গাধার গৌরবগাথা: একসময়ের সমাজনায়ক আজকের গালি
Advertisement
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ১০:৪২ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আজ ৮ ই মে- বিশ্ব গাধা দিবস। গাধাদের নিয়েও আজ উৎসব হচ্ছে।
গাধা সমাজের জন্য এক বিরল সম্মানের দিন। ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়- একসময় গাধা ছিল গ্রামের ভরসা।
এখন গাধা শুধুই কৌতুকের উপাদান।
মানুষ বদলেছে, বদলেছে গাধার সম্মানও।
তবুও গাধারা প্রতিবাদ করতে শেখেনি।
তারা এখনো নীরবে বোঝা টেনে যায়।
মানুষ কিন্তু বোঝা টেনেও অহংকার করে।
একসময় গ্রামের হাটে গাধা চলত।
চালের বস্তা গাধার পিঠে উঠত।
ইটভাটায় গাধারা কর্মচারীর মর্যাদা পেত।
তখন ট্রাক ছিল বিরল রাজকীয় বস্তু।
গাধাই ছিল দরিদ্র মানুষের পরিবহণ।
অনেক ব্যবসায়ী গাধার উপরে নির্ভরশীল ছিলেন।
গাধা ছাড়া বাজার বসতো না প্রায়।
গাধা ছিল ছোটলোকের নির্ভরযোগ্য সহকারী প্রাণী।
গাধারা কখনো ধর্মঘট ডাকেনি আগে।
কখনো বেতন বৃদ্ধির দাবিও তোলেনি।
শুধু খড় পেলেই কাজ চালিয়েছে।
মানুষ হলে অবশ্য মিছিল বের করতো।
গাধারা সভা সমিতিও করতো না কখনো।
তাদের কোনো রাজনৈতিক দলও ছিল না।
তবুও তারা নিয়মিত জাতীয় সেবা দিয়েছে।
এমন দেশপ্রেম আজকাল বিরল হয়ে গেছে।
আগের দিনের কুমোরেরা গাধা ভালোবাসতো।
গাধা মাটি বহনে দক্ষ ছিল ভীষণ।
গরমে মানুষ হাঁপাতো, গাধা চলতো অবিরাম।
অনেক গাধা মালিকের চেয়েও কর্মঠ ছিল।
তবুও সম্মান পেত না ঠিকমতো কখনো।
মানুষ বরাবর অকৃতজ্ঞ প্রাণী হিসেবেই পরিচিত।
গাধাদের স্মৃতিশক্তিও নাকি অসাধারণ ভালো।
কিন্তু পরীক্ষায় বসার সুযোগ পায়নি কখনো।
সুযোগ পেলে অনেক মানুষ ফেল করতো।
গাধারা হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও হতে পারত।
কমপক্ষে তারা প্রশ্নফাঁস করতো না নিশ্চিত।
কখনো ভুয়া সার্টিফিকেটও বানাতো না নিশ্চয়ই।
তাদের বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজির অভিযোগও নেই কোথাও।
এখনকার শিশুরা গাধা দেখেই হাসে।
কারণ বইয়ে গাধাকে বোকা বানানো হয়েছে।
কার্টুনেও গাধা সবসময় হাসির চরিত্র থাকে।
কেউ গাধাকে জ্ঞানী প্রাণী হিসেবে দেখায়না।
এটা গাধাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক ষড়যন্ত্র বলা যায়।
মানুষ কাউকে অপমান করতে গাধা বলে।
কিন্তু গাধারা কখনো মানহানির মামলা করেনি।
এই সহনশীলতা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার বটে।
অনেক মানুষ সামান্য কথাতেই রেগে যায়।
গাধারা বরং শান্তির পুরস্কার পেতে পারত।
একবার এক গাধা নাকি অভিমান করেছিল।
মালিক তাকে সারাদিন গাধা বলেছিল।
গাধাটি নাকি ভীষণ অপমানিত হয়েছিল।
সে বলেছিল, “আমি তো গাধাই!”
“আপনি মানুষ হয়েও কেন গালি দেন?”
মালিক তখন নাকি লজ্জায় মাথা নিচু।
পাশের ছাগলটিও নাকি হাসতে শুরু করলো।
গ্রামের বুড়ো মুরুব্বিরা গাধা চিনতেন ভালো।
তারা জানতেন গাধা ভীষণ ধৈর্যশীল প্রাণী।
এখনকার নেতারা সেই গুণ শিখতে পারেন।
বিশেষ করে নির্বাচনের পরবর্তী সময়গুলোতে।
গাধারা প্রতিশ্রুতি দিয়ে পালিয়ে যায়না কখনো।
এটাও তাদের অসাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বটে!
একসময় ডাকপিয়নের সঙ্গেও গাধা থাকতো।
চিঠিপত্র বহনে গাধারা ভূমিকা রাখতো নীরবে।
তখন মোবাইল ফোন ছিল না কোথাও।
মানুষ অপেক্ষা করতো চিঠির আশায় প্রতিদিন।
গাধা ধীরে হাঁটলেও চিঠি পৌঁছাতো ঠিকই।
আজ ইন্টারনেট দ্রুত, সম্পর্কগুলো ধীর হয়ে গেছে।
গাধারা প্রেমপত্র বহনেও অভিজ্ঞ ছিল নাকি।
অনেক প্রেমিক গাধার উপরে নির্ভরশীল ছিলেন।
গাধা কখনো গোপন তথ্য ফাঁস করেনি।
আজকাল মানুষ স্ক্রিনশট দিয়েই সম্পর্ক নষ্ট করে।
ইটভাটার গাধাদের জীবন ছিল কঠিন ভীষণ।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্রম চলতো।
তবুও তারা ওভারটাইম বিল চাইতো না।
তাদের ইউনিয়ন নেতা ছিল না কোথাও।
কেউ টকশোতেও গাধাদের প্রতিনিধি ডাকেনি কখনো।
গাধারা নীরব শ্রমিক হিসেবেই জীবন কাটিয়েছে।
শহরের মানুষ এখন গাধা ভুলে গেছে।
তারা শুধু গাড়ির হর্ন শুনে অভ্যস্ত।
আগে গ্রামের পথে গাধার ডাক শোনা যেত।
সেই ডাকেও ছিল একধরনের সরলতা।
আজকের হর্নে শুধু বিরক্তি আর তাড়াহুড়ো।
গাধাদের সামাজিক জীবনও মজার ছিল খুব।
তারা দল বেঁধে চলতে পছন্দ করত।
কোন গাধা অন্য গাধাকে ছোট করতো না।
মানুষ কিন্তু সুযোগ পেলেই সমালোচনা শুরু করে।
গাধাদের ফেসবুক থাকলে হয়তো শান্তি থাকতো।
কারণ তারা কমেন্ট যুদ্ধে জড়াতো না।
একবার এক গাধা শহরে এসেছিল নাকি।
সে ট্রাফিক জ্যাম দেখে অবাক হয়েছিল।
বলেছিল, “মানুষ এত দ্রুত কোথায় যায়?”
পাশের ঘোড়া তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল চুপচাপ।
বলেছিল, “এরা দৌড়ায়, কিন্তু পৌঁছায় না।”
গাধাদের খাদ্যাভ্যাসও ছিল ভীষণ সাধারণ।
সামান্য ঘাস পেলেই তারা খুশি থাকতো।
আজকের মানুষ পাঁচতারকা খাবার খুঁজে বেড়ায়।
তবুও তাদের মুখে সবসময় অভিযোগ থাকে।
গাধারা অন্তত খাবারের ছবি তুলতো না।
একজন কবি নাকি গাধা নিয়ে লিখেছিলেন।
কেউ সেই কবিতার মূল্য দেয়নি তখন।
কারণ সমাজ গাধাকে গুরুত্ব দিতে চায় না।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন আসলে।
অনেক পরিবারের আয় গাধার উপর নির্ভরশীল।
আগের দিনের বাজারগুলো ছিল প্রাণবন্ত ভীষণ।
সেখানে গাধারা ছিল নিয়মিত কর্মচারীর মতো।
কেউ চাল আনতো, কেউ লাকড়ি বহন করত।
গাধারা নির্ভরযোগ্য পরিবহন হিসেবে পরিচিত ছিল।
তখন পেট্রোলের দাম নিয়ে চিন্তা ছিল না।
গাধারা খড় খেলেই চলতো দিব্যি আরামে।
এক বুড়ো গাধা নাকি উপদেশ দিয়েছিল।
বলেছিল, “মানুষ খুব অদ্ভুত প্রাণী বটে!”
“নিজেরা ভুল করেও অন্যকে গাধা বলে।”
এই কথায় পাশের গরুও সম্মতি জানিয়েছিল।
ছাগল অবশ্য তখন ব্যস্ত ছিল পাতা খেতে।
আজ যদি গাধারা সভা ডাকতো হঠাৎ।
তারা হয়তো মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতো।
বলতো, “আমাদের সম্মান ফিরিয়ে দিতে হবে।”
“গাধা শব্দের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে।”
“বোকা মানুষকে মানুষ বলেই ডাকুন।”
এই দাবিতে অনেক গাধা একমত হতো।
গাধাদের নিয়ে সিনেমাও খুব কম হয়েছে।
ঘোড়ারা বরাবর বেশি জনপ্রিয়তা পেয়ে গেছে।
কারণ ঘোড়া দেখতে রাজকীয় আর সুন্দর।
গাধারা সাধারণ, পরিশ্রমী, নিরীহ প্রকৃতির প্রাণী।
সমাজ সাধারণ মানুষকেও তেমন মূল্য দেয়না।
গ্রামে একসময় গাধা দৌড় প্রতিযোগিতা হতো।
বাচ্চারা খুব আনন্দ নিয়ে সেই খেলা দেখতো।
গাধারা অবশ্য পুরস্কার বুঝতো না মোটেও।
একটু বেশি ঘাস পেলেই খুশি থাকতো সবাই।
গাধার ডাক নিয়েও অনেক ঠাট্টা হয়।
কিন্তু ভেবে দেখুন, মানুষও কম চিৎকার করে না।
বিশেষ করে রাজনৈতিক সভাগুলোর সময়কালে।
সেখানে গাধার ডাকও ভদ্র শোনাতে পারে।
অনেক গবেষক গাধার সহনশীলতা নিয়ে মুগ্ধ।
তারা বলছেন, গাধারা ভীষণ বুদ্ধিমান প্রাণীও।
শুধু তারা অহংকার করতে জানে না মোটেও।
মানুষ বরং সামান্য জ্ঞানেই ফুলে ওঠে।
আজ বিশ্ব গাধা দিবসে তাদের স্মরণ করি।
এই নিরীহ শ্রমিক প্রাণীদের সম্মান জানাই সবাই।
তাদের অবদান ইতিহাস কখনো অস্বীকার করতে পারবে না।
গাধারা সভ্যতার নীরব নির্মাতা হিসেবেই থাকবে।
মানুষ হয়তো ভুলে যাবে খুব দ্রুত।
কিন্তু ইতিহাস গাধাদের শ্রম মনে রাখবে।
শেষে গাধাদের উদ্দেশ্যে ছোট্ট শুভেচ্ছা থাকলো।
“হে গাধারা, তোমরা অপমান নিওনা কখনো।”
“মানুষ তোমাদের নাম ব্যবহার করেই বাঁচে।”
“তোমরা অন্তত মানুষের মতো প্রতারণা করোনি।”
“তোমরা সৎ, ধৈর্যশীল, পরিশ্রমী এবং নিরীহ।”
“এই গুণগুলো আজকাল বিরল হয়ে গেছে।”
লেখক: ড. মো. রুহুল আমিন সরকার, অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি, ঢাকা।

