আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার
ইসরাইলের নির্বাচনের সম্ভাব্য ৮ ফলাফল
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
ইসরাইলের নির্বাচনের আগে বিলবোর্ডে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের পোস্টার। ছবি: এপি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসরাইলে আগামী ২৭ অক্টোবর সাধারণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের ক্ষমতা ধরে রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সরকার গঠন নিয়ে জোটগুলোর দর-কষাকষির মধ্যে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও ঝুলে আছে।
ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০টি আসনে এ নির্বাচন হবে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পর এটিই দেশটির প্রথম নির্বাচন। ওই হামলার পর গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হামলা চালিয়ে আঞ্চলিক সংঘাতও বিস্তৃত করেছে ইসরাইল।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোটের সঙ্গে ইহুদিদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের আসনসংখ্যার ব্যবধান খুব বেশি নয়। তবে নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে পরাজিত করলেই যে তিনি ক্ষমতা হারাবেন, বিষয়টি এমন নয়।
ইসরাইলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় সরকার গঠনের জন্য দলগুলোকে জোট করতে হয়। দেশটির ইতিহাসে কোনো একক দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। সরকার গঠনের জন্য নেসেটের অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, বিরোধী জোট ৫২টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৫০। ফলে সরকার গঠনে ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বাধীন দলগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইসরাইলের নির্বাচনে সম্ভাব্য আটটি পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো।
আবারও সরকার গঠন করতে পারেন নেতানিয়াহু
জনমত জরিপে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও নিজের লিকুদ পার্টির মাধ্যমে পুরোনো মিত্রদের সমর্থন ধরে রেখে কিংবা নতুন জোটসঙ্গী খুঁজে নিয়ে আবারও সরকার গঠন করতে পারেন নেতানিয়াহু।
তার ঐতিহ্যগত মিত্রদের মধ্যে রয়েছেন কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের জিউইশ পাওয়ার পার্টি এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের রিলিজিয়াস জায়নিস্ট পার্টি।
এ ছাড়া অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের প্রতিনিধিত্বকারী শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম পার্টিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অতীতে একাধিকবার নেতানিয়াহুর জোট সরকারে যোগ দিলেও দল দুটি বিভিন্ন সময়ে জোট থেকে বেরিয়ে গেছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে তারা জোট ছেড়েছিল।
বিরোধীদের নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যে গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে চারটি বিরোধী দল একে অপরের বিরুদ্ধে আগ্রাসী অবস্থান না নেওয়ার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছায়।
দলগুলো হলো ইয়াশার পার্টি, দ্য ডেমোক্র্যাটস, ইসরাইল বেইতেনু পার্টি এবং টুগেদার জোট। তারা ‘ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলকে সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করার’ লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে।
তবে বিরোধী জোট এখনো জানায়নি, সরকার গঠন করতে পারলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন। ইয়াশার পার্টির নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটকে এ পদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও সম্ভাব্য প্রার্থী। তিনি ইয়ার লাপিদের সঙ্গে টুগেদার জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
রা’আমকে নিয়ে জোট সরকার
ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব নেতৃত্বাধীন দুটি দল জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক। জনমত জরিপ অনুযায়ী, দল দুটি মিলিয়ে প্রায় ১৩টি আসন পেতে পারে।
রা’আম, যার পূর্ণ নাম ইউনাইটেড আরব লিস্ট, ২০২১ সালে নাফতালি বেনেটের জোট সরকারে যোগ দিয়ে ইতিহাস গড়েছিল। ইসরাইলের কোনো সরকারে অংশ নেওয়া প্রথম আরব নেতৃত্বাধীন দল ছিল এটি।
রা’আমের নেতা মনসুর আব্বাস ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিরোধী জোটের সরকার গঠনে অতিরিক্ত আসনের প্রয়োজন হলে তারা আবারও একই ধরনের সমঝোতায় যেতে পারেন।
ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের মধ্যে বেড়ে চলা সহিংস অপরাধ দমন এবং আবাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক সরকারি নীতির পরিবর্তনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
তবে বিরোধী জোটের অধিকাংশ নেতা, এমনকি গাদি আইজেনকোটও রা’আমকে নিয়ে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।
সংখ্যালঘু সরকার গঠন
কোনো জোট ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে ব্যর্থ হলে অন্য দলগুলোর বাইরের সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সমর্থন দেওয়া দলগুলো সরকারে সরাসরি অংশ না নিয়েও পার্লামেন্টে সরকারকে সহযোগিতা করতে পারে।
জয়েন্ট লিস্ট জানিয়েছে, নেতানিয়াহুবিরোধী জোট সরকার গঠন করলে তারা আস্থাভোটে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে এক ধরনের ‘সুরক্ষা বলয়’ তৈরি করতে পারে।
এর বিনিময়ে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি এবং সংগঠিত অপরাধ দমনের মতো বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার শর্ত দিতে পারে দলটি।
তবে এ ধরনের সরকার গঠিত হলে জোটের কোনো সদস্য সমর্থন প্রত্যাহার করলে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে সরকার সংকটে পড়তে পারে।
জাতীয় ঐক্যের সরকার
ইসরাইলের পার্লামেন্টের সংজ্ঞা অনুযায়ী, জাতীয় ঐক্যের সরকার হলো এমন একটি সরকার, যেখানে বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা বৃহত্তর জোটের অংশ হিসেবে একসঙ্গে কাজ করেন।
সাধারণত যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের মতো জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে এ ধরনের সরকার গঠন করা হয়।
২০২০ সালের মে মাসে টানা তিনটি নির্বাচনে সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থার পর নেতানিয়াহু ও বেনি গান্তজ জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করেছিলেন। তবে এক বছরের মধ্যেই সেই সমঝোতা ভেঙে যায়।
২০২৩ সালে হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পর গান্তজ ও তার দলের সদস্যরা আবারও নেতানিয়াহুর জোটে যোগ দেন। এর আগে নেতানিয়াহুর বিরোধিতা করলেও জরুরি পরিস্থিতিতে তারা ঐক্যবদ্ধ সরকারে অংশ নিয়েছিলেন।
নতুন নির্বাচনের পরও রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হলে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।
পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সমঝোতা
সরকার গঠনের সংকট কাটাতে দুই রাজনৈতিক নেতা পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সমঝোতা করতে পারেন।
২০২০ সালে নেতানিয়াহু ও বেনি গান্তজ এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন। কিন্তু জোট ভেঙে যাওয়ায় গান্তজের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব হয়নি।
২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদও একই ধরনের চুক্তি করেছিলেন। ওই সমঝোতা অনুযায়ী, বেনেট প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময় শেষে লাপিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা ছিল।
কিন্তু ২০২২ সালের জুনে বেনেটের জোট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। পরের মাসে লাপিদ তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
নতুন নির্বাচনের পর কোনো একক জোটের পক্ষে স্থিতিশীল সরকার গঠন সম্ভব না হলে একই ধরনের সমঝোতা আবারও আলোচনায় আসতে পারে।
একই রাজনৈতিক শিবির থেকে অন্য প্রধানমন্ত্রী
ইসরাইলে নির্বাচনের পর নেসেটের সদস্যদের সমর্থনের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা দীর্ঘায়িত হলে রাজনৈতিক দলগুলো নেতানিয়াহুর শিবির কিংবা বিরোধী জোটের এমন কোনো নেতাকে সমর্থন করতে পারে, যিনি জোটের অন্য অংশীদারদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য।
এ ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর নিজের রাজনৈতিক শিবির থেকেই অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়া হতে পারে। একইভাবে বিরোধী জোটের মধ্য থেকেও বিকল্প প্রার্থী সামনে আসতে পারেন।
অর্থাৎ, নির্বাচনে কোনো শিবিরের আসনসংখ্যা বেশি হলেও শেষ পর্যন্ত সরকারপ্রধান কে হবেন, তা নির্ভর করতে পারে জোট গঠনের আলোচনার ওপর।
সমঝোতা না হলে আবারও নির্বাচন
কোনো নেতা নেসেটে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে ইসরাইলকে আবারও নির্বাচনের পথে হাঁটতে হতে পারে।
২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশটিতে পাঁচবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক জোটগুলো স্থিতিশীল সরকার গঠনে বারবার ব্যর্থ হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
নতুন নির্বাচনেও সরকার গঠনের মতো সমর্থন নিশ্চিত করা না গেলে দেশটিতে আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন নেতানিয়াহু।




