টিকিট ছাড়া কম ভাড়ায় বাসে ভ্রমণ—জায়েজ নাকি গুনাহ?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দূরপাল্লার বাসে যাতায়াতের সময় অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যাত্রীর সংখ্যা কম থাকলে কিছু সুপারভাইজার টিকিট না কেটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম টাকায় যাতায়াতের প্রস্তাব দেন। এতে যাত্রীর যেমন কিছু টাকা সাশ্রয় হয়, তেমনি অনেক সময় বিষয়টি সাধারণ ও স্বাভাবিক বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু এই কম ভাড়ার অর্থটি যদি বাস কোম্পানির অনুমোদিত না হয় এবং সুপারভাইজার তা নিজের স্বার্থে গ্রহণ করেন, তাহলে এর শরয়ি বিধান কী?
ইসলাম মানুষের সম্পদ ও অধিকার সংরক্ষণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তাই কোনো লেনদেনে সংশ্লিষ্ট পক্ষের অনুমতি আছে কি না—এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে সুপারভাইজারকে দেওয়া টাকা প্রকৃতপক্ষে বাস কোম্পানি বা মালিকের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচ্য।
সুপারভাইজার কোম্পানিকে ফাঁকি দিয়ে কম ভাড়া নিলে
বাসের সুপারভাইজার যদি কোম্পানির নির্ধারিত ভাড়া গোপন করে টিকিট ছাড়া কম ভাড়া নেন এবং সেই অর্থ নিজের কাছে রেখে দেন, তাহলে এভাবে ভ্রমণ করা জায়েজ নয়। কারণ এতে একদিকে কোম্পানি বা বাসমালিকের হক নষ্ট করা হয়, অন্যদিকে সুপারভাইজারের প্রতারণামূলক কাজে সহযোগিতা করা হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করো; পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অন্যকে সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে অত্যন্ত কঠোর।’ (সুরা আল-মায়িদা: আয়াত ২)
অতএব, সুপারভাইজার যদি কোম্পানির অনুমতি ছাড়া কম ভাড়ায় যাত্রী বহন করেন, তাহলে জেনে-শুনে সেই ব্যবস্থার সুযোগ নেওয়া ঠিক হবে না। কারণ এতে অন্যের অধিকার নষ্ট করার কাজে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করা হয়।
কোম্পানির অনুমতি থাকলে ভিন্ন বিধান
তবে যদি বাস কোম্পানি বা মালিক সুপারভাইজারকে বিশেষ পরিস্থিতিতে ভাড়া কমানোর, ছাড় দেওয়ার কিংবা টিকিট ছাড়াই যাত্রী নেওয়ার অনুমতি দিয়ে থাকে এবং যাত্রীও বিষয়টি জানেন, তাহলে সুপারভাইজারের নির্ধারিত কম ভাড়ায় ভ্রমণ করা জায়েজ।
কারণ সুপারভাইজার এ ক্ষেত্রে কোম্পানির অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। তিনি কোম্পানির পক্ষ থেকে যে ভাড়া গ্রহণ করছেন, তা কোম্পানির অনুমতির ভিত্তিতেই গ্রহণ করছেন। ফলে তার কাছে ভাড়া পরিশোধ করাকে কোম্পানির কাছেই ভাড়া পরিশোধ হিসেবে গণ্য করা হবে।
অনুমতির বিষয়টি জানা না থাকলে কী করবেন?
কিন্তু যদি যাত্রীর জানা না থাকে যে, বাস কোম্পানি সুপারভাইজারকে টিকিট ছাড়া যাত্রী নেওয়া বা কম ভাড়া নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে কি না, কিংবা সুপারভাইজার যাত্রীর কাছ থেকে নেওয়া টাকা প্রকৃত হকদার—অর্থাৎ বাসের মালিক বা কোম্পানির কাছে পৌঁছে দেবেন কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ থাকে, তাহলে টিকিট ছাড়া ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকাই উচিত।
সামর্থ্য থাকলে নির্ধারিত ভাড়া দিয়ে টিকিট কেটে ভ্রমণ করা নিরাপদ ও উত্তম পন্থা। এতে কারও অধিকার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না এবং সন্দেহপূর্ণ লেনদেন থেকেও নিজেকে রক্ষা করা যায়।
কম ভাড়ায় বাসে যাতায়াত করা নিজে হারাম নয়; বরং মূল বিষয় হলো কম ভাড়া নেওয়ার অনুমতি আছে কি না এবং সেই অর্থ কার কাছে যাচ্ছে। কোম্পানির অনুমতি থাকলে সুপারভাইজারের মাধ্যমে কম ভাড়া দিয়ে ভ্রমণ করা জায়েজ। কিন্তু কোম্পানিকে ফাঁকি দিয়ে সুপারভাইজার নিজের স্বার্থে কম ভাড়া নিলে জেনে-শুনে সেই সুযোগ নেওয়া জায়েজ হবে না।
তাই একজন সচেতন মুসলিমের উচিত শুধু নিজের আর্থিক লাভের কথা না ভেবে লেনদেনের বৈধতা ও অন্যের অধিকারের বিষয়টিও বিবেচনা করা। অনুমতি সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে টিকিট কেটে নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধ করাই অধিক নিরাপদ। এতে সম্পদের হক আদায় হয়, সন্দেহ থেকে মুক্ত থাকা যায় এবং অন্যায় কাজে সহযোগিতা করার আশঙ্কাও থাকে না।

