কসম ভেঙে ফেলার কাফফারা ও করণীয় কী?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৬:৩৮ পিএম
কসম ভঙ্গের বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানুষ আবেগপ্রবণ সৃষ্টি। জীবনের নানা মুহূর্তে রাগ, অভিমান, কষ্ট কিংবা হতাশা থেকে আমরা অনেক সময় এমন কিছু কথা বলে ফেলি, যা পরে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাগের মাথায় বা আবেগের বশবর্তী হয়ে কেউ কেউ কসম করে বসেন— ‘আমি আর কখনো এটা করব না’, ‘ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলব না’, কিংবা ‘এই খাবার আর খাব না’। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে, পরিস্থিতির চাপে অথবা প্রিয়জনের অনুরোধে সেই কসম রক্ষা করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না।
এমন অবস্থায় প্রশ্ন জাগে— কসম ভেঙে ফেললে কি গুনাহ হবে? এর কাফফারা কী? ইসলাম এ বিষয়ে কী নির্দেশনা দিয়েছে? পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
কসম ভঙ্গের বিষয়ে কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَٰكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقَّدتُّمُ الْأَيْمَانَ ۖ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ ۖ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ
‘আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের অনর্থক শপথের জন্য পাকড়াও করবেন না। তবে তোমরা যে শপথ দৃঢ়ভাবে কর, সে জন্য তিনি তোমাদেরকে জবাবদিহির আওতায় আনবেন। সুতরাং তার কাফফারা হলো— দশজন মিসকিনকে মধ্যম ধরনের খাবার খাওয়ানো, যা তোমরা নিজেদের পরিবারকে খাওয়াও; অথবা তাদেরকে বস্ত্র প্রদান করা; অথবা একজন দাস মুক্ত করা। আর যে ব্যক্তি এর কোনোটি করতে সক্ষম না হবে, সে তিন দিন রোজা রাখবে। এটি তোমাদের শপথের কাফফারা, যখন তোমরা শপথ ভঙ্গ কর। আর তোমরা নিজেদের শপথ রক্ষা কর।’ (সুরা আল-মায়িদাহ: আয়াত ৮৯)
কসম ভঙ্গ করলে কী কাফফারা দিতে হবে?
উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইসলামিক স্কলাররা বলেন, যদি কেউ কোনো বৈধ বিষয়ের ওপর কসম করে এবং পরে তা রক্ষা করতে না পেরে ভঙ্গ করে ফেলে, তাহলে তাকে কসম ভঙ্গের কাফফারা আদায় করতে হবে।
কাফফারা আদায়ের পদ্ধতি হলো—
> দশজন অসহায় বা মিসকিনকে পেট ভরে দুই বেলা খাবার খাওয়ানো।
অথবা,
> দশজন মিসকিনকে এক জোড়া করে কাপড় প্রদান করা।
অথবা,
> একজন দাস মুক্ত করা (বর্তমান সময়ে এ বিধান কার্যত প্রযোজ্য নয়)।
আর যদি এসবের কোনোটি করার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে—
> ধারাবাহিকভাবে তিন দিন রোজা রাখতে হবে।
রাগ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব
অধিকাংশ ক্ষেত্রে কসম করার পেছনে রাগ বা আবেগ কাজ করে। তাই ইসলাম রাগ নিয়ন্ত্রণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ রাগের বশবর্তী হয়ে মানুষ এমন অনেক সিদ্ধান্ত নেয়, যা পরে তার জন্য অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ
‘প্রকৃত শক্তিশালী বা বীর সেই ব্যক্তি নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত বীর সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (বুখারি ৬১১৪, ৫৭৬৩; মুসলিম ২৬০৯)
একজন মুমিনের করণীয়
কসম করার আগে ভালোভাবে চিন্তা করা উচিত। রাগের মুহূর্তে, আবেগের বশে বা সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার মতো বিষয়ে কসম করা থেকে বিরত থাকা উত্তম। যদি কোনো কসম কল্যাণকর না হয় বা তা পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে, তবে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী কাফফারা আদায় করে নেওয়া উচিত।
ইসলাম মানুষের দুর্বলতা ও বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে জীবন পরিচালনার দিকনির্দেশনা দিয়েছে। কসম ভঙ্গ করা আদর্শ নয়, তবে কেউ যদি ভুলবশত বা পরিস্থিতির কারণে তা ভঙ্গ করে ফেলে, তাহলে তার জন্য কাফফারার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাই রাগ বা আবেগের বশে কসম না করে ধৈর্য ধারণ করা এবং কসম ভঙ্গ হলে শরিয়ত নির্ধারিত কাফফারা আদায় করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে, আত্মসংযম ও আল্লাহভীতি মানুষের চরিত্রকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে এবং তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।

