‘সাম্যবাদী’ কবিতার শত বছরেও সমাজে বৈষম্য দেখতে হচ্ছে
Advertisement
সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০২ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাম্যবাদী’ কবিতা প্রকাশের শত বছর পরও সমাজে বৈষম্য দেখতে হচ্ছে। এটা অত্যন্ত দুঃখের বিষয় বলে মোট প্রকাশ করেছনে নজরুল চর্চা কেন্দ্রের বক্তারা।
বৃহস্পতিবার বিকালে বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে নজরুল চর্চা কেন্দ্র-বাঁশরী আয়োজিত আলোচনা, আবৃত্তি ও সংগীতানুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী কবিতার ১০০ বছর উপলক্ষ্যে এই আয়োজন হয়। নজরুল ১৯২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে এই কবিতাটি লিখেছিলেন।
অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, নজরুলের সাম্যবাদী কবিতার ১০০ বছর পাঠ হচ্ছে, অথচ আমরা কোথায় বাস করছি! নজরুলের সাহিত্য ও ভাবনার প্রভাব আমরা সমাজে দেখতে পাচ্ছি না, সমাজে প্রবল বৈষম্য দেখতে হচ্ছে। এটা অত্যন্ত দুঃখের বিষয়।
নজরুলের সৃষ্টির বৈচিত্র্য তুলে ধরে তিনি বলেন, নজরুল সাম্যবাদী কবিতা লিখেছেন, আবার হামদ, নাত ও গজলও রচনা করেছেন। এটি সম্ভব হয়েছে তার সাম্যবাদী দর্শন ও মানুষকে বড় করে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। বর্তমান পৃথিবীতে কে হিন্দু, কে মুসলিম—এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু মানুষ নিয়ে আলোচনা নেই। সাম্যবাদী কবিতার শত বছর পরও এ ধরনের আলোচনা অত্যন্ত কষ্টের।
নজরুলের প্রতিবাদী ভূমিকার কথা উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, আজ নজরুল বেঁচে থাকলে কী ধরনের সমালোচনার মুখে পড়তেন, এমনকি বেঁচে থাকতে পারতেন কি না, কিংবা মৃত্যুর পর তার দাফন হতো কি না—এসব প্রশ্নও থেকে যায়।
তিনি বলেন, নজরুল এমন একজন লেখক, যার লেখা বাজেয়াপ্ত হয়েছে, তাকে কারাবরণ করতে হয়েছে। কারাগারে গিয়েও তিনি লিখেছেন। আমাদের সব প্রতিবাদ ও সংগ্রামে নজরুল রয়েছেন। তাকে ছাড়া সংগ্রাম বা আন্দোলন হয় না। কিন্তু নজরুলকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করা হয় না। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ তাকে সামগ্রিকভাবে উপলব্ধি করতে বাধা দেয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আলোচনায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমেদ মওলা বলেন, আমরা যে বৈষম্যের মধ্যে বাস করছি, সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে নজরুল একশ বছর আগেই দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন ‘সাম্যবাদী’ কবিতা। অথচ আমরা নজরুলকে খণ্ডিত করে ফেলেছি। তার সামগ্রিক চিন্তার মধ্যে সাম্যবাদী দর্শন রয়েছে। তিনি ছিলেন বিশ শতকের সমাজ বিনির্মাণের চিন্তক। একটি মানবিক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।
অধ্যাপক আহমেদ মওলা আরও বলেন, ‘নবযুগ’ পত্রিকা সম্পাদনা ও ‘যুগবাণী’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, নজরুল তার সময়কে বদলাতে চেয়েছিলেন। তিনি মানবিক যুগের স্বপ্ন দেখেছেন, মানুষের মুক্তি চেয়েছেন। এ কারণেই দেশ, সমাজ ও বিশ্ব নিয়ে তিনি সক্রিয় ছিলেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাঁশরীর সভাপতি ড. ইঞ্জিনিয়ার খালেকুজ্জামান। তিনি বলেন, নজরুল চর্চা করতে গিয়ে নানা বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবু তারা কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতিদিন নজরুলের কবরে ফুল দেওয়া হয়। শুধু বছরে একবার নয়, প্রতিদিনই তারা নজরুলের চেতনা লালন করেন।
বক্তারা বলেন, নজরুলের সামগ্রিক জীবন জুড়ে লড়াই করেছেন বৈষম্যের বিরুদ্ধে। জাতীয় কবির এই চেতনাকে ধারণ করে এই লড়াই সবাই চালিয়ে যেতে হবে; দূর করতে হবে সব বাধা ব্যবধান।
অনুষ্ঠানে ‘জয় হোক’ গান পরিবেশন করেন বাঁশরীর শিল্পীরা। এ ছাড়া ‘ঈশ্বর’, ‘নারী’, ‘কুলি মজুর’ ও ‘মানুষ’, পাপসহ ১১টি কবিতা আবৃত্তি করেন চিটো মুনী, সীমা ইসলাম, ফারহানা তুনা, মাহিনুর মুমু, মাহফুজা আক্তার মিরা, ডা. অমিত আহসান, শাকিলা মতিন মৃদুলা, আনিকা উলফাত এশা, দেবজ্যোতি রায়, জান্নাতুল ফেরদৌস মীম ও এইচ এম ফাহিম।
সংগীত পরিবেশন করেন শেলু বড়ুয়া, সিদ্ধার্থ গোলদার, গুলে ফেরদৌস লতা, নাদিয়া আরেফিন শাওন, রেহানা পারভীন হাসি, সংগীতা পাল, পুথুলা দত্ত প্রজ্ঞা, সুমাইয়া সুলতানা অণি, হৃদয় হোসেন, জাবুল ইসলাম, সাহেদুল ইসলাম ও সুদাম কুমার বিশ্বাস।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আবৃত্তিশিল্পী টিটু মুন্সী। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলায় অবস্থিত বাঁশরী দীর্ঘদিন ধরে নজরুলের সাহিত্য ও সংগীতচর্চা এবং তার সৃষ্টিকর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে কাজ করছে।
