Logo
Logo
×

Advertisement

লাইফ স্টাইল

বাংলার দারুশিল্প ও ইতিহাস

Advertisement

Icon

হাসান মাহমুদ রিপন

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২১, ০৩:০৭ এএম

বাংলার দারুশিল্প ও ইতিহাস

Advertisement

ঐতিহ্য কৃষ্টি সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি নিদর্শন নিজ নিজ ক্ষেত্রে এক অবিনশ্বর স্বতন্ত্র চলমান ইতিহাস। নিখুঁত শিল্পকর্ম দারুশিল্প বা কাঠের শিল্পকর্ম ঐতিহ্য ও কৃষ্টি সংস্কৃতির একটি অংশ।

শিল্পের বিভিন্ন ধারার মধ্যে দারু বা কাঠশিল্প একটি স্থান দখল করে আছে। কাঠ মানুষের সবচেয়ে সহজলভ্য ও প্রয়োজনীয় উপাদান। কাঠ কেটে খোদাই করে যখন নানারকম চিত্র,ভাস্কর্য, নারীমূর্তি নির্মাণ করা হয়, তখন সেই কাঠ রসকষহীনের পরিবর্তে দৃষ্টিনন্দন মনোহরকারী হয় এক শিল্পকর্ম।

অতীত জনগোষ্ঠী গাছের কাঠ নানাভাবে ব্যবহার করে দৃষ্টিনন্দন সুন্দর সুন্দর ধর্মীয় ভাস্কর্য, পৌরাণিক কাহিনী, লোকশিল্প ইত্যাদি নির্মাণ করেছে। কাঠ মানুষের জীবনের এতই প্রয়োজনীয় যে, জন্মের পর দোলনা থেকে শুরু করে শবযাত্রা পর্যন্ত সবখানেই কাঠ মানুষের সঙ্গী হয়ে আছে।

দারুশিল্পীরাও কাঠের উপর চাঁদ, তারা, পশুপাখি, লতাপাতা, প্রাকৃতিক পরিবেশসহ বিভিন্ন শিল্পকর্ম খোদাই করে তাদের শৈল্পিকতার ভাব ফুটিয়ে তুলে। পাল এবং সেন যুগেও অন্যান্য ধাতব ভাস্কর্যের পাশাপাশি কাঠ ছিল শিল্পকর্ম তৈরির জনপ্রিয় মাধ্যম। তবে এ দেশের আবহাওয়া এবং রাজনৈতিক কারণে আমাদের দারুশিল্প বিলুপ্তির পথে।

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য শাসনামলে কাঠ ও কাঠের তৈরি ভাস্কর্য তথা দারুশিল্প পরিপূর্ণ শোভিত ছিল মর্মে গ্রিক দূত মেগস্থিনিসের বিবরণ হতে জানা যায়।

প্রত্নতাত্ত্বিক উপাত্তে ভরপুর হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোয় প্রাপ্ত সিলমোহরে উৎকীর্ণ নানাবিধ নকশা থেকে সহজে অনুমেয় যে, সিলমোহরে নকশাযুক্ত এবং নানা জীবজন্তুর মূর্তি অঙ্কিত বা খোদিত দারুনির্মিত আসবাবপত্র হাজার বছর পূর্বেও তৈরি করা হতো। প্রাগৈতিহাসিক যুগের নৃতাত্ত্বিক বিবর্তনের ধারায় শিকার ও আত্মরক্ষার জন্য মানুষ সর্বপ্রথম কাঠদণ্ড ব্যবহার করেছিল। মানব সভ্যতার প্রস্তর কিংবা আদি যুগ হতে মানুষ কাঠের ব্যবহার রপ্ত করেছিল।

কালের বিবর্তনে সভ্যতার উন্নয়ন ধারায় মানবগোষ্ঠী কাঠে সুন্দর ডিজাইন, মোটিফ, নকশা, আল্পনা, চিত্র, ভাস্কর্য ইত্যাদি সহজে খোদাই করে নানা বৈচিত্র্য আনয়ন করেছিল।

বাংলার দারুশিল্পীরা তাদের আপন অভিজ্ঞতা ও প্রতিভাকে প্রয়োগ করে বাসগৃহ, দরজা-জানালা, কপাট, প্যানেল, রথের কাঠামো, পূজনীয় ভাস্কর্য ও চণ্ডীমণ্ডপের বিবিধ চিত্র, মোটিফ অলংকরণ রচনায় একাগ্রচিত্রে মানোনিবেশ ও দক্ষতা, নিপূণতা অর্জনে ব্যাপৃত ছিল। সেই কাঠশিল্পীরা কালী, দুর্গা, জগধাত্রী, হর পার্বতীসহ নানারকম দেবদেবীও নির্মাণ করত। আবার কোন কোন দারুশিল্পী লক্ষীপেঁচা, মেয়ে পুতুল, নারী পুতুল, রামলক্ষণ, সীতা, রাবন ও মহাভারতে বর্ণিত নানা ঐতিহাসিক ঘটনা কাঠের মধ্যে খোদাই করে অপরূপ দৃষ্টিনন্দন অনন্য শিল্পকর্মের সৃষ্টি করার প্রয়াস পেত।

প্রাচীনকালে বা কয়েক শতাব্দী পূর্বেও মূল্যবান কাঠের প্রাপ্যতার সংখ্যা ছিল কম। দারুশিল্পের কাজে-কর্মে রাজা বাদশা তথা নৃপতিদের যথেষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক ছিল। তখন দারুশিল্পীদের কোনোরূপ আর্থিক দৈন্যতা ছিল না। অধ্যাবসায়, একাগ্রতা ও সৃষ্টিশীল মনোরম দারুশিল্প অনায়াসে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে সক্ষমতা লাভ করেছিল।

পরবর্তীতে এসবের অনুপস্থিতিতে কিংবা উপযুক্ততা বিহনে দারুশিল্প লুপ্ততার আশ্রয় নিয়েছে। তবুও এ দেশের গ্রামে গঞ্জের পল্লীর দারুশিল্পীরা তাদের বংশ পরস্পরায় স্বভাবসিদ্ধ কলাকৌশল কিছুটা হলেও পৈতৃক পেশা কোনরকমে টিকে রেখেছেন।

জানা গেছে, দারুশিল্পের শিল্পীরা মূলত ছিল সূত্রধর সম্প্রদায়ের। সুতো ধরে মাপজোখ করে কাজ করতো বলেই সামাজিক সম্প্রদায়ের নাম সূত্রধর।

এ সম্প্রদায়ের লোকজন কেউ তৈরি করে ভাস্কর্য, মূর্তি ও জীব-জানোয়ার। আবার কেউ তৈরি করে কাঠের স্থাপত্য, স্তম্ভ বা পিলার, দেয়ালচিত্র। কেউ তৈরি করে খাট পালঙ্ক, সিন্দুক, পালকি, ঢেঁকি। আবার কেউ কেউ তৈরি করে চেয়ার-টেবিলসহ নানা প্রকারের ব্যবহার্য আসবাবপত্র।

মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা জেলায় কিছু হিন্দু সম্প্রদায়ের সূত্রধরের লোকজন কাঠের অর্থাৎ দারুশিল্প কর্মের সাথে জড়িত। পূর্ব ঐতিহ্য থেকে নানা কারণে দারুশিল্পীরা বিচ্যুত হয়ে প্রভাবশালী শিল্পীগোষ্ঠী আজ অবজ্ঞাসূচক ছুতার (সূত্রধর) সম্প্রদায়ে রূপান্তরিত হয়েছে। অবনতি ঘটেছে সৃষ্টিশীল চিন্তা-চেতনার, হারিয়েছে দক্ষতা-অভিজ্ঞতা কিংবা সৃজনশীল মনোভাব। আজ তারা সাধারণ শ্রেণির ছুতার সম্প্রদায়।

বিদেশি মটিফে আসবাবপত্র তৈরি হলেও বাংলার লোকায়ত শিল্পশৈলীতে আসবাবপত্রের নিমার্ণ থেমে থাকেনি। গ্রামবাংলার দারুশিল্পীরা তাদের নিজস্ব শৈলীর সাথে কখনো বিদেশি নকশায় সম্মিলন ঘটিয়েছেন, আবার কখনো শুধুমাত্র লোকায়ত শৈলীতে বেড়া, সিন্দুক, খাট-পালঙ্ক, ঢেঁকি, পরী, ময়ূর, ঈগল, সিংহমুখ ইত্যাদি তৈরি করেছেন। দেশ বিভাজনের পর বাংলাদেশের অনেক সূত্রধর ভারত চলে যাওয়ায় বাংলাদেশে দারুশিল্পের অগ্রযাত্রা ঝিমিয়ে পড়ে। পরবর্তীতে সূত্রধরেরা দারুশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও আর্থ-সামাজিক অবস্থার কারণে এ শিল্প আর তেমন বিকশিত হতে পারেনি।

এদিকে গ্রামগঞ্জের সূত্র ধরে বিদেশি মোটিফের খাট-পালঙ্ক, চেয়ার-টেবিল ছাড়াও কৃষক শ্রমিক সাধারণ পরিবারের ব্যবহার্য ঢেঁকি, কাহাইল-ছিয়া, তরকারির চামচ, ভাতের হাতা (ডেউয়া), ডাল ঘুটনি, কাঠের সরা, কাপড় ধোয়ার চাষী, কলসের ঢাকনা, পিঁড়ি, জলচকি, লাঙ্গল ইত্যাদিসহ শিশুদের খেলনা, পুতুল, হাতি, ঘোড়া এসব তৈরি করতেন। দারু বা কাঠের এসব তৈজসপত্র শুধু যে তারা গ্রামের পাশের হাটবাজারে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে তৈরি করতেন তা নয়।
এসব সামগ্রী সোনারগাঁ লোক ও কারুশিল্প মেলা, বারদী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর উৎসব, লাঙ্গলবন্দ অষ্টমী স্নান উৎসব, সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও নদিয়া জেলার গঙ্গা সাগরের মেলা, আসামের বিভিন্ন বড় বড় মেলায় বিক্রির জন্য সারা বছর তৈরি করতেন।

বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী দারুশিল্প অনেক আধুনিক হয়েছে। দারুশিল্পীরা যা সুন্দর যা হৃদয়কে স্পর্শ করে তাই তারা নিজস্ব শৈলীতে তাদের নিজকর্মে খোদাই করেছেন। শুধু আসবাবপত্রই নয়, দারুশিল্প হিসেবে বাদ্যযন্ত্র, পুতুল, তৈজসপত্র, গৃহসজ্জার সামগ্রী, ভাস্কর্য, নৌকার অলংকরণ, একতারা, সারিন্দা, বিচিত্র বীণা ইত্যাদিও তারা তৈরি করে থাকেন।

দারুশিল্পের কারুকাজ সমৃদ্ধ অনেক শিল্পকর্মই আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্তমানে কাঠের দুষ্প্রাপ্যতা ও দুর্মূল্য, দক্ষ সূত্রধরের অভাব এবং আর্থ-সামাজিক অবক্ষয়ের ফলে কাঠের আসবাবপত্র তৈরিতে সাধারণ মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। তাছাড়া মজুরির অঙ্ক সাধারণ গৃহস্থের ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

প্রাচীনকাল থেকে আজঅবধি বাংলার দারুশিল্পীরা যে অসামান্য দক্ষতা দেখিয়েছেন, তা যেমন বিস্ময়কর তেমনি গৌরবোজ্জ্বল। তাই দারুশিল্পের ইতিহাস সমৃদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী। এ দারুশিল্প বাংলার হাজার হাজার বছর ধরে চলমান রয়েছে। বর্তমানে তা বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। তবুও শেঁকড়ের সন্ধানে আমাদের পরিদর্শন ও গবেষণা করা প্রয়োজন।

Advertisement

দারুশিল্প

Advertisement

আরও পড়ুন

দাঁড়িয়ে কাজ করায় হাঁটু-কোমরে ব্যথা

দাঁড়িয়ে কাজ করায় হাঁটু-কোমরে ব্যথা

রাতে ঘুম না আসলে যা করবেন

রাতে ঘুম না আসলে যা করবেন

চোখের মেকআপে যে ভুলগুলো ডেকে আনতে পারে বিপদ

চোখের মেকআপে যে ভুলগুলো ডেকে আনতে পারে বিপদ

ত্বকে কালো দাগ দূর করবেন যেভাবে

ত্বকে কালো দাগ দূর করবেন যেভাবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম