قُل لَّا يَعْلَمُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ
‘বলুন, আল্লাহ ছাড়া আসমানসমূহ ও জমিনে কেউই গায়েব জানে না।’ (সুরা নামল: আয়াত ৬৫)
আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ
‘আর তার কাছেই রয়েছে গায়েবের চাবিকাঠি; তিনি ছাড়া আর কেউ তা জানে না।’ (সুরা আনআম: আয়াত ৫৯)
অতএব, কোনো ব্যক্তি, জ্যোতিষী কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর কোনো পদ্ধতি ভবিষ্যৎ নির্ভুলভাবে জানাতে পারে— এমন বিশ্বাস ইসলাম সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করে। কারণ মানুষের ভাগ্যের সঙ্গে হাতের রেখার কোনো সম্পর্ক নেই। যার হাতই নেই, তারও তো ভাগ্য রয়েছে—এটাই বাস্তবতা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) গণকদের ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন—
مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ، لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً
‘যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে যায় এবং কিছু জিজ্ঞাসা করে, তার ৪০ রাতের নামাজ কবুল হয় না।’ (মুসলিম ৫৭১৪)
এর অর্থ এই নয় যে তার ওপর থেকে নামাজ আদায়ের দায়িত্ব উঠে যাবে; বরং সে নামাজ আদায় করলেও সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে, যদিও ফরজ আদায় হয়ে যাবে।
অন্য হাদিসে নবী করিম (সা.) আরও কঠোরভাবে বলেন—
مَنْ أَتَى كَاهِنًا أَوْ عَرَّافًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ، فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ ﷺ
‘যে ব্যক্তি কোনো কাহিন বা গণকের কাছে গিয়ে তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মদের (সা.) ওপর নাজিলকৃত (কুরআন) অস্বীকার করল।’ (মুসনাদে আহমদ ৯৫৩২)
মনে রাখতে হবে, ইসলাম সব ধরনের কুসংস্কার ও মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রতারণার সব পথকে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করেছে। একজন মুসলিমের বিশ্বাস হওয়া উচিত— আল্লাহ তাআলা ছাড়া কেউই গায়েব জানে না এবং কারো উপকার বা অপকার করার স্বাধীন ক্ষমতা নেই। এই একই বিধান এআই-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যদিও এটি একটি প্রোগ্রাম, মানুষের তৈরি অ্যালগরিদম— যা কেবল অনুমান ও ডেটার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করে। কিন্তু যখন কেউ এটিকে ভবিষ্যৎ জানার নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বিশ্বাস করতে শুরু করে, তখন তা গণক বা জ্যোতিষীর মতোই হয়ে দাঁড়ায়।
তাই এআইভিত্তিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে হাতের রেখা দেখে ভাগ্য নির্ধারণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। এমনকি বিনোদনের ছলেও এসব বিষয়ে জড়ানো ঠিক নয়। কারণ শয়তান খুব সূক্ষ্মভাবে মানুষের ইমানকে দুর্বল করার চেষ্টা করে। ইসলামে কোনো হারাম কাজকে ‘মজা’ বা ‘বিনোদন’ হিসেবে গ্রহণ করারও অনুমতি নেই।
তবে ইসলামের সীমার ভেতরে থেকে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার নিঃসন্দেহে উপকারী এবং সময়োপযোগী। জ্ঞানার্জন, গবেষণা, চিকিৎসা ও নানাবিধ কল্যাণমূলক কাজে এর ব্যবহার প্রশংসনীয়। কিন্তু ভাগ্য গণনা বা গায়েব জানার চেষ্টা করা— এটি ইসলামে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ।
পরিশেষে বলা যায়, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, তা কখনোই আল্লাহর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করতে পারে না। একজন মুমিনের প্রকৃত শক্তি তার রবের ওপর নির্ভরতায়, কোনো অ্যালগরিদম বা কৃত্রিম বিশ্লেষণে নয়। তাই আমাদের উচিত—প্রযুক্তিকে কল্যাণের পথে ব্যবহার করা এবং আকিদা ও ইমানের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন, কুসংস্কার থেকে হেফাজত করুন এবং তাঁর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করার তৌফিক দিন। আমিন।

