কমলেশ রায়ের সায়েন্স ফিকশন 'টিকা'
jugantor
কমলেশ রায়ের সায়েন্স ফিকশন 'টিকা'

   কমলেশ রায়  

১৩ আগস্ট ২০২০, ১৬:৪১:১৬  |  অনলাইন সংস্করণ

জিজ্ঞাসাবাদ

তোমার কোনো শেষ ইচ্ছে আছে ?
আছে। টিনো শান্ত গলায় জবাব দিলো। তার মুখের ওপর উচ্চমাত্রার আলো। প্রশ্নকর্তা উল্টোদিকে বসা। তাকে দেখা যাচ্ছে না। তার কণ্ঠ কেমন যেন। অদ্ভুত। ভরাট, তবে খসখসে।
কী ইচ্ছে, বলো ?

আমার মৃত্যু যেন নদীর ধারে, ঘন গাছপালা ঘেরা জায়গায় হয়।

প্রশ্নকর্তা চমকে উঠলেন। আগের তিনজনও একই ইচ্ছের কথা বলেছিল। তাদের কথা রাখা সম্ভব হয়নি। কারণ কোনো রকম ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ ছিল না।
এই ইচ্ছেটা কেন, আমাকে একটু বলবে? প্রশ্নকর্তা একটু আন্তরিক হওয়ার চেষ্টা করলেন।

টিনো মুচকি হাসল। হাসলে তাকে সুন্দর দেখায়। তারপর বলল, মরার আগে কিছু জিনিস দেখতে চাই।
কী দেখতে চাও?
দেখতে চাই প্রকৃতি আসলে কতটা সবুজ হলো। বাতাসে দূষণ কমলাে কি না। নদীতে দূষণ কতটা কমল। পাখিরা আগের চেয়ে গলা ছেড়ে গায় কি না। নদীতে মাছ কী এখন লাফিয়ে ওঠে? শুশুক ভুস করে গা জাগিয়ে তখনই আবার ডুব দেয় কি না।


প্রশ্নকর্তা তার সামনের তরুণকে দেখে অবাক হচ্ছেন। তথ্য বলছে, বয়স সাতাশ। দেখে মনে হয় বিশ-বাইশের বেশি নয়। চোখে-মুখে মৃত্যুভয়ের লেশমাত্র নেই। বরং হাসিতে ঝলমল করছে। তিনি বললেন, তোমার ভেতরে কোনো অপরাধবোধ কাজ করছে না?
একদমই না। আমি তো কোনো অপরাধ করিনি।
বটে। তবে কাজটা মোটেও ঠিক করোনি।
সেটা সময় বলবে। মহাকাল বলবে।


কিন্তু তুমি তো আর বেশি সময় বলার সুযোগ পাবে না।
জানি। আর সেজন্য আমার কোনো আফসোস নেই।
একটা কথা সত্যি করে বলবে?
কী কথা বলুন। এখন আর মিথ্যা বলে কী লাভ। তাছাড়া আমি তো বরাবরই সত্যের পক্ষে।
এমন একটা কাজ তোমরা কেন করলে?
এই গ্রহের মঙ্গলের জন্য। গ্রহকে সবার বাসযোগ্য করে তুলতে।
তাই বলে মানবজাতিকে ঝুঁকিতে ফেলে!


মানুষ বরং বেঁচে গেল। সব কিছুতে আমরা যেভাবে আগ্রাসী হচ্ছিলাম, তাতে মানবসভ্যতা ভয়ঙ্কর ঝুঁকির মুখে পড়ে গিয়েছিল।
আর এখন যে লাখ লাখ মানুষ মরছে। এটা ঝুঁকি নয়। এটা তো ভয়ঙ্করের চেয়েও বেশি কিছু। প্রশ্নকর্তা হঠাৎই মেজাজ হারালেন।
বড়ােকিছু পেতে ছোটাে অনেককিছু হারাতে হয়। সেটাই নিয়ম।


মহামারিকে ডেকে আনা কী ধরনের নিয়মের মধ্যে পড়ে, একটু বুঝিয়ে বলবেন মাননীয় সত্যনিষ্ট। লাখ লাখ প্রাণের কী কোনো মূল্য নেই?
আছে। অবশ্যই আছে। তবে সেটা এই গ্রহের মঙ্গলের চেয়ে বেশি দামি নয়। মানবসভ্যতার টিকে থাকার চেয়ে বেশি মূল্যবান নয়। পরিশুদ্ধ হওয়ার এই ধাক্কাটা বড্ড দরকার ছিল।
মাথাটা একদমই গেছে।
আমারও তাই ধারণা। আপনার মাথাটা ঠিক থাকলে বিষয়টা সহজেই বুঝতে পারতেন।
তোমার সাহস তো কম নয়। তুমি জানো কার সঙ্গে কথা বলছো?
না, জানি না। কারণ আপনার পরিচয় আপনি দেননি। তবে অনুমান করতে পারি আপনি পদস্থ হোমড়া-চোমড়া কেউ হবেন। আর এই মুহূর্তে আপনার পরিচয় জানার তেমন কোনো আগ্রহও আমার নেই।


তাহলে এবার দয়া করে তোমার মুখটা একটু বন্ধ রাখো।
এই দয়া জিনিসটা আমার একদম অপছন্দের। মানুষ কথায় কথায় খালি দয়া করে। মানুষ সবাইকে দয়া করতে চায়। প্রকৃতিকেও দয়া করতে চায়। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, সবাই দয়ার পাত্র নয়। আমি, আপনি দয়া করার কে? সবাইকে ভালোবাসুন। গাছপালা ভালোবাসুন, পশুপাখিকে ভালোবাসুন। প্রকৃতিকে ভালোবাসুন। তাহলে সবাই ভালো থাকবেন। মানুষ ভালো থাকবে। পরিবেশ ভালো থাকবে। এই গ্রহ ভালো থাকবে।


তুমি কিন্তু চরম অবাধ্য হচ্ছো। তোমাকে আপাতত মুখ বন্ধ রাখতে বলেছি।
একটু বাদে যে মারা যাবে, সে কেন আপনার বাধ্য হবে। তার মুখ বন্ধ করারও প্রশ্নই ওঠে না।
তার মানে তুমি থামবে না?


চিরতরেই তো থামিয়ে দেবেন। এখন থেমে কী লাভ!
ঠিক আছে। প্রশ্নকর্তা দাঁতে দাঁত চেপে বললেন।
কিচ্ছু ঠিক নেই। আপনার শরীরের অবস্থা তত ভালো নয়। কথায় কথায় মেজাজ হারান। মনে হচ্ছে, যথেষ্ট বয়স হয়েছে। জানেন তো, বয়স্কদের ঝুঁকি বেশি। এখান থেকে বেরিয়ে একবার চেকআপ করিয়ে নেবেন। সাবধানের মার নেই। আর এখন তো সতর্ক থাকারই সময়।
প্রশ্নকর্তা আর কথা বাড়ালেন না। তার শরীরটা ভালো লাগছে না। শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে। তিনি মুখের মাস্কটা নাকের ওপর থেকে নামিয়ে দিলেন। এই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষেও তিনি দরদর করে ঘামছেন।

 

প্রকৃতির কোলে


একটা মাইক্রোবাস দ্রুতগতিতে চলছে। কালো রঙ, গ্লাসও কালো। গন্তব্য মধুবন। নদীর ধারে এই বন। দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। মাইক্রোবাসের ভেতরে টিনো বসা। তার হাতে হাতকড়া, চোখ বাঁধা। ড্রাইভার ছাড়াও গাড়িতে আরও দুজন আছে।
এই মুহূর্তে তিন সহকর্মীকে টিনোর খুব মনে পড়ছে। জিশান, ডিডো আর লিথি। তারা চারজনে মিলে কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ওরা কেউই আর এখন বেঁচে নেই। তাদের মেরে ফেলা হয়েছে। আজ তার পালা।


এক সময় মাইক্রোবাসটি থামল। দরজা খুলতেই নদী পার হয়ে আসা ভেজা বাতাস টিনোর মুখ, শরীর ছুঁয়ে গেল। তার মানে তারা গন্তব্যে পৌঁছে গেছে।
হঠাৎই টিনোর ডান হাত চেপে ধরা হলো। পিপড়ার কামড়ের মতো একটু ব্যথা পেল সে। বুঝতে পারল এটা ইনজেকশনের সূচের ব্যথা। কিছুটা তরল ঢুকিয়ে দেওয়া হলো তার শরীরে। তারপর মাইক্রোবাস থেকে নামানো হলো তাকে। খুলে দেওয়া হলো চোখের বাঁধন। টিনো প্রথমে ভালো করে তাকাতে পারল না। আলোতে চোখ ধাতস্থ হতে একটু সময় নিলো। দেখল, ড্রাইভারসহ তিনজন তার সামনে দাঁড়িয়ে। তাদের মুখে মাস্ক। পরনে পিপিই। দুজনের কোমরে অত্যাধুনিক অস্ত্র।
টিনো শান্ত গলায় বলল, কত মিনিট সময় পাওয়া যাবে?


মিনিট সাতেক। একজন আন্তরিক গলায় জবাব দিলো। বোঝা গেল ইনিই টিম লিডার।
আমি কী এবার সামনের দিকে যেতে পারি? টিনো জিগ্যেস করল।
অবশ্যই। আপনি এগিয়ে যান। আমরাও আসছি আপনার পেছনে।
আসুন। তবে বিরক্ত করবেন না।
ঠিক আছে, আমরা যথেষ্ট দূরত্বে থাকব।


টিনো চারপাশে তাকাল। কী সুন্দর পরিবেশ! চারদিকে সবুজ আর সবুজ। সে একটা দৌড় দিলো। তার হাতে সময় বেশি নেই। এখন প্রতিটি সেকেন্ড তার কাছে দামি।
নদীর কূলে এসে থামল সে। সামনে টলটলে পানি। তলদেশে পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। নিচু হয়ে বসল সে। স্পষ্ট দেখতে পেল, ছোটাে ছোটাে মাছ খেলা করছে। একটা মাছরাঙা সামনে দিয়ে উড়ে গেল। পানিতে হাত ডুবালো টিনো। ঠিক তখনই একটু দূরে ভুস করে ভেসে উঠল একটা শুশুক। দুটো পানকৌড়িও চোখে পড়ল একটু আগ-পিছে। ইশ্! ওরা তিনজন এ দৃশ্য দেখলে খুব খুশি হতো।


একটু দূরে ঝোপের আড়াল থেকে একটা ডাহুক ডেকে উঠল। টিনো উঠে দাঁড়ালো। এবার সবুজকে একটু ছুঁয়ে দেখা দরকার। সে দ্রুত পায়ে ছোট্ট একটা বটগাছের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। সবুজ পাতায় ভরা একটা ডালকে ছুঁয়ে সে বলল, হে দীর্ঘজীবী বৃক্ষ, তুমি সবাইকে বলো, আমি ও আমার তিন সহকর্মী নিজেদের জীবন দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। সবাইকে হয়তাে বোঝাতে পেরেছি, এই গ্রহ শুধু মানুষের নয়। এই গ্রহ বৃক্ষের, এই গ্রহ পশুপাখির, এই গ্রহ প্রতিটি প্রাণীর। সবাইকে মিলে মিশে এই গ্রহে বাস করতে হবে।


তখনই একটা গিরগিটির শব্দ শোনা গেল। যেন বলছে, ঠিক, ঠিক, ঠিক…। টিনো আকাশের দিকে তাকাল। নীল আকাশে ছুটছে সাদা মেঘের ভেলা। কয়েকটা সোনালি ডানার চিল ঘুড়ির মতো উড়ছে। কাছেই একটা বাজপাখি শব্দ করে ডানা ঝাঁপটালাে। কোকিলের গলা শোনা গেল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।
হঠাৎ দমকা হাওয়া ধেয়ে এলো। পাখিরা কিচিরমিচির করে উঠল সমবেত স্বরে। গাছগুলো নড়ে উঠল। ডাল নেড়ে যেন বলল, বিদায়।
টিনো মুচকি হেসে বলল, বিদায়।


এভাবে হাসলে লিথি কপট রেগে যেত। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলত, খবরদার, অন্য কোনো মেয়ের সামনে এভাবে হাসবে না।
আমিও আসছি লিথি। জিশান আর ডিডোকে বলো, আমিও আসছি তোমাদের কাছে। টিনো ফিসফিস করে বলল। তার মুখে তখনও হাসি লেগে আছে।
মাথাটা দুলে উঠল এবার। বিষক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। টিনো মাটিতে বসে পড়ল।


তার কাছে ছুটে এলেন টিম লিডার। বললেন, মাফ করবেন। আমাকে আরেকটা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যদি একটু সাহায্য করতেন।
বলুন কী সাহায্য ? টিনোর গলার স্বর জড়িয়ে আসছে।
টিকার বিষয়ে যদি কিছু বলতেন…।


আমার বেল্টের ভেতরে একটা চিপস…। টিনো কথা শেষ করতে পারল না। তার চোখ বন্ধ হয়ে এলো। মা দু’হাত বাড়িয়ে ডাকছে, আয় টিনো, আয় বাবা…।
তুমি একা আমায় ডাকছো যে। বাবা কোথায়?
ঘুরতে বেরিয়েছে। লোকটা কী এক জায়গায় বসে থাকার মানুষ…।
আমি আসছি মা।
আয় বাবা। তাড়াতাড়ি আয়…।
টিম লিডার তখন ফোনে ব্যস্ত। স্যার, কাজ শেষ। একটা চিপস পাওয়া গেছে।

 

চিপসে থাকা বার্তা


মনিটরের সামনে দুজন বসে। প্রশ্নকর্তা আর টিম লিডার। চিপসের থাকা লেখা ভেসে আছে মনিটরে।
‘অনেকেরই ধারণা এই মহামারির জন্য আমরা চারজন দায়ী। আমরাই এটা সৃষ্টি করেছি। ভুল, একেবারেই ভুল। নিদুভাইরাস বর্গের সব শেষ প্রজাতির এই ভাইরাসটির আমরা শুধু সন্ধান পেয়েছি মাত্র। প্রকৃতিই এটা সৃষ্টি করেছে। আমরা নই। স্তন্যপায়ী প্রাণীতে এর বিস্তার খুব দ্রুত ঘটে। গবেষণা করতে গিয়ে ডিডো প্রথমে আক্রান্ত হয়। আমার ধারণা সে ইচ্ছে করেই আক্রান্ত হয়েছিল। এই গ্রহের সামগ্রিক অনাচার অনেক দিন ধরেই তার মনোবেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

আমরা মানে অন্য তিনজনও তার সঙ্গে একমত ছিলাম। ডিডো অসুস্থ হলে হাসপাতালে ভর্তি হয়। এরপর আক্রান্ত হয় জিশান। সেও যায় একই হাসপাতালে। ক্রমেই হাসপাতালে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে। একরাতে ডিডোকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়। কারণ সে নাকি মানব বোমায় পরিণত হয়েছিল। এ খবর শুনে হাসপাতাল থেকে পালায় জিশান। তবে শেষরক্ষা হয়নি। সে ধরা পড়ে। নির্যাতনের একপর্যায়ে আমার আর লিথির নাম বলে দেয়। জিশানকেও মেরে ফেলা হয়। লিথি মৃদু উপসর্গ নিয়ে বাসায় সেলফ আইসোলেশনে ছিল। তাকেও একরাতে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। আমার তেমন কোনো উপসর্গ ছিল না। তবে আমি যথেষ্ট সতর্ক ছিলাম। বাসায় সাধারণত একাই থাকি। কিন্তু সব শুনে আমি গা-ঢাকা দেই। এরই মধ্যে ছয়মাস পেরিয়ে গেছে। জানি, আমিও একদিন না একদিন ধরা পড়ব।

হ্যাঁ, আমরা চারজন মিলে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এই ভাইরাসের বিষয়ে আমরা সহজে কাউকে কোনো তথ্য দেবো না। প্রকৃতি প্রতিশোধ নিতে চাইছে, নেক। আমরা তাতে বাধা হয়ে দাঁড়াব না। আমাদের বিশ্বাস, মানুষ এই ধাক্কায় আরও মানবিক হবে। পরিবেশ দুষণমুক্ত হবে। প্রকৃতি আরও সতেজ হবে। এই গ্রহ সব প্রাণীর জন্য আরও বাসযোগ্য হবে।
এই বিশ্বাস থেকেই এ বিষয়ে সব ধরনের গবেষণা আমরা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আমরা কোনো প্রতিষেধক বা টিকা আবিষ্কারের চেষ্টা করিনি। এই ভাইরাস বড়াে মায়াময়। সহজে এই গ্রহ থেকে বিদায় নেবে না।


টিকার হদিস না থাকলেও একটা পাদটিকা আছে।

পাদটিকা: ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। সতর্ক থাকুন।’
শেষেও কী একটা রসিকতা করে গেছে। প্রশ্নকর্তা হতাশ গলায় বললেন।
জ্বি, স্যার। তাই তো দেখছি। টিম লিডারও সায় দিলেন।

 

দূরের এক গ্রহে

কেমন লাগল মহামান্য সম্রাট ?
ভালো। খুব ভালো। দারুণ তথ্যচিত্র।
আমি আপনাকে আগেই বলেছিলাম, এটা দেখার মতো…।
হ্যাঁ, অনেকদিন বাদে তুমি বলার মতো একটা কাজ করেছ।
নিখা এবার চুপ করে থাকলেন। তিনি হলেন সামান্য তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী। মহামান্য সম্রাটের সব কথার উত্তর দেওয়া তার সাজে না। তাদের গ্রহ খুব বেশি বড়াে নয়। মাঝারির চেয়েও আকারে ছোটাে। দুই মেরুর বিস্তীর্ণ এলাকা বরফে ঢেকে থাকে সারাবছর। এছাড়াও আছে অসংখ্য আগ্নেয়গিরি। আছে কঠিন আগ্নেয় শিলার পাহাড়-পর্বত। বাসযোগ্য এলাকা বলতে গেলে এক চতুর্থাংশ। জনসংখ্যা সোয়া দুইশ কোটির কাছাকাছি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে শিখরে পৌঁছেছে এই গ্রহের বাসিন্দারা। মৃত্যুকে তারা এখনও জয় করতে পারেনি। তবে অনেকটাই কাছাকাছি যেতে পেরেছে। গড় আয়ু পাঁচশ বছরের মতো। ফলে বয়স্কদের সংখ্যাই বেশি। গোটা গ্রহে একটাই বসতি। আর শাসনভার বলতে গেলে একজনের হাতেই, তিনি হলেন মহামান্য সম্রাট। তাঁর লম্বা-চওড়া একটা অলঙ্কারিক নাম আছে বটে। তবে সেটা কেউ ভুলেও উচ্চারণ করতে সাহস পায় না।
তথ্যচিত্রের এই গ্রহটা কত দূরের?


খুব বেশি দূরের নয়, মহামান্য সম্রাট। আমাদের গ্রহ থেকে দূরত্ব মাত্র আট আলোকমাস।
ওখানেও তাহলে ভাইরাস মহামারি হয়ে দেখা দিয়েছিল।
হ্যাঁ, এই তথ্যচিত্র তো সেটাই বলে।
তা আমাদের গ্রহে নতুন ভাইরাসটির সংক্রমনের কী অবস্থা?
অবস্থা খুব বেশি ভালো নয় মহামান্য সম্রাট। আক্রান্তের হার প্রতিদিনই বাড়ছে। মারাও যাচ্ছে অনেকে। আমার তো ধারণা এই ভাইরাসের থেকে আমাদের কারও নিস্তার নেই। আমরা সবাই এটায় আক্রান্ত হবো।
তুমি কি আমাকে একটা সঠিক তথ্য দিতে পারবে?
কী তথ্য, মহামান্য গ্রহকর্তা?


আমাদের গ্রহের ভাইরাসটি কী কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে?
না, মহামান্য সম্রাট। ভাইরাসটি প্রকৃতি থেকেই সৃষ্টি হয়েছে।
তার মানে, আমরা প্রকৃতির ওপর যথেষ্ট অত্যাচার করেছি।
এ কথা তো অনেকাংশে সত্য, মাননীয় অধিশ্বর।
শুনেছি, টিকা তৈরির কাজ জোরেশোরে চলছে।
টিকা তো দেওয়া শুরু হয়ে গেছে।


কী বলছো এসব! টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে, আর আমি জানি না। মহামান্য সম্রাটের গলায় উষ্মা।
যেটা সত্যি, সেটাই বলছি মহামান্য সম্রাট। নিখা মাথা নিচু করে গলা খানিকটা নামিয়ে বললেন।
কে দিয়েছে এই ছাড়পত্র?
আমাদের মান্যবর যুবরাজ। স্বাস্থ্যখাতের সবকিছু দেখভালের দায়িত্ব তো আপনিই তাকে দিয়েছেন মহামান্য গ্রহ অধিপতি।
সম্রাটের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় হঠাৎই সজাগ হয়ে উঠল। কিছু একটার আভাস যেন তিনি পেলেন। বললেন, তা কেমন কাজ করছে তোমাদের টিকা।
ভালো কাজ করছে মহামান্য সম্রাট। তবে…।
তবে কী?
এই টিকার একটা বিশেষত্ব আছে।
কী সেটা?


যাদের বয়স পাঁচশ বছরের নিচে এই টিকা শুধু তাদের দেহেই ভাইরাস প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারে।
তার মানে পাঁচশ বছরের বেশি বয়সীরা আক্রান্ত হলেই মারা যাবে। কী বলছো এসব! সম্রাট এবার নড়েচড়ে বসলেন। চোখ দুটো বন্ধ করে ডান হাত তুলে কপালে ঠেকালেন। তারপর হতাশায় ডুবে যাওয়া গলায় বললেন, নিখা, তুমি এবার এসো।
ঠিক আছে, মহামান্য সম্রাট। তাহলে বিদায়।


সম্রাটের পক্ষ থেকে নিখা আর কোনো জবাব পেলেন না। হঠাৎ তার মনে হলো এটাই সম্রাটের সঙ্গে তার হয়তাে শেষ দেখা। কারণ উনার বয়স ৫৪৬ বছর।

 

প্রাসাদ ষড়যন্ত্র


পুরনো স্মৃতি ভেসে উঠল সম্রাটের মনে। তিনি সিংহাসনে বসেছিলেন ২৪৬ বছর বয়সে। তার পিতা মারা যাওয়ার পর। মৃত্যুকালে উনার বয়স হয়েছিল ৪৪৬ বছর। সবাই জানে ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তিনি। টিকা দেওয়া হয়েছিল, লাভ হয়নি। আসলে ওই টিকায় মেশানো হয়েছিল বিষ। সবার অলক্ষ্যে আস্তে ধীরে যেটা কাজ শুরু করেছিল।

সেই একই চক্র। ধরনটা কেবল একটু আলাদা। আবার এসেছে মহামারি কাল। এবারও টিকা আছে। তবে যুবরাজ টিকার কার্যক্ষমতাকে কৌশলে বেঁধে দিয়েছেন।
একমাত্র সন্তান, বংশের শেষ প্রদীপ এই যুবরাজ, তাই অন্য কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ারও সুযোগ নেই।


এই জীবনে মহামান্য সম্রাটের নিজেকে এতটা অসহায় আর কখনও লাগেনি। একটা চাপা আতঙ্ক ক্রমেই গ্রাস করতে থাকল তাকে।
 

লেখক: কমলেশ রায় সাহিত্যিক ও দৈনিক যুগান্তরের সাবেক শিফট ইনচার্জ, বর্তমানে দৈনিক সময়ের আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক।

কমলেশ রায়ের সায়েন্স ফিকশন 'টিকা'

  কমলেশ রায় 
১৩ আগস্ট ২০২০, ০৪:৪১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

জিজ্ঞাসাবাদ

তোমার কোনো শেষ ইচ্ছে আছে ?
আছে। টিনো শান্ত গলায় জবাব দিলো। তার মুখের ওপর উচ্চমাত্রার আলো। প্রশ্নকর্তা উল্টোদিকে বসা। তাকে দেখা যাচ্ছে না। তার কণ্ঠ কেমন যেন। অদ্ভুত। ভরাট, তবে খসখসে।
কী ইচ্ছে, বলো ?

আমার মৃত্যু যেন নদীর ধারে, ঘন গাছপালা ঘেরা জায়গায় হয়।

প্রশ্নকর্তা চমকে উঠলেন। আগের তিনজনও একই ইচ্ছের কথা বলেছিল। তাদের কথা রাখা সম্ভব হয়নি। কারণ কোনো রকম ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ ছিল না।
এই ইচ্ছেটা কেন, আমাকে একটু বলবে? প্রশ্নকর্তা একটু আন্তরিক হওয়ার চেষ্টা করলেন।

টিনো মুচকি হাসল। হাসলে তাকে সুন্দর দেখায়। তারপর বলল, মরার আগে কিছু জিনিস দেখতে চাই।
কী দেখতে চাও?
দেখতে চাই প্রকৃতি আসলে কতটা সবুজ হলো। বাতাসে দূষণ কমলাে কি না। নদীতে দূষণ কতটা কমল। পাখিরা আগের চেয়ে গলা ছেড়ে গায় কি না। নদীতে মাছ কী এখন লাফিয়ে ওঠে? শুশুক ভুস করে গা জাগিয়ে তখনই আবার ডুব দেয় কি না।


প্রশ্নকর্তা তার সামনের তরুণকে দেখে অবাক হচ্ছেন। তথ্য বলছে, বয়স সাতাশ। দেখে মনে হয় বিশ-বাইশের বেশি নয়। চোখে-মুখে মৃত্যুভয়ের লেশমাত্র নেই। বরং হাসিতে ঝলমল করছে। তিনি বললেন, তোমার ভেতরে কোনো অপরাধবোধ কাজ করছে না?
একদমই না। আমি তো কোনো অপরাধ করিনি।
বটে। তবে কাজটা মোটেও ঠিক করোনি।
সেটা সময় বলবে। মহাকাল বলবে।


কিন্তু তুমি তো আর বেশি সময় বলার সুযোগ পাবে না।
জানি। আর সেজন্য আমার কোনো আফসোস নেই।
একটা কথা সত্যি করে বলবে?
কী কথা বলুন। এখন আর মিথ্যা বলে কী লাভ। তাছাড়া আমি তো বরাবরই সত্যের পক্ষে।
এমন একটা কাজ তোমরা কেন করলে?
এই গ্রহের মঙ্গলের জন্য। গ্রহকে সবার বাসযোগ্য করে তুলতে।
তাই বলে মানবজাতিকে ঝুঁকিতে ফেলে!


মানুষ বরং বেঁচে গেল। সব কিছুতে আমরা যেভাবে আগ্রাসী হচ্ছিলাম, তাতে মানবসভ্যতা ভয়ঙ্কর ঝুঁকির মুখে পড়ে গিয়েছিল।
আর এখন যে লাখ লাখ মানুষ মরছে। এটা ঝুঁকি নয়। এটা তো ভয়ঙ্করের চেয়েও বেশি কিছু। প্রশ্নকর্তা হঠাৎই মেজাজ হারালেন।
বড়ােকিছু পেতে ছোটাে অনেককিছু হারাতে হয়। সেটাই নিয়ম।


মহামারিকে ডেকে আনা কী ধরনের নিয়মের মধ্যে পড়ে, একটু বুঝিয়ে বলবেন মাননীয় সত্যনিষ্ট। লাখ লাখ প্রাণের কী কোনো মূল্য নেই?
আছে। অবশ্যই আছে। তবে সেটা এই গ্রহের মঙ্গলের চেয়ে বেশি দামি নয়। মানবসভ্যতার টিকে থাকার চেয়ে বেশি মূল্যবান নয়। পরিশুদ্ধ হওয়ার এই ধাক্কাটা বড্ড দরকার ছিল।
মাথাটা একদমই গেছে।
আমারও তাই ধারণা। আপনার মাথাটা ঠিক থাকলে বিষয়টা সহজেই বুঝতে পারতেন।
তোমার সাহস তো কম নয়। তুমি জানো কার সঙ্গে কথা বলছো?
না, জানি না। কারণ আপনার পরিচয় আপনি দেননি। তবে অনুমান করতে পারি আপনি পদস্থ হোমড়া-চোমড়া কেউ হবেন। আর এই মুহূর্তে আপনার পরিচয় জানার তেমন কোনো আগ্রহও আমার নেই।


তাহলে এবার দয়া করে তোমার মুখটা একটু বন্ধ রাখো।
এই দয়া জিনিসটা আমার একদম অপছন্দের। মানুষ কথায় কথায় খালি দয়া করে। মানুষ সবাইকে দয়া করতে চায়। প্রকৃতিকেও দয়া করতে চায়। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, সবাই দয়ার পাত্র নয়। আমি, আপনি দয়া করার কে? সবাইকে ভালোবাসুন। গাছপালা ভালোবাসুন, পশুপাখিকে ভালোবাসুন। প্রকৃতিকে ভালোবাসুন। তাহলে সবাই ভালো থাকবেন। মানুষ ভালো থাকবে। পরিবেশ ভালো থাকবে। এই গ্রহ ভালো থাকবে।


তুমি কিন্তু চরম অবাধ্য হচ্ছো। তোমাকে আপাতত মুখ বন্ধ রাখতে বলেছি।
একটু বাদে যে মারা যাবে, সে কেন আপনার বাধ্য হবে। তার মুখ বন্ধ করারও প্রশ্নই ওঠে না।
তার মানে তুমি থামবে না?


চিরতরেই তো থামিয়ে দেবেন। এখন থেমে কী লাভ!
ঠিক আছে। প্রশ্নকর্তা দাঁতে দাঁত চেপে বললেন।
কিচ্ছু ঠিক নেই। আপনার শরীরের অবস্থা তত ভালো নয়। কথায় কথায় মেজাজ হারান। মনে হচ্ছে, যথেষ্ট বয়স হয়েছে। জানেন তো, বয়স্কদের ঝুঁকি বেশি। এখান থেকে বেরিয়ে একবার চেকআপ করিয়ে নেবেন। সাবধানের মার নেই। আর এখন তো সতর্ক থাকারই সময়।
প্রশ্নকর্তা আর কথা বাড়ালেন না। তার শরীরটা ভালো লাগছে না। শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে। তিনি মুখের মাস্কটা নাকের ওপর থেকে নামিয়ে দিলেন। এই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষেও তিনি দরদর করে ঘামছেন।

প্রকৃতির কোলে


একটা মাইক্রোবাস দ্রুতগতিতে চলছে। কালো রঙ, গ্লাসও কালো। গন্তব্য মধুবন। নদীর ধারে এই বন। দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। মাইক্রোবাসের ভেতরে টিনো বসা। তার হাতে হাতকড়া, চোখ বাঁধা। ড্রাইভার ছাড়াও গাড়িতে আরও দুজন আছে।
এই মুহূর্তে তিন সহকর্মীকে টিনোর খুব মনে পড়ছে। জিশান, ডিডো আর লিথি। তারা চারজনে মিলে কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ওরা কেউই আর এখন বেঁচে নেই। তাদের মেরে ফেলা হয়েছে। আজ তার পালা।


এক সময় মাইক্রোবাসটি থামল। দরজা খুলতেই নদী পার হয়ে আসা ভেজা বাতাস টিনোর মুখ, শরীর ছুঁয়ে গেল। তার মানে তারা গন্তব্যে পৌঁছে গেছে।
হঠাৎই টিনোর ডান হাত চেপে ধরা হলো। পিপড়ার কামড়ের মতো একটু ব্যথা পেল সে। বুঝতে পারল এটা ইনজেকশনের সূচের ব্যথা। কিছুটা তরল ঢুকিয়ে দেওয়া হলো তার শরীরে। তারপর মাইক্রোবাস থেকে নামানো হলো তাকে। খুলে দেওয়া হলো চোখের বাঁধন। টিনো প্রথমে ভালো করে তাকাতে পারল না। আলোতে চোখ ধাতস্থ হতে একটু সময় নিলো। দেখল, ড্রাইভারসহ তিনজন তার সামনে দাঁড়িয়ে। তাদের মুখে মাস্ক। পরনে পিপিই। দুজনের কোমরে অত্যাধুনিক অস্ত্র।
টিনো শান্ত গলায় বলল, কত মিনিট সময় পাওয়া যাবে?


মিনিট সাতেক। একজন আন্তরিক গলায় জবাব দিলো। বোঝা গেল ইনিই টিম লিডার।
আমি কী এবার সামনের দিকে যেতে পারি? টিনো জিগ্যেস করল।
অবশ্যই। আপনি এগিয়ে যান। আমরাও আসছি আপনার পেছনে।
আসুন। তবে বিরক্ত করবেন না।
ঠিক আছে, আমরা যথেষ্ট দূরত্বে থাকব।


টিনো চারপাশে তাকাল। কী সুন্দর পরিবেশ! চারদিকে সবুজ আর সবুজ। সে একটা দৌড় দিলো। তার হাতে সময় বেশি নেই। এখন প্রতিটি সেকেন্ড তার কাছে দামি।
নদীর কূলে এসে থামল সে। সামনে টলটলে পানি। তলদেশে পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। নিচু হয়ে বসল সে। স্পষ্ট দেখতে পেল, ছোটাে ছোটাে মাছ খেলা করছে। একটা মাছরাঙা সামনে দিয়ে উড়ে গেল। পানিতে হাত ডুবালো টিনো। ঠিক তখনই একটু দূরে ভুস করে ভেসে উঠল একটা শুশুক। দুটো পানকৌড়িও চোখে পড়ল একটু আগ-পিছে। ইশ্! ওরা তিনজন এ দৃশ্য দেখলে খুব খুশি হতো।


একটু দূরে ঝোপের আড়াল থেকে একটা ডাহুক ডেকে উঠল। টিনো উঠে দাঁড়ালো। এবার সবুজকে একটু ছুঁয়ে দেখা দরকার। সে দ্রুত পায়ে ছোট্ট একটা বটগাছের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। সবুজ পাতায় ভরা একটা ডালকে ছুঁয়ে সে বলল, হে দীর্ঘজীবী বৃক্ষ, তুমি সবাইকে বলো, আমি ও আমার তিন সহকর্মী নিজেদের জীবন দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। সবাইকে হয়তাে বোঝাতে পেরেছি, এই গ্রহ শুধু মানুষের নয়। এই গ্রহ বৃক্ষের, এই গ্রহ পশুপাখির, এই গ্রহ প্রতিটি প্রাণীর। সবাইকে মিলে মিশে এই গ্রহে বাস করতে হবে।


তখনই একটা গিরগিটির শব্দ শোনা গেল। যেন বলছে, ঠিক, ঠিক, ঠিক…। টিনো আকাশের দিকে তাকাল। নীল আকাশে ছুটছে সাদা মেঘের ভেলা। কয়েকটা সোনালি ডানার চিল ঘুড়ির মতো উড়ছে। কাছেই একটা বাজপাখি শব্দ করে ডানা ঝাঁপটালাে। কোকিলের গলা শোনা গেল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।
হঠাৎ দমকা হাওয়া ধেয়ে এলো। পাখিরা কিচিরমিচির করে উঠল সমবেত স্বরে। গাছগুলো নড়ে উঠল। ডাল নেড়ে যেন বলল, বিদায়।
টিনো মুচকি হেসে বলল, বিদায়।


এভাবে হাসলে লিথি কপট রেগে যেত। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলত, খবরদার, অন্য কোনো মেয়ের সামনে এভাবে হাসবে না।
আমিও আসছি লিথি। জিশান আর ডিডোকে বলো, আমিও আসছি তোমাদের কাছে। টিনো ফিসফিস করে বলল। তার মুখে তখনও হাসি লেগে আছে।
মাথাটা দুলে উঠল এবার। বিষক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। টিনো মাটিতে বসে পড়ল।


তার কাছে ছুটে এলেন টিম লিডার। বললেন, মাফ করবেন। আমাকে আরেকটা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যদি একটু সাহায্য করতেন।
বলুন কী সাহায্য ? টিনোর গলার স্বর জড়িয়ে আসছে।
টিকার বিষয়ে যদি কিছু বলতেন…।


আমার বেল্টের ভেতরে একটা চিপস…। টিনো কথা শেষ করতে পারল না। তার চোখ বন্ধ হয়ে এলো। মা দু’হাত বাড়িয়ে ডাকছে, আয় টিনো, আয় বাবা…।
তুমি একা আমায় ডাকছো যে। বাবা কোথায়?
ঘুরতে বেরিয়েছে। লোকটা কী এক জায়গায় বসে থাকার মানুষ…।
আমি আসছি মা।
আয় বাবা। তাড়াতাড়ি আয়…।
টিম লিডার তখন ফোনে ব্যস্ত। স্যার, কাজ শেষ। একটা চিপস পাওয়া গেছে।

চিপসে থাকা বার্তা


মনিটরের সামনে দুজন বসে। প্রশ্নকর্তা আর টিম লিডার। চিপসের থাকা লেখা ভেসে আছে মনিটরে।
‘অনেকেরই ধারণা এই মহামারির জন্য আমরা চারজন দায়ী। আমরাই এটা সৃষ্টি করেছি। ভুল, একেবারেই ভুল। নিদুভাইরাস বর্গের সব শেষ প্রজাতির এই ভাইরাসটির আমরা শুধু সন্ধান পেয়েছি মাত্র। প্রকৃতিই এটা সৃষ্টি করেছে। আমরা নই। স্তন্যপায়ী প্রাণীতে এর বিস্তার খুব দ্রুত ঘটে। গবেষণা করতে গিয়ে ডিডো প্রথমে আক্রান্ত হয়। আমার ধারণা সে ইচ্ছে করেই আক্রান্ত হয়েছিল। এই গ্রহের সামগ্রিক অনাচার অনেক দিন ধরেই তার মনোবেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

আমরা মানে অন্য তিনজনও তার সঙ্গে একমত ছিলাম। ডিডো অসুস্থ হলে হাসপাতালে ভর্তি হয়। এরপর আক্রান্ত হয় জিশান। সেও যায় একই হাসপাতালে। ক্রমেই হাসপাতালে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে। একরাতে ডিডোকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়। কারণ সে নাকি মানব বোমায় পরিণত হয়েছিল। এ খবর শুনে হাসপাতাল থেকে পালায় জিশান। তবে শেষরক্ষা হয়নি। সে ধরা পড়ে। নির্যাতনের একপর্যায়ে আমার আর লিথির নাম বলে দেয়। জিশানকেও মেরে ফেলা হয়। লিথি মৃদু উপসর্গ নিয়ে বাসায় সেলফ আইসোলেশনে ছিল। তাকেও একরাতে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। আমার তেমন কোনো উপসর্গ ছিল না। তবে আমি যথেষ্ট সতর্ক ছিলাম। বাসায় সাধারণত একাই থাকি। কিন্তু সব শুনে আমি গা-ঢাকা দেই। এরই মধ্যে ছয়মাস পেরিয়ে গেছে। জানি, আমিও একদিন না একদিন ধরা পড়ব।

হ্যাঁ, আমরা চারজন মিলে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এই ভাইরাসের বিষয়ে আমরা সহজে কাউকে কোনো তথ্য দেবো না। প্রকৃতি প্রতিশোধ নিতে চাইছে, নেক। আমরা তাতে বাধা হয়ে দাঁড়াব না। আমাদের বিশ্বাস, মানুষ এই ধাক্কায় আরও মানবিক হবে। পরিবেশ দুষণমুক্ত হবে। প্রকৃতি আরও সতেজ হবে। এই গ্রহ সব প্রাণীর জন্য আরও বাসযোগ্য হবে।
এই বিশ্বাস থেকেই এ বিষয়ে সব ধরনের গবেষণা আমরা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আমরা কোনো প্রতিষেধক বা টিকা আবিষ্কারের চেষ্টা করিনি। এই ভাইরাস বড়াে মায়াময়। সহজে এই গ্রহ থেকে বিদায় নেবে না।


টিকার হদিস না থাকলেও একটা পাদটিকা আছে।

পাদটিকা: ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। সতর্ক থাকুন।’
শেষেও কী একটা রসিকতা করে গেছে। প্রশ্নকর্তা হতাশ গলায় বললেন।
জ্বি, স্যার। তাই তো দেখছি। টিম লিডারও সায় দিলেন।

দূরের এক গ্রহে

কেমন লাগল মহামান্য সম্রাট ?
ভালো। খুব ভালো। দারুণ তথ্যচিত্র।
আমি আপনাকে আগেই বলেছিলাম, এটা দেখার মতো…।
হ্যাঁ, অনেকদিন বাদে তুমি বলার মতো একটা কাজ করেছ।
নিখা এবার চুপ করে থাকলেন। তিনি হলেন সামান্য তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী। মহামান্য সম্রাটের সব কথার উত্তর দেওয়া তার সাজে না। তাদের গ্রহ খুব বেশি বড়াে নয়। মাঝারির চেয়েও আকারে ছোটাে। দুই মেরুর বিস্তীর্ণ এলাকা বরফে ঢেকে থাকে সারাবছর। এছাড়াও আছে অসংখ্য আগ্নেয়গিরি। আছে কঠিন আগ্নেয় শিলার পাহাড়-পর্বত। বাসযোগ্য এলাকা বলতে গেলে এক চতুর্থাংশ। জনসংখ্যা সোয়া দুইশ কোটির কাছাকাছি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে শিখরে পৌঁছেছে এই গ্রহের বাসিন্দারা। মৃত্যুকে তারা এখনও জয় করতে পারেনি। তবে অনেকটাই কাছাকাছি যেতে পেরেছে। গড় আয়ু পাঁচশ বছরের মতো। ফলে বয়স্কদের সংখ্যাই বেশি। গোটা গ্রহে একটাই বসতি। আর শাসনভার বলতে গেলে একজনের হাতেই, তিনি হলেন মহামান্য সম্রাট। তাঁর লম্বা-চওড়া একটা অলঙ্কারিক নাম আছে বটে। তবে সেটা কেউ ভুলেও উচ্চারণ করতে সাহস পায় না।
তথ্যচিত্রের এই গ্রহটা কত দূরের?


খুব বেশি দূরের নয়, মহামান্য সম্রাট। আমাদের গ্রহ থেকে দূরত্ব মাত্র আট আলোকমাস।
ওখানেও তাহলে ভাইরাস মহামারি হয়ে দেখা দিয়েছিল।
হ্যাঁ, এই তথ্যচিত্র তো সেটাই বলে।
তা আমাদের গ্রহে নতুন ভাইরাসটির সংক্রমনের কী অবস্থা?
অবস্থা খুব বেশি ভালো নয় মহামান্য সম্রাট। আক্রান্তের হার প্রতিদিনই বাড়ছে। মারাও যাচ্ছে অনেকে। আমার তো ধারণা এই ভাইরাসের থেকে আমাদের কারও নিস্তার নেই। আমরা সবাই এটায় আক্রান্ত হবো।
তুমি কি আমাকে একটা সঠিক তথ্য দিতে পারবে?
কী তথ্য, মহামান্য গ্রহকর্তা?


আমাদের গ্রহের ভাইরাসটি কী কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে?
না, মহামান্য সম্রাট। ভাইরাসটি প্রকৃতি থেকেই সৃষ্টি হয়েছে।
তার মানে, আমরা প্রকৃতির ওপর যথেষ্ট অত্যাচার করেছি।
এ কথা তো অনেকাংশে সত্য, মাননীয় অধিশ্বর।
শুনেছি, টিকা তৈরির কাজ জোরেশোরে চলছে।
টিকা তো দেওয়া শুরু হয়ে গেছে।


কী বলছো এসব! টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে, আর আমি জানি না। মহামান্য সম্রাটের গলায় উষ্মা।
যেটা সত্যি, সেটাই বলছি মহামান্য সম্রাট। নিখা মাথা নিচু করে গলা খানিকটা নামিয়ে বললেন।
কে দিয়েছে এই ছাড়পত্র?
আমাদের মান্যবর যুবরাজ। স্বাস্থ্যখাতের সবকিছু দেখভালের দায়িত্ব তো আপনিই তাকে দিয়েছেন মহামান্য গ্রহ অধিপতি।
সম্রাটের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় হঠাৎই সজাগ হয়ে উঠল। কিছু একটার আভাস যেন তিনি পেলেন। বললেন, তা কেমন কাজ করছে তোমাদের টিকা।
ভালো কাজ করছে মহামান্য সম্রাট। তবে…।
তবে কী?
এই টিকার একটা বিশেষত্ব আছে।
কী সেটা?


যাদের বয়স পাঁচশ বছরের নিচে এই টিকা শুধু তাদের দেহেই ভাইরাস প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারে।
তার মানে পাঁচশ বছরের বেশি বয়সীরা আক্রান্ত হলেই মারা যাবে। কী বলছো এসব! সম্রাট এবার নড়েচড়ে বসলেন। চোখ দুটো বন্ধ করে ডান হাত তুলে কপালে ঠেকালেন। তারপর হতাশায় ডুবে যাওয়া গলায় বললেন, নিখা, তুমি এবার এসো।
ঠিক আছে, মহামান্য সম্রাট। তাহলে বিদায়।


সম্রাটের পক্ষ থেকে নিখা আর কোনো জবাব পেলেন না। হঠাৎ তার মনে হলো এটাই সম্রাটের সঙ্গে তার হয়তাে শেষ দেখা। কারণ উনার বয়স ৫৪৬ বছর।

প্রাসাদ ষড়যন্ত্র


পুরনো স্মৃতি ভেসে উঠল সম্রাটের মনে। তিনি সিংহাসনে বসেছিলেন ২৪৬ বছর বয়সে। তার পিতা মারা যাওয়ার পর। মৃত্যুকালে উনার বয়স হয়েছিল ৪৪৬ বছর। সবাই জানে ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তিনি। টিকা দেওয়া হয়েছিল, লাভ হয়নি। আসলে ওই টিকায় মেশানো হয়েছিল বিষ। সবার অলক্ষ্যে আস্তে ধীরে যেটা কাজ শুরু করেছিল।

সেই একই চক্র। ধরনটা কেবল একটু আলাদা। আবার এসেছে মহামারি কাল। এবারও টিকা আছে। তবে যুবরাজ টিকার কার্যক্ষমতাকে কৌশলে বেঁধে দিয়েছেন।
একমাত্র সন্তান, বংশের শেষ প্রদীপ এই যুবরাজ, তাই অন্য কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ারও সুযোগ নেই।


এই জীবনে মহামান্য সম্রাটের নিজেকে এতটা অসহায় আর কখনও লাগেনি। একটা চাপা আতঙ্ক ক্রমেই গ্রাস করতে থাকল তাকে।

লেখক: কমলেশ রায় সাহিত্যিক ওদৈনিক যুগান্তরের সাবেক শিফট ইনচার্জ, বর্তমানে দৈনিকসময়ের আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক।