Logo
Logo
×

Advertisement

লাইফ স্টাইল

সারাক্ষণ কানে হেডফোন রেখে অজান্তেই যেসব ক্ষতি হচ্ছে তরুণদের

Advertisement

Icon

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম

সারাক্ষণ কানে হেডফোন রেখে অজান্তেই যেসব ক্ষতি হচ্ছে তরুণদের

Advertisement

গান, পডকাস্ট কিংবা অডিওবুক—বিনোদন ও একঘেয়েমি দূর করতে হেডফোনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে তরুণ প্রজন্মের। তবে সারাক্ষণ কানে হেডফোন রেখে চলার অভ্যাস কমিয়ে দিতে পারে মানুষের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত যোগাযোগের সুযোগ, ব্যাহত করতে পারে চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা এবং নিজের চিন্তার সঙ্গে সময় কাটানোর অভ্যাস।

কর্মস্থলে যাওয়া, ঘরের কাজ করা কিংবা অবসর কাটানো—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনেক তরুণের সঙ্গী এখন হেডফোন। কেউ গান শুনছেন, কেউ পডকাস্টে ডুবে থাকছেন। একঘেয়ে কাজকে উপভোগ্য করে তোলার এই অভ্যাস ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর ফলে অজান্তেই মানুষের সামাজিক যোগাযোগ ও মনোযোগের অভ্যাসে পরিবর্তন আসছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ২৪ বছর বয়সি আতিরা গালির অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। গত বছরের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই স্পটিফাইয়ে তার গান শোনার সময় ৩৩ হাজার ৫০০ মিনিট ছাড়িয়ে যায়। প্ল্যাটফর্মটির বার্ষিক ব্যবহার-পর্যালোচনায় উঠে আসে এ তথ্য।

সিএনএনকে গালি জানান, হেডফোন ছাড়া বাসন ধোয়ার মতো সাধারণ কাজ করতেও তার বিরক্ত লাগে। একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এই তরুণী সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পরই গান বা পডকাস্ট শোনা শুরু করেন। কর্মস্থলে বৈঠক কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে কথোপকথনের সময় ছাড়া দিনের বেশির ভাগ সময় তার কানে হেডফোন থাকে। বাড়ি ফেরার পথ থেকে শুরু করে রাতের ঘরের কাজেও চলে অডিও।

গালির মতো এমন অভিজ্ঞতা এখন অনেক তরুণের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এডিসন রিসার্চের এক জরিপ অনুযায়ী, ১৩ থেকে ৩৪ বছর বয়সিরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা গান, পডকাস্টসহ বিভিন্ন ধরনের অডিও শোনেন। অন্যদিকে, স্পটিফাইয়ের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে প্ল্যাটফর্মটিতে গান শোনার মোট কার্যক্রমের প্রায় ৫৬ শতাংশ এসেছে জেনারেশন জেড বা জেন জি ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে।

হেডফোন কি সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দিচ্ছে?

হেডফোন ব্যবহার অনেক সময় ব্যক্তিগত পরিসর তৈরি করতে সাহায্য করে। তবে এর ফলে আশপাশের মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক কথোপকথনের সুযোগও কমে যেতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আরভাইন ক্যাম্পাসের ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক গ্লোরিয়া মার্ক মনে করেন, মানুষ সব সময় সচেতনভাবে অন্যদের এড়িয়ে চলার উদ্দেশ্যে হেডফোন ব্যবহার না করলেও অভ্যাসটি তাদের সামাজিকভাবে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে।

উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর হেলদি মাইন্ডসের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক রিচার্ড ডেভিডসনের পর্যবেক্ষণেও একই প্রবণতা দেখা যায়। তার ধারণা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চলাফেরা করা শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশই এখন হেডফোন ব্যবহার করেন। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও পটভূমির মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। কিন্তু সবাই যদি নিজেদের অডিও জগতে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সেই পরিচিতি ও যোগাযোগের সুযোগ কমে যায়।

এই পরিবর্তন শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়। কফিশপে কিংবা কোথাও অপেক্ষা করার সময়ও অনেককে ফোনে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। ফলে পাশের অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে সামান্য কথা বলা, হাসি বিনিময় করা কিংবা নতুন পরিচয় তৈরির স্বাভাবিক সুযোগগুলোও কমে যেতে পারে।

ডেভিডসনের মতে, অপেক্ষার সময়টুকু সব সময় ফোন বা হেডফোন দিয়ে পূরণ করার প্রয়োজন নেই। কখনো আশপাশের মানুষের সঙ্গে ছোট্ট কথোপকথনও ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।

একাকিত্ব কমাতে ছোট ছোট যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ মানসিক সুস্থতা ও ভালো থাকার অনুভূতি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। পরিচিতজনদের পাশাপাশি অপরিচিত মানুষের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কথোপকথনও দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে হেডফোন ব্যবহার করলেই কেউ একাকী হয়ে পড়বেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বরং সমস্যা তৈরি হতে পারে তখনই, যখন এই অভ্যাসের কারণে কেউ বারবার সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ এড়িয়ে যান বা আশপাশের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দেন।

নিউইয়র্কের আরেক তরুণী অ্যানাবেল ফ্র্যাঙ্কলিনের অভিজ্ঞতাতেও উঠে এসেছে এই পরিবর্তনের বিষয়টি। তিনি জানান, ঘুম থেকে ওঠার পরই গান শোনা শুরু করেন এবং দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা গান বা পডকাস্ট চলে। তার কাছে হেডফোন মূলত দৈনন্দিন রুটিনের অংশ।

তবে পুরোনো একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে তিনি লক্ষ করেন, আগে মানুষ অপেক্ষা করার সময় ফোন বা হেডফোন ছাড়াই চারপাশ দেখত কিংবা নিজের চিন্তায় মগ্ন থাকত। বর্তমান সময়ে এমন দৃশ্য তুলনামূলক কম চোখে পড়ে বলে তার মনে হয়েছে।

নীরবতার সঙ্গে সময় কাটানোর অভ্যাস হারাচ্ছে মানুষ?

হেডফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের আরেকটি দিক হলো নীরবতার সঙ্গে স্বচ্ছন্দ থাকার অভ্যাস। কোনো কাজ করতে গিয়ে একঘেয়েমি অনুভব করলেই গান চালিয়ে দেওয়া কিংবা অবসর পেলেই পডকাস্ট শোনার প্রবণতায় মানুষ নিজের চিন্তাভাবনা পর্যবেক্ষণের সুযোগ কম পেতে পারেন।

অধ্যাপক গ্লোরিয়া মার্কের মতে, মানুষ এখন অনেক সময় চুপচাপ বসে থাকা, নীরবতা উপভোগ করা কিংবা একঘেয়েমিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার বদলে দ্রুত অন্য কোনো কাজে মনোযোগ সরিয়ে নেন। অথচ নীরব সময়ও নিজের ভাবনা বোঝা ও চারপাশের অভিজ্ঞতা উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

হেডফোন ব্যবহার থেকে বিরতি নিলে মানুষ নিজের বর্তমান কাজের প্রতি আরও সচেতন হতে পারেন। একই সঙ্গে আশপাশে কী ঘটছে, তা লক্ষ করার সুযোগও বাড়ে।

মনোযোগ ধরে রাখার সক্ষমতায় কী প্রভাব পড়ে?

সেন্টার ফর হেলদি মাইন্ডসের পরিচালক রিচার্ড ডেভিডসনের মতে, মনোযোগ ধরে রাখা মানে শুধু কোনো একটি বিষয়ে তাকিয়ে থাকা নয়; বরং সচেতনভাবে মনকে নির্দিষ্ট কাজে যুক্ত রাখা এবং অপ্রাসঙ্গিক চিন্তায় বারবার হারিয়ে না যাওয়া।

গান শোনা বা ফোন স্ক্রল করার মতো কাজ সাময়িকভাবে বিরক্তি কমাতে পারে। কিন্তু এগুলো সব সময় মনের অস্থিরতা বা বারবার একই চিন্তায় ফিরে যাওয়ার প্রবণতার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব অভ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিজের চিন্তাভাবনার সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোর সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে।

২০১০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, প্রাপ্তবয়স্করা জেগে থাকা সময়ের প্রায় ৪৭ শতাংশ এমন অবস্থায় কাটান, যখন তাদের মন বর্তমান কাজ থেকে অন্যদিকে চলে যায়। তবে এই পুরোনো গবেষণার ফলাফল দিয়ে বর্তমান সময়ে একই প্রবণতা বেড়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

