Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

অনলাইনে কোন আয় হালাল, কোনটি হারাম?

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৭ পিএম

অনলাইনে কোন আয় হালাল, কোনটি হারাম?

ফাইল ছবি

Advertisement

প্রশ্ন

এক প্রশ্নকারী জানতে চান, কোন নীতিমালার ভিত্তিতে অনলাইনে কোনো আয়ের মাধ্যমকে শরিয়তসম্মত বা শরিয়তবিরোধী বলা হয়? ফিকহের আলোকে জানালে উপকৃত হব।

উত্তর 

মদিনা মুনাওয়ারার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মুফতি মুহাম্মাদ রাশেদুল ইসলাম বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে, অনলাইনে আয়ের মাধ্যম একটি বা দুটি নয় যে, সুনির্দিষ্ট করে প্রতিটি ক্ষেত্র নিয়ে আদ্যোপান্ত কথা বলা সম্ভব। তবে হ্যাঁ, আমরা যদি মৌলিকভাবে ভাগ করি তাহলে বলতে পারি, হয়ত সেটি ব্যবসা বা ক্রয়-বিক্রয়, অথবা সার্ভিস প্রোভাইডের মাধ্যমে আয়ের মধ্যে পড়বে।

সুতরাং অনলাইন আয়কে মৌলিকভাবে দুটি শাখায় ভাগ করা যায়—

এক. ব্যবসা (ক্রয়-বিক্রয়)

দুই. সেবা প্রদান (সার্ভিস প্রোভাইডিং)

উভয় ক্ষেত্রে আয় হালাল হওয়ার জন্য অফলাইনের বেচাকেনা ও চুক্তির যে শর্তাবলি রয়েছে, সেগুলো অনলাইনেও প্রযোজ্য হবে। হ্যাঁ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োগ বা বাস্তবায়নের বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে।

ক. অনলাইনে বেচাকেনা শুদ্ধ হওয়ার মৌলিক শর্তাবলি

১. পণ্যের সঠিক ও সত্য বিবরণ: পণ্যের কাঁচামাল, গুণাগুণ, পরিমাণ, উৎপাদক প্রতিষ্ঠান, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখসহ সব জরুরি তথ্য সুস্পষ্ট থাকতে হবে। কোনো ধরনের মিথ্যা তথ্য দিলে বেচাকেনা শুদ্ধ হবে না।

২. মালিকানা বা বৈধ প্রতিনিধিত্ব: বিক্রেতার কাছে পণ্যটি হস্তগত বা তার মালিকানায় থাকতে হবে। নিজের মালিকানায় না থাকলে, মূল মালিক বা উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিনিধি বা এজেন্ট হিসেবে যথাযথ চুক্তি করে নিতে হবে।

৩. হালাল পণ্য: বিক্রিত পণ্যটি ইসলামী শরীয়তে বৈধ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে হবে। সুতরাং মদ, শূকরের গোশত, গায়রুল্লাহর নামে জবাই করা পশুর গোশত বা পুরুষদের জন্য খাঁটি রেশমি পোশাক ইত্যাদির ব্যবসা জায়েজ নয়।

৪. ক্রেতা-বিক্রেতার যোগ্যতা: ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়কেই সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী এবং ভালো-মন্দ বোঝার মতো বয়সের (মুমায়্যিজ) হতে হবে। অবুঝ শিশু বা মানসিক রোগীর সঙ্গে বেচাকেনা শুদ্ধ নয়।

৫. পণ্য দেখে বাতিল করার অধিকার: অনলাইনে কেনা পণ্য হাতে পাওয়ার পর তা বাস্তবে দেখে ক্রেতার তা গ্রহণ বা বর্জন করার অধিকার থাকতে হবে। বর্জন করলে ক্রেতার ওপর অযৌক্তিক কোনো খরচ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।

অনলাইন ব্যবসাকে হালাল ও সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত রাখতে হলে লেনদেনটি অবশ্যই নিচের চারটি বিষয় থেকে মুক্ত হতে হবে:

গারার: প্রতারণা বা অস্পষ্টতা।

দারার: ঠকানো বা অপরের ক্ষতি করা।

গিশ: পণ্যে ভেজাল দেওয়া বা দোষ গোপন করা।

ইসতিগলাল: অন্যের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অনৈতিক ফায়দা লোটা।

খ. অনলাইনে সেবা প্রদানের মাধ্যমে ইনকাম হালাল হওয়ার মৌলিক শর্তাবলি

১. কাজের ধরন হালাল হওয়া: আপনি যে সেবাটি দিচ্ছেন, তার মূল কাজ শরীয়তে বৈধ হতে হবে। যেমন—সাধারণ ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, অনুবাদ বা হালাল ব্যবসার গ্রাফিক্স ডিজাইন করা বৈধ। কিন্তু সুদি প্রতিষ্ঠানের হিসাব রাখা, জুয়ার সাইট তৈরি করা বা অশ্লীল কনটেন্ট প্রমোট করা জায়েজ নেই।

২. পারিশ্রমিক নির্দিষ্ট থাকা: কাজটি করে দিলে ঠিক কত টাকা বা পারিশ্রমিক পাওয়া যাবে, তা চুক্তির সময়ই স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকতে হবে। পারিশ্রমিক অস্পষ্ট রাখলে ইজারার চুক্তি ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায়।

৩. কাজের বিবরণ ও পরিমাণ সুস্পষ্ট হওয়া: ক্লায়েন্টকে ঠিক কী পরিমাণ কাজ করে দিতে হবে, কাজের ধরন কেমন হবে বা কত ঘণ্টা সময় দিতে হবে, তা শুরুতেই পরিষ্কারভাবে ঠিক করে নিতে হবে।

৪. ধোঁকা ও প্রতারণামুক্ত হওয়া: কাজ পাওয়ার জন্য নিজের দক্ষতা সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেওয়া, অন্যের করা কাজকে নিজের পোর্টফোলিও হিসেবে চালানো বা ফেক রিভিউ কেনা সম্পূর্ণ নাজায়েজ।

৫. চুক্তি ও আমানত রক্ষা করা: চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সততা ও আমানতদারির সঙ্গে কাজ সম্পন্ন করে ক্লায়েন্টকে বুঝিয়ে দেওয়া জরুরি। কাজে ফাঁকিবাজি করা বা ইচ্ছাকৃত নিম্নমানের কাজ দেওয়া জায়েজ নয়।

৬. গুনাহের কাজে সহায়তা না করা: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা নেক কাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সাহায্য করো, কিন্তু গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সাহায্য কোরো না।’ (সূরা মায়িদা: ২)। তাই এমন কোনো সার্ভিস দেওয়া যাবে না, যা সরাসরি হারাম বা গুনাহের কাজে ব্যবহৃত হয়।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, বিজ্ঞাপন বা কনটেন্ট-ভিত্তিক আয় (যেমন ইউটিউব, ব্লগিং, স্পন্সরশিপ) আলাদা কোনো তৃতীয় শাখা নয়, বরং এটাও মূলত সেবা প্রদানেরই একটি রূপ। এখানে কনটেন্ট নির্মাতা তার দর্শক/পাঠকের প্ল্যাটফর্মের স্পেস বিজ্ঞাপনদাতাকে সেবা হিসেবে প্রদান করেন, বিনিময়ে অর্থ পান। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য সংযুক্ত মাসআলাটি দেখুন।

দলীলসমূহ-

১.

আয়াতঃ یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَکُمۡ بَیۡنَکُمۡ بِالۡبَاطِلِ اِلَّاۤ اَنۡ تَکُوۡنَ تِجَارَۃً عَنۡ تَرَاضٍ مِّنۡکُمۡ ۟ وَلَا تَقۡتُلُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ بِکُمۡ رَحِیۡمًا

অর্থঃ হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরে একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না, তবে পারস্পরিক সন্তুষ্টিক্রমে কোন ব্যবসায় করা হলে (তা জায়েয)। এবং তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই, আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। সূরাঃ আন নিসা - আয়াত নংঃ ২৯

২.

আয়াতঃ اَلَّذِیۡنَ یَاۡکُلُوۡنَ الرِّبٰوا لَا یَقُوۡمُوۡنَ اِلَّا کَمَا یَقُوۡمُ الَّذِیۡ یَتَخَبَّطُہُ الشَّیۡطٰنُ مِنَ الۡمَسِّ ؕ ذٰلِکَ بِاَنَّہُمۡ قَالُوۡۤا اِنَّمَا الۡبَیۡعُ مِثۡلُ الرِّبٰوا ۘ وَاَحَلَّ اللّٰہُ الۡبَیۡعَ وَحَرَّمَ الرِّبٰوا ؕ فَمَنۡ جَآءَہٗ مَوۡعِظَۃٌ مِّنۡ رَّبِّہٖ فَانۡتَہٰی فَلَہٗ مَا سَلَفَ ؕ وَاَمۡرُہٗۤ اِلَی اللّٰہِ ؕ وَمَنۡ عَادَ فَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ

অর্থঃ যারা সুদ খায়, (কিয়ামতের দিন) তারা সেই ব্যক্তির মত উঠবে, শয়তান যাকে স্পর্শ দ্বারা পাগল বানিয়ে দিয়েছে। এটা এজন্য হবে যে, তারা বলেছিল, ‘ব্যবসাও তো সুদেরই মত। অথচ আল্লাহ বিক্রিকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তির নিকট তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে উপদেশ-বাণী এসে গেছে, সে যদি (সুদী কারবার হতে) নিবৃত্ত হয়, তবে অতীতে যা-কিছু হয়েছে তা তারই। আর তার (অভ্যন্তরীণ অবস্থার) ব্যাপার আল্লাহর এখতিয়ারে। আর যে ব্যক্তি পুনরায় (সে কাজই) করল, তো এরূপ লোক জাহান্নামী হবে। তারা তাতেই সর্বদা থাকবে। সূরাঃ আল বাকারা - আয়াত নংঃ ২৭৫

৩.

আয়াতঃ وَتَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡبِرِّ وَالتَّقۡوٰی ۪ وَلَا تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡاِثۡمِ وَالۡعُدۡوَانِ ۪ وَاتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ

অর্থঃ তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অন্যকে সহযোগিতা করবে। গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহযোগিতা করবে না। আল্লাহকে ভয় করে চলো। নিশ্চয়ই আল্লাহর শাস্তি অতি কঠিন। সূরাঃ আল মায়িদাহ - আয়াত নংঃ ২

৪.

আয়াতঃ اِنَّ الَّذِیۡنَ یُحِبُّوۡنَ اَنۡ تَشِیۡعَ الۡفَاحِشَۃُ فِی الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ۙ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ وَاَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ

অর্থঃ স্মরণ রেখ, যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার হোক এটা কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে আছে যন্ত্রণাময় শাস্তি এবং আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না। সূরাঃ আন নূর - আয়াত নংঃ ১৯

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম