কোমায় থাকলে মানুষের আমলনামায় কি কিছু লেখা হয়?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দীর্ঘদিন কোনো প্রিয়জন যখন হাসপাতালে বিছানায় অচেতন বা কোমায় শুয়ে থাকেন, তখন ঘরের মানুষের মন এক অজানা কষ্টে ভিড় করে। চোখের সামনে মানুষটিকে নিথর দেখলে নানা প্রশ্ন মনের কোণে উঁকি দেয়। মনে ভয় জাগে, এই মানুষটির নামাজ-রোজা তো ছুটে যাচ্ছে, এতে কি তার আমলনামায় কোনো গুনাহ লেখা হচ্ছে? তার আগের ভালো কাজগুলোর তবে কী হবে? ইসলামি শরিয়তের উদার ও সুন্দর বিধানগুলো এসব কঠিন মুহূর্তে পরিবারকে শান্তি ও স্বস্তি জোগায়।
অচেতন ব্যক্তির আমলের দায় ও কলম তুলে নেওয়া
ইসলামের একটি চিরন্তন ও সুন্দর নীতি হলো, যে মানুষের জ্ঞান ও বিবেক কোনো কারণে কাজ করে না, শরিয়ত তার ওপর কোনো জোর করে না। হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন—
رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَحْتَلِمَ، وَعَنِ المَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ
‘তিন ব্যক্তির ওপর থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি, যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয়; নাবালক শিশু, যতক্ষণ না সে বালেগ হয়; এবং পাগল, যতক্ষণ না তার বিবেক ফিরে আসে।’ (আবু দাউদ ৪৪০৩, তিরমিজি ১৪২৩)
কোমায় থাকা মানুষটি ঠিক এই অবস্থার মধ্য দিয়ে যান। তার নিজের ইচ্ছাশক্তি বা স্বাভাবিক জ্ঞান তখন থাকে না। তাই তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ফরজ ইবাদত ছেড়ে দিচ্ছেন, এমনটি বিন্দুমাত্র ভাবা হয় না। এই অক্ষমতার কারণে ওই সময়ে তার ওপর শরিয়তের কোনো জবাবদিহিতা থাকে না।
নামাজ-রোজা ছুটে গেলে কি গুনাহ হবে?
জ্ঞান ও সচেতনতা না থাকায় কোমায় থাকা অবস্থায় নামাজ বা রোজা আদায় করতে না পারলে তার জন্য কোনো গুনাহগার হতে হয় না। তবে জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর ছুটে যাওয়া সেই নামাজগুলোর কাজা করতে হবে কি না, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে ছোটখাটো মতপার্থক্য রয়েছে। হানাফি মাজহাবের জনপ্রিয় ফতোয়া হলো— অচেতন থাকার সময়টি যদি এক দিন-রাতের বেশি দীর্ঘ হয়, তবে সেই সময়ের নামাজগুলোর কাজা আদায় করতে হয় না। পরিস্থিতি বুঝে পরিবারের উচিত কোনো বিজ্ঞ আলেমের শরণাপন্ন হওয়া।
আগের নেক আমলের সওয়াব ও অসুস্থতার প্রতিদান
বিছানায় পড়ে থাকলেও একজন মুমিন বান্দা তার আগের নিয়মিত ভালো কাজের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হন না। হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) চমৎকার এই সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন—
إِذَا مَرِضَ الْعَبْدُ أَوْ سَافَرَ، كُتِبَ لَهُ مِثْلُ مَا كَانَ يَعْمَلُ مُقِيمًا صَحِيحًا
‘কোনো বান্দা যখন অসুস্থ হয় বা সফরে বের হয়, তখন তার জন্য ঠিক ততটুকু সওয়াবই লেখা হয়, যা সে সুস্থ ও ঘরে অবস্থানকালে আমল করত।’ (বুখারি ২৯৯৬)
অর্থাৎ, সুস্থ থাকা অবস্থায় কেউ যদি নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত, দান-সদকা বা নামাজে অভ্যস্ত থাকেন, তবে অসুস্থতার বিছানায় অক্ষম হওয়ার পরও আল্লাহ তাআলা তার আমলনামায় সেই সওয়াবগুলো নিয়মিত লিখে যান। একই সঙ্গে এই দীর্ঘ অসুস্থতা ও শারীরিক কষ্টও তার জন্য বড় রহমত নিয়ে আসে।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন—
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُصِيبُهُ أَذًى، شَوْكَةٌ فَمَا فَوْقَهَا، إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا سَيِّئَاتِهِ، كَمَا تَحُطُّ الشَّجَرَةُ وَرَقَهَا
‘কোনো মুসলিমকে সামান্য কাঁটার খোঁচাও যদি স্পর্শ করে, তবে এর বিনিময়ে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ এমনভাবে ঝরে ফেলেন, যেমন গাছের পাতা ঝরে পড়ে।’ (বুখারি ৫৬৪১, মুসলিম ২৫৭৩)
পরিবারের করণীয় ও সুন্দর সমাপ্তি
এই কঠিন সময়ে পরিবারের সবচেয়ে বড় কাজ হলো অসীম ধৈর্য ধারণ করা এবং রোগীর পাশে থেকে সেবা ও দোয়া চালিয়ে যাওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ ব্যক্তির জন্য সবসময় শিফা বা নিরাময়ের দোয়া করতে শিখিয়েছেন। রোগীর পক্ষ থেকে দান-সদকা করা কিংবা তার ভালো কাজের ধারাকে বাঁচিয়ে রাখা পরিবারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কোমা আর সাধারণ ঘুম এক নয়; তাই রোগীর শারীরিক অবস্থা ভেদে বিধানও ভিন্ন হতে পারে।
সব মিলিয়ে, কোমায় থাকা প্রিয়জন আল্লাহর এক বিশেষ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তার আমলনামায় জোর করে কোনো গুনাহ লেখা হচ্ছে না, বরং তার পুরোনো নেক আমলগুলো ঠিকই জমা হচ্ছে এবং এই কষ্টের উছিলায় তার বিগত জীবনের ছোটখাটো ভুলত্রুটিগুলো ক্ষমা হয়ে যাচ্ছে। পরিজনদের তাই ভেঙে না পড়ে কেবল সবর করতে হবে এবং পরম করুণাময়ের কাছে প্রিয় মানুষটির সুস্থতা ও রহমতের জন্য হাত তুলতে হবে।

