প্রতিদিনের যে ৮ নফল নামাজে বরকতময় হয়ে ওঠে মুমিনের জীবন
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নফল ইবাদত বান্দার আমলনামার এক অতুলনীয় সৌন্দর্য। ফরজ ও সুন্নতে মুআক্কাদা আদায়ের পর নফল ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা খুব দ্রুত মহান আল্লাহর প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠে। প্রতিটি রুকু, সেজদা ও তাসবিহের বিনিময়ে বান্দার মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, কিয়ামতের দিন ফরজের হিসাবের সময় কোনো ঘাটতি দেখা দিলে এই নফল ইবাদত দিয়েই সেই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ত্রুটিগুলো পূরণ করা হবে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عَمَلِهِ: فَإِنْ صَلُحَتْ فَقَدْ أَفْلَحَ وَأَنْجَحَ، وَإِنْ فَسَدَتْ فَقَدْ خَابَ وَخَسِرَ، فَإِنِ انْتَقَصَ مِنْ فَرِيضَتِهِ شَيْءٌ، قَالَ الرَّبُّ عَزَّ وَجَلَّ: انظُرُوا هَلْ لِعَبْدِي مِنْ تَطَوُّعٍ؟ فَيُكَمَّلُ بِهَا مَا انْتَقَصَ مِنَ الْفَرِيضَةِ، ثُمَّ تَكُونُ سَائِرُ أَعْمَالِهِ عَلَى ذَلِكَ
‘নিশ্চয় কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার নামাজের (ফরজ নামাজ) হিসাব নেওয়া হবে। যদি তা সঠিক হয়, তাহলে সে পরিত্রাণ ও সফলতা লাভ করবে। আর যদি খারাপ হয়, তাহলে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি তার ফরজের মধ্যে কিছু কম পড়ে যায়, তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, ‘দেখ তো! আমার বান্দার নফল (ইবাদত) আছে কি না?’ তা দিয়ে ফরজের ঘাটতি পূরণ করা হবে। এরপর অন্যান্য আমলের হিসাবও একইভাবে নেওয়া হবে।’ (তিরমিজি ৪১৩, আবু দাউদ ৮৬৪)
তাই মুমিন মুসলমানের উচিত, আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগ ও পরকালের পাথেয় পেতে প্রতিদিন ৮ নফল নামাজ পড়ার সুযোগ রয়েছে। যার বর্ণনা নিচে তুলে ধরা হলো—
১. তাহাজ্জুদের নামাজ
ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামাজ হলো তাহাজ্জুদ। রাতের নিস্তব্ধতায় আরামের ঘুম ভেঙে এই নামাজ আদায় করা হয় বিধায় এর সওয়াব ও মর্যাদা অনেক বেশি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ
‘তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে পৃথক হয়ে যায় এবং তারা নিজ প্রতিপালককে ভয় ও আশা মিশ্রিত অনুভূতি নিয়ে ডাকে এবং আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।’ (সুরা আস-সিজদা: আয়াত ১৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
وَأَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ
‘আর ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামাজ হলো রাতের (তাহাজ্জুদের) নামাজ।’ (মুসলিম ১১৬৩)
২. ইশরাকের নামাজ
সকালে ফজর নামাজের পর সূর্য পুরোপুরি উদিত হয়ে গেলে দুই থেকে চার রাকাত নফল নামাজ আদায় করাকে ইশরাক বলা হয়। ফজরের পর জামাতে নামাজ পড়ে জিকির-আসকারে সময় কাটিয়ে সূর্যোদয়ের পর এই নামাজ আদায় করলে রয়েছে পূর্ণ হজ ও ওমরার সওয়াব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ صَلَّى الْغَدَاةَ فِي جَمَاعَةٍ ثُمَّ قَعَدَ يَذْكُرُ اللَّهَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ كَانَتْ كَلَحْجِ عُمْرَةٍ تَامَّةٍ تَامَّةٍ تَامَّةٍ
‘যে ব্যক্তি জামাতের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করল এবং সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহর জিকিরে বসে থাকল, অতঃপর দুই রাকাত নামাজ আদায় করল, সে একটি পরিপূর্ণ হজ ও ওমরাহর সওয়াব পাবে।’ (তিরমিজি ৫৮৬)
৩. চাশত বা দুহার নামাজ
সূর্য মধ্যাকাশে স্থির হওয়ার আগ মুহূর্তে এই নামাজ পড়া হয়। হাদিসে এর অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। যেমনটি রাসুলুল্লাহ (সা.) তার প্রিয় সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.)-কে অসিয়ত করেছিলেন—
أَوْصَانِي خَلِيلِي بِثَلَاثٍ لَا أَدَعُهُنَّ حَتَّى أَمُوتَ: صَوْمِ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ، وَصَلَاةِ الضُّحَى، وَنَوْمٍ عَلَى وِتْرٍ
‘আমার প্রিয়তম (রাসুল) আমাকে তিনটি বিষয়ে অসিয়ত করেছেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি যেন তা ত্যাগ না করি: প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখা, দুহা বা চাশতের নামাজ পড়া এবং ঘুমানোর আগে বিতর আদায় করা।’ (বুখারি ১১৮)
অন্য হাদিসে এসেছে, চাশতের নামাজ আদায়কারী উদাসীনদের তালিকাভুক্ত হয় না এবং নিয়মিত ১২ রাকাত পড়লে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করেন। (তাবারানির ৬৭১)
৪. আওয়াবিনের নামাজ
মাগরিবের ফরজ ও সুন্নত নামাজের পর কমপক্ষে ছয় রাকাত নফল নামাজ পড়া আউওয়াবিন নামে পরিচিত। এশার ওয়াক্ত আসার আগ পর্যন্ত এটি পড়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
مَنْ صَلَّى بَعْدَ الْمَغْرِبِ سِتَّ رَكَعَاتٍ لَمْ يَتَكَلَّمْ بَيْنَھُنَّ بِسُوءٍ عُدِلْنَ لَهُ بِعِبَادَةِ ثِنْتَيْ عَشْرَةَ سَنَةً
‘যে ব্যক্তি মাগরিবের পর (সুন্নত ও নফল মিলিয়ে) ছয় রাকাত নামাজ আদায় করবে এবং এর মাঝে কোনো মন্দ কথা বলবে না, তার আমলনামায় ১২ বছরের ইবাদতের সওয়াব লেখা হবে।’ (ইবনে মাজাহ ১১৬৭)
৫. তাহিয়্যাতুল অজু
সুন্নত তরিকা অনুযায়ী উত্তমরূপে অজু করার পর দুই রাকাত নফল নামাজ পড়া হলো তাহিয়্যাতুল অজু। অপবিত্র অবস্থা থেকে পবিত্রতা অর্জনের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এটি আদায় করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَا مِنْ عَبْدٍ يَتَوَضَّأُ فَيُحْسِنُ وُضُوءَهُ ثُمَّ يَقُومُ فَيُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ مُقْبِلٌ عَلَيْهِمَا بِقَلْبِهِ وَوَجْهِهِ إِلَّا وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ
‘যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু করল এবং নিষ্ঠার সঙ্গে (মনোযোগ সহকারে) দুই রাকাত নামাজ আদায় করল, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়।’ (মুসলিম ২৩৪)
৬. তাহিয়্যাতুল মসজিদ
মসজিদে প্রবেশ করে বসার পূর্বে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করাকে তাহিয়্যাতুল মসজিদ বলা হয়। মসজিদে উপস্থিত হওয়ার নেয়ামতের শুকরিয়া হিসেবে এটি পড়তে হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمُ الْمَسْجِدَ فَلَا يَجْلِسْ حَتَّى يُصَلِّيَ رَكْعَتَيْنِ
‘তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে সে যেন বসার আগে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে নেয়।’ (বুখারি ১১৬৭)
৭. সালাতুল হাজাত
বিশেষ কোনো প্রয়োজন বা সংকটে পড়ে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করার জন্য দুই রাকাত নফল নামাজ পড়া হলো সালাতুল হাজাত। নিষিদ্ধ সময় ছাড়া যেকোনো সময় এটি পড়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে অজু করে এই বিশেষ নামাজ আদায় করবে এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করবেন।’ (তিরমিজি ৪৭৮)
৮. তাওবার নামাজ
মানুষ মাত্রই ভুল। কিন্তু কোনো গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে তওবার নিয়তে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَا مِنْ عَبْدٍ يُذْنِبُ ذَنْبًا ثُمَّ يَتَطَهَّرُ فَيُصَلِّي ثُمَّ يَسْتَغْفِرُ اللَّهَ إِلَّا غَفَرَ لَهُ
‘যখন কোনো বান্দা পাপ করে ফেলে, এরপর সে ভালোভাবে অজু করে এবং দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে, তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে—আল্লাহ তাকে অবশ্যই ক্ষমা করে দেন।’ (আবু দাউদ ১৫২১)
ফরজ ইবাদত হলো দ্বীনের মূল ভিত, আর নফল ইবাদত হলো সেই অট্টালিকার সৌন্দর্য ও সুরক্ষার চাদর। জীবনের নানা ব্যস্ততার ফাঁকে নফল ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা যেমন দুনিয়াতে আল্লাহর প্রিয়ভাজন হতে পারি, তেমনি পরকালের হিসাবের দিনেও নিজেদের আমলনামাকে ভারী করতে পারি। আসুন, বেশি বেশি নফল ইবাদতের মাধ্যমে জীবনকে বরকতময় করে তুলি।

