Logo
Logo
×

Advertisement

সাহিত্য

ছন্দে ছন্দে গণহত্যার ইতিহাস

Icon

যুগান্তর ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৭ এএম

ছন্দে ছন্দে গণহত্যার ইতিহাস

সংগৃহীত

Advertisement

ইতিহাসের কিছু অধ্যায় এতই রক্তাক্ত যে, সেগুলো কেবল তথ্য দিয়ে ধারণ করা যায় না; প্রয়োজন হয় স্মৃতি, অনুভব ও শিল্পেরও। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই সময়ের গণহত্যা তেমনই এক অধ্যায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত গণহত্যার ইতিহাস নিয়ে ইতোমধ্যে বেশ কিছু গবেষণাধর্মী গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তবে সেই ইতিহাসকে ছড়ার মতো সহজ, স্মরণযোগ্য এবং জনসম্পৃক্ত সাহিত্যিক মাধ্যমে তুলে ধরার উদ্যোগ বিরল। লুৎফুর রহমানের ‘লাল-সবুজের ছড়া’ সেই বিরল উদ্যোগগুলোর একটি।

২০১৭ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত ২০০ পৃষ্ঠার এই বইয়ে সিলেট বিভাগের মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যার ১৪২টি ঘটনা ১৪২টি ছড়ায় তুলে ধরা হয়েছে। বইটির শেষাংশে সংযোজিত হয়েছে সিলেট বিভাগের মুক্তিযুদ্ধের তৃণমূল স্মৃতিচিহ্ন। প্রকাশক লন্ডনপ্রবাসী কবি-সাংবাদিক আনোয়ারুল ইসলাম অভি; প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ। গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন লুৎফর রহমান রিটন।

বইটির বিষয়বস্তু যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার পেছনের শ্রমও তেমনি উল্লেখযোগ্য। লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী, এই গ্রন্থ প্রস্তুত করতে তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা করতে হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী, মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় মানুষের স্মৃতিচারণ শুনেছেন; বিভিন্ন আকরগ্রন্থ ও গবেষণাকর্ম থেকে তথ্য নিয়েছেন। অর্থাৎ, বইটি কেবল কল্পনানির্ভর ছড়ার সংকলন নয়; এর ভিত্তি অনুসন্ধান ও তথ্যসংগ্রহ।

এই জায়গাটিই ‘লাল-সবুজের ছড়া’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি। ইতিহাসের ঘটনা ছড়ায় রূপান্তর করতে গিয়ে লেখক তথ্যের সঙ্গে কাব্যিকতার একটি সমঝোতা করেছেন। প্রতিটি ঘটনার মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে ছন্দ, অন্ত্যমিল ও সহজ ভাষার সাহায্যে তা পাঠযোগ্য করে তুলেছেন। ছড়ার নিচে গদ্য-ফুটনোট এবং তথ্যসূত্র সংযোজনের ফলে পাঠক চাইলে কবিতার আবহ থেকে বেরিয়ে ঘটনার তথ্যভিত্তিক পরিসরেও প্রবেশ করতে পারেন।

১৯৭১ সালে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের যে চিত্র বইটিতে পাওয়া যায়, তা একই সঙ্গে নির্মম ও বহুমাত্রিক। কোথাও একই পরিবারের বহু সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে; কোথাও মসজিদের ইমাম, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রবাসী কিংবা অসহায় মানুষকে। কোথাও নামাজরত মানুষ, কোথাও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্যক্তি হত্যার শিকার হয়েছেন। নারীর ওপর নির্যাতন, নাবালিকার করুণ পরিণতি, সাধারণ মানুষের নির্বিচার হত্যাকাণ্ড—বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি জনপদের ওপর পরিচালিত সহিংসতার সামগ্রিক চিত্র ফুটে ওঠে।

লুৎফুর রহমানের একটি সচেতন সিদ্ধান্ত এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—তিনি শুধু নিহত ব্যক্তিদের নাম বা ঘটনার বিবরণে থেমে থাকেননি। সংশ্লিষ্ট পরিবারের পরবর্তী অবস্থা, স্থানীয় স্মৃতিচিহ্ন এবং কোনো কোনো ঘটনায় এদেশীয় সহযোগীদের পরিচয়ও সামনে এনেছেন। ফলে গণহত্যা এখানে বিচ্ছিন্ন কোনো পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি পরিবার, একটি গ্রাম, একটি সামাজিক পরিসর এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি।

তবে বইটির গুরুত্ব শুধু গণহত্যার বিবরণে সীমাবদ্ধ নয়। সিলেটের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বীরের জীবন ও আত্মত্যাগও এতে স্থান পেয়েছে। শহিদ বুদ্ধিজীবী ডা. জিসিদেব, শহিদ বীরবিক্রম জগতজ্যোতি দাস, শহিদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ, শহিদ সুলেমান হোসেন ও শহিদ বাউল কমর উদ্দিনসহ আরও অনেকের বীরত্বগাথা ছড়ার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে বইটি একদিকে গণহত্যার দলিল, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় বীরত্বের স্মারক।

সিলেটের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এর আগে তাজুল মোহাম্মদ, আজিজুল পারভেজ, অপূর্ব শর্মাসহ অনেক গবেষক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। তাঁদের কাজ মূলত গদ্য ও গবেষণাভিত্তিক। ‘লাল-সবুজের ছড়া’ সেই গবেষণার বিকল্প নয়; বরং ভিন্ন ধরনের পাঠ তৈরি করার একটি প্রয়াস। গবেষণার তথ্যকে ছড়ার মাধ্যমে সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কারণে বইটি ইতিহাসচর্চার একটি জনপ্রিয়ীকরণমূলক মাত্রা তৈরি করেছে।

বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মুখের বয়ান সংগ্রহ করে সেগুলোকে ছড়ার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়টি বইটির মূল্য বাড়িয়েছে। কারণ স্থানীয় ইতিহাসের বড় একটি অংশ এখনও মৌখিক স্মৃতির মধ্যে ছড়িয়ে আছে। সময়ের সঙ্গে সেই স্মৃতি হারিয়ে গেলে তার সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে বহু অজানা ঘটনা ও মানুষের পরিচয়। সেই অর্থে ‘লাল-সবুজের ছড়া’ স্মৃতি সংরক্ষণেরও একটি প্রয়াস।

বইটির শেষে সংযোজিত স্মৃতিচিহ্নের ছবিগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। একটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট স্থানকে যুক্ত করে দেওয়ার ফলে পাঠকের কাছে ইতিহাস আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। স্থান, মানুষ, ঘটনা ও স্মৃতি—এই চারটি উপাদান মিলিয়ে বইটি সিলেটের মুক্তিযুদ্ধের একটি স্থানীয় স্মৃতিভুবন নির্মাণ করেছে।

লুৎফুর রহমানের ছড়াকার পরিচয় তাঁর দীর্ঘদিনের। জাতীয় পত্রিকায় সমকালীন ছড়া, শিশুদের জন্য ছড়া এবং নানা সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তাঁর লেখালেখি রয়েছে। তাঁর লেখার একটি বৈশিষ্ট্য হলো প্রচলিত ছড়ার কাঠামোর বাইরে গিয়ে বিষয়কে ছন্দে ধারণ করার চেষ্টা। ‘লাল-সবুজের ছড়া’ সেই প্রবণতারই একটি বিস্তৃত প্রয়োগ।

কবি হেলাল হাফিজ একসময় তাঁকে নিয়ে লিখেছিলেন—

‘আগামি তোলে দিলাম তোমার হাতে,
আমার কবিতা যেন থাকে দুধে-ভাতে।’

এই বইয়ের দিকে তাকালে ‘আগামি’র হাতে ইতিহাস তুলে দেওয়ার সেই দায়বোধটির কথাই মনে পড়ে। ইতিহাসের পাঠ যদি কেবল গবেষণাগ্রন্থের পাঠাগারে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তার সামাজিক বিস্তার সীমিত হতে পারে। আর ছড়া যদি সেই ইতিহাসকে মানুষের মুখে-মুখে ফেরার মতো করে তুলতে পারে, তবে তার পাঠকও হতে পারে বিস্তৃত।

লুৎফুর রহমানের ‘লাল-সবুজের ছড়া’ সেই সম্ভাবনাটিই সামনে এনেছে। এটি নিখুঁত কাব্যগ্রন্থ নয়, আবার প্রচলিত অর্থে ইতিহাসের গবেষণাগ্রন্থও নয়। বরং ইতিহাস, স্মৃতি ও ছড়ার একটি সংযোগস্থল। এর সবচেয়ে বড় অর্জন—সিলেট বিভাগের গণহত্যার বহু স্থানীয় ঘটনাকে একটি সহজপাঠ্য সাহিত্যিক কাঠামোর মধ্যে সংরক্ষণ করা।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গতা মূলত তখনই অর্জিত হবে, যখন জাতীয় ইতিহাসের পাশাপাশি প্রতিটি অঞ্চল, জনপদ, গ্রাম ও পরিবারের স্মৃতিও তার যথাযথ জায়গা পাবে। সেই বৃহত্তর ইতিহাস নির্মাণে ‘লাল-সবুজের ছড়া’ একটি স্বতন্ত্র সংযোজন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় ইতিহাসও যদি একইভাবে সংগ্রহ, যাচাই ও সাহিত্যিক রূপ পায়, তবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের তৃণমূল ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ হবে।

লুৎফুর রহমানের এই বইয়ের সবচেয়ে বড় আবেদন সম্ভবত এখানেই—এটি ইতিহাসকে শুধু পড়তে বলে না, মনে রাখতে বলে।

লেখক পরিচিতি
লুৎফুর রহমান দীর্ঘদিন প্রবাসে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দুবাইয়ে অবস্থানকালে তিনি ‘মুকুল’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন এবং পরবর্তীতে বায়ান্ন টিভির সঙ্গে যুক্ত হন। সাংবাদিকতায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি এক যুগেরও বেশি সময় একাত্তর টিভির আমিরাত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার নিদনপুরে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ১০টি ছড়ার বই, একটি ভ্রমণগ্রন্থ ও একটি প্রামাণ্যগ্রন্থ। ‘লাল-সবুজের ছড়া’ ও ‘বিয়ানীবাজারে গড়া’ গ্রন্থের জন্য তিনি শহীদ বুদ্ধিজীবী পদক ’১৫ লাভ করেন।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় গেজেটভুক্তির আবেদনের শেষ সময় ৭ অক্টোবর

মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় গেজেটভুক্তির আবেদনের শেষ সময় ৭ অক্টোবর

মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে ৬ বার উদ্যোগ নিয়েও কেন ক্ষমা চায়নি জামায়াত?

মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে ৬ বার উদ্যোগ নিয়েও কেন ক্ষমা চায়নি জামায়াত?

মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আবুল কালাম আযাদের আপিল চলবে কিনা শুনানি ৩১ আগস্ট

মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আবুল কালাম আযাদের আপিল চলবে কিনা শুনানি ৩১ আগস্ট

মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে জনগণ আর সুযোগ দেবে না : রিজভী

মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে জনগণ আর সুযোগ দেবে না : রিজভী

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলেও শেষ হয়নি নারীর জীবনসংগ্রাম

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলেও শেষ হয়নি নারীর জীবনসংগ্রাম

একাত্তরের ধারাবাহিকতায় ২০২৪: প্রতিমন্ত্রী

একাত্তরের ধারাবাহিকতায় ২০২৪: প্রতিমন্ত্রী

আরও পড়ুন

ছন্দে ছন্দে গণহত্যার ইতিহাস

ছন্দে ছন্দে গণহত্যার ইতিহাস

ঐতিহ্য প্রকাশ করবে কবি ও সম্পাদক ‘আবদুল হাই শিকদার-রচনাবলী’

ঐতিহ্য প্রকাশ করবে কবি ও সম্পাদক ‘আবদুল হাই শিকদার-রচনাবলী’

শেখ রবিউল হকের ৮০ বছরের সৃজনযাত্রা উপলক্ষে চিত্রপ্রদর্শনী

শেখ রবিউল হকের ৮০ বছরের সৃজনযাত্রা উপলক্ষে চিত্রপ্রদর্শনী

শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলামের চিরবিদায়

শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলামের চিরবিদায়

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম