আত্মীয়-স্বজন জালেম হলে আপনার আচরণ কেমন হবে?
Advertisement
মুহাম্মাদ রুহুল্লাহ শাজুলি
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক ইবাদত। তবে বাস্তব জীবনে অনেক সময়ই এমন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যখন কোনো নিকটাত্মীয় জালেম, অন্যায়কারী কিংবা মানসিকভাবে নির্যাতনকারী হয়ে ওঠেন। তখন একপাশে দাঁড়ায় আত্মমর্যাদা ও অধিকার রক্ষার তাগিদ, আর অন্যপাশে থাকে আত্মীয়তার বন্ধন ধরে রাখার ঐশ্বরিক নির্দেশ। এই দোটানায় ইসলাম আমাদের অন্ধভাবে অন্যায় মেনে নিতে বলে না, আবার হুট করে সম্পর্ক ছিন্ন করার অনুমাতিও দেয় না। বরং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলাম আমাদের এক অনন্য ও ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখায়, যেখানে ন্যায়বিচার ও উত্তম আচরণের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।
১. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন না করা
আত্মীয় যত অন্যায়কারীই হোক না কেন, সম্পর্ক পুরোপুরি ছেঁটে ফেলা মুমিনের আচরণ হতে পারে না। সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে, কিন্তু একেবারে সম্পর্ক ছিন্ন করা কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَالَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ ۙ أُولَٰئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ
‘আর যারা আল্লাহর সঙ্গে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে, তাদের জন্যই রয়েছে অভিশাপ এবং তাদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট বাসস্থান।’ (সুরা আর-রাদ: আয়াত ২৫)
সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার কিছু আত্মীয় আছে, আমি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখি কিন্তু তারা তা কেটে ফেলে; আমি তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করি আর তারা আমার সঙ্গে মন্দ ব্যবহার করে।’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন—
لَئِنْ كُنْتَ كَمَا قُلْتَ فَكَأَنَّمَا تُسِفُّهُمُ الْمَلَّ وَلاَ يَزَالُ مَعَكَ مِنَ اللَّهِ ظَهِيرٌ عَلَيْهِمْ مَا دُمْتَ عَلَى ذَلِكَ
‘তুমি যদি তেমনই হও যেমনটি বললে, তবে তুমি যেন তাদের মুখে উত্তপ্ত ছাই ঢেলে দিচ্ছ। আর যতক্ষণ তুমি এই অবস্থায় থাকবে, ততক্ষণ তাদের বিরুদ্ধে তোমার সঙ্গে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন সাহায্যকারী (ফেরেশতা) থাকবেন।’ (মুসলিম ২৫৫৮)
২. অন্যায়ের বিপরীতে ধৈর্য ও উত্তম আচরণ
অন্যায়, অপমান কিংবা মন্দের জবাব আচরণ খারাপ না করে সুন্দর ও মার্জিত আচরণের মাধ্যমে অন্যায়কে প্রতিহত করাই হলো ইমানি দৃঢ়তার পরিচয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ۚ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ
‘ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। আপনি মন্দকে প্রতিহত করুন তা দিয়ে যা সবচেয়ে উত্তম। ফলে আপনার সঙ্গে যার শত্রুতা রয়েছে, সে হয়ে যাবে আপনার পরম অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।’ (সুরা ফুসসিলাত: আয়াত ৩৪)
৩. উত্তম উপদেশে অসৎকাজ থেকে বিরত থাকা
অন্যায় দেখে নীরব থাকা ইসলামের শিক্ষা নয়। জালেম বা অত্যাচারী আত্মীয়কে সুসংহত ও সুন্দর ভাষায় সত্যের পথ দেখানো কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা আদেশ করেছেন—
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
‘আপনি আপনার প্রতিপালকের পথের দিকে আহ্বান করুন প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে তর্ক-আলোচনা করুন সবচেয়ে সুন্দর পন্থায়।’ (সুরা আন-নাহল: আয়াত ১২৫)
এছাড়াও আল্লাহ তাআলা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ সম্পর্কে ঘোষণা করেন—
وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنَهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ ۚ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
‘আর যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল থাকে, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে; আর তারাই সফলকাম।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১০৪)
৪. রূঢ় আচরণ এড়িয়ে চলা ও শালীনতা বজায় রাখা
আত্মীয়তার বন্ধন সুসংহত করতে উপদেশ কাজ না করলে এবং আত্মীয় ক্রমাগত রূঢ় আচরণ করলে তাদের অজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে ক্ষমা ও শালীনতা বজায় রাখা প্রজ্ঞার পরিচয়। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ
‘আপনি ক্ষমার নীতি অবলম্বন করুন, সৎকাজের নির্দেশ দিন এবং অজ্ঞদের এড়িয়ে চলুন।’ (সুরা আল-আ'রাফ: আয়াত ১৯৯)
আত্মীয়তার সুসম্পর্ক বজায় রাখায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পুরো জীবনই ছিল এর বাস্তব রূপায়ন। মক্কায় নিজ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশির জুলুম নির্যাতনের চরম মুহূর্তেও তিনি তাদের অকল্যাণ চাননি, করেননি বদদোয়া। এমনকি তিনি তায়েফের মতো অপরিচিত জায়গায় রক্তাপ্লুত হয়েও তিনি জুলুমকারীদের ধ্বংস চাননি, বরং তাদের জন্য করেছিলেন হেদায়েত তথা সুপথপ্রাপ্তির দোয়া।
৫. আত্মরক্ষায় অন্যায়ের পদ্ধতিগত প্রতিবাদ
ক্ষমা ও সহনশীলতার অর্থ অন্যায় সহ্য করে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া নয়। জালেম আত্মীয়ের ক্ষতি থেকে নিজেকে ও নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে শরিয়াহসম্মত উপায়ে আত্মরক্ষা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্ণ অধিকার দিয়েছে ইসলাম। আল্লাহ তাআলা বিষয়টি এভাবে তুলে ধরে বলেন—
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সুরা আর-রাদ: আয়াত ১১)
অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিবাদে নবীজির শিক্ষা ছিল কত মহান। আবেগের সর্বোচ্চ চূড়ায় হৃদয় ছোঁয়া। নবীজির (সা.) ঘোষণায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার তাগিদ এভাবে ওঠে এসেছে। তিনি ঘোষণা করেন—
انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا
‘তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য কর— চাই সে জালেম হোক কিংবা মজলুম।’
সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! মজলুমকে সাহায্য করা তো বুঝলাম, কিন্তু জালেমকে কীভাবে সাহায্য করব?’ তিনি বললেন—
تَحْجُزُهُ أَوْ تَمْنَعُهُ مِنَ الظُّلْمِ فَإِنَّ ذَلِكَ نَصْرُهُ
‘তাকে অন্যায় ও জুলুম করা থেকে বিরত রাখবে, আর এটিই তাকে সাহায্য করা।’ (বুখারি ২৪৪৪)
৬. অন্যায় ও অত্যাচার মোকাবেলার বাস্তবমুখী কৌশল
- হেদায়েতের জন্য দোয়া: মন থেকে তাদের জন্য সঠিক পথের হিদায়াত চেয়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া করা।
- সীমিত নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা: যাতে তারা নতুন কোনো ক্ষতি করতে না পারে, অথচ সালাম-কুশল ও মানবিক প্রয়োজনে মৌলিক সম্পর্কও বহাল থাকে।
- অন্যায় কাজে সহযোগিতা না করা: তাদের অন্যায় পদক্ষেপে কখনোই শরিক না হওয়া।
- আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক বিচার চাওয়া: জুলুম সীমা অতিক্রম করলে দায়িত্বশীল মুরুব্বি বা আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার চাওয়া।
- ধৈর্য ধরে প্রতিদানের আশা করা: চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কোনো প্রতিশোধ নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আত্মিক প্রশান্তি লাভ।
জালেম বা অন্যায়কারী আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন এক ইমানি পরীক্ষা। একদিকে যেমন চরম ক্ষোভের মুখেও সম্পর্কের মৌলিক সুতো ছেঁড়া যাবে না, অন্যদিকে অন্যায়ের সামনে নিজের অসহায়ত্বকে সঁপে দেওয়াও ইসলামের উদ্দেশ্য নয়।
প্রকৃত মুমিন তিনি, যিনি অন্যায়কে ঘৃণা করলেও অন্যায়কারী আত্মীয়কে শুধরে নেওয়ার মানসিকতা রাখেন; ক্ষমার বিশালতা দেখানোর পাশাপাশি নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রজ্ঞাবান পদক্ষেপে সীমানা নির্ধারণ করেন। আখিরাতের মহাপুরস্কারের পাশাপাশি দুনিয়ার জীবনেও প্রকৃত মানসিক শান্তি অর্জনের জন্য প্রতিশোধের বিষবাষ্প ভুলে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে চলাই মুমিন মুসলমান ইমানি দায়িত্ব ও কাজ।
লেখক: ইসলামিক স্কলার, মুফাচ্ছিরে কুরআন ও পীর সাহেব, শাজুলিয়া দরবার শরিফ