হেডফোন ছাড়া চলার অভ্যাস গড়তে চান তরুণরা

নিজের হেডফোন ব্যবহারের অভ্যাস নিয়ে কৌতূহল থেকেই একসময় গান না শুনে কর্মস্থলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন আতিরা গালি। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, গান ছাড়া চলাফেরা করলে চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়া যায় কি না।

পরীক্ষা শুরুর মাত্র দুই দিনের মধ্যে নিজের পরিচিত এলাকার কয়েকটি নতুন দোকানের সাইনবোর্ড তার চোখে পড়ে। অথচ প্রতিদিন একই পথে যাতায়াত করলেও আগে সেগুলো তার নজরে আসেনি।

গালির ধারণা, হেডফোন কানে থাকলে তিনি মাথা নিচু করে নিজের মতো হাঁটতেন। গান বন্ধ রাখার ফলে চারপাশে কী ঘটছে, তা খেয়াল করার সুযোগ পেয়েছেন।

তার এই অভিজ্ঞতা দেখায়, পরিচিত পরিবেশেও অনেক কিছু আমাদের নজর এড়িয়ে যেতে পারে। তবে এটি একজনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা; সবার ক্ষেত্রেই একই ফল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

তাহলে কি হেডফোন ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হবে?

না। গান শোনা বা পডকাস্ট উপভোগ করা নিজে থেকে ক্ষতিকর নয়। বরং অনেকের কাছে এটি আনন্দ, বিনোদন ও মানসিক স্বস্তির উৎস। মূল বিষয় হলো, ব্যবহারটি যেন দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক যোগাযোগ কিংবা আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

অভ্যাসে ভারসাম্য আনতে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করা যেতে পারে—

  • প্রতিদিন কিছু সময় গান বা পডকাস্ট ছাড়াই হাঁটার চেষ্টা করুন।
  • পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় হেডফোন খুলে রাখুন।
  • খাবার খাওয়ার সময় বা ঘরের সাধারণ কাজের কিছু অংশ নীরবে করার অভ্যাস গড়ুন।
  • রাস্তায় চলাফেরা বা যানবাহন পারাপারের সময় আশপাশের শব্দ ও পরিস্থিতির প্রতি সতর্ক থাকুন।
  • দীর্ঘ সময় অডিও শুনলে শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করুন এবং প্রয়োজনমতো বিরতি নিন।

বিশেষ করে দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দে হেডফোন ব্যবহার শ্রবণশক্তির ক্ষতি করতে পারে। তাই শব্দের মাত্রা ও ব্যবহারের সময়—দুটির প্রতিই নজর রাখা জরুরি।

হেডফোন আধুনিক জীবনের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ হলেও সারাক্ষণ এর ওপর নির্ভরশীল থাকা প্রয়োজন নেই। গান শোনার পাশাপাশি চারপাশের মানুষ, পরিবেশ এবং নিজের চিন্তাভাবনার জন্যও কিছুটা সময় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। অভ্যাসে সামান্য পরিবর্তনই দৈনন্দিন জীবনে আরও সচেতন ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সূত্র: সিএনএন

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

১৮ মিনিট হাঁটলেই কমবে ওজন

১৮ মিনিট হাঁটলেই কমবে ওজন

সারাক্ষণ কানে হেডফোন রেখে অজান্তেই যেসব ক্ষতি হচ্ছে তরুণদের

সারাক্ষণ কানে হেডফোন রেখে অজান্তেই যেসব ক্ষতি হচ্ছে তরুণদের

৫০ পেরোলেই অর্ধেক পুরুষের প্রস্টেট বড় হওয়ার ঝুঁকি, এই ৬ লক্ষণে সতর্ক হোন

৫০ পেরোলেই অর্ধেক পুরুষের প্রস্টেট বড় হওয়ার ঝুঁকি, এই ৬ লক্ষণে সতর্ক হোন

সামান্য ব্যথা হলেই পেইনকিলার খেয়ে শরীরের ক্ষতি করছেন না তো?

সামান্য ব্যথা হলেই পেইনকিলার খেয়ে শরীরের ক্ষতি করছেন না তো?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম