কুরআন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চলন্ত স্কুলবাসের ১৯ শিশুকে বাঁচান যুবক
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৫ পিএম
মার্কিন মুসলিম যুবক এব্রো আহমেদ।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের সেন্ট পলে চালক অসুস্থ হয়ে পড়ায় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যাওয়া একটি স্কুলবাসে উঠে সেটি থামিয়ে দেন ২৭ বছর বয়সী মুসলিম যুবক এব্রো আহমেদ। বাসটিতে আতঙ্কিত ১৯ শিক্ষার্থী ছিল। কুরআনের একটি আয়াত তাকে এমন ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) এ ঘটনার স্মৃতিচারণ করে এব্রো আহমেদ বলেন, ‘আমি সংখ্যার হিসাব বুঝি, আর এই সংখ্যাগুলো আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয়। আমি নিজের জন্য এটা করিনি। সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজটি করেছি।’
ঘটনাটি ঘটে গত সোমবার বিকেলে। সেন্ট পলে পরিবারের মালিকানাধীন ‘ইয়া ব্রিকস স্ন্যাকস অ্যান্ড টোব্যাকো’ নামের দোকানের বাইরে বিরতির সময় ফুটবল খেলছিলেন এব্রো। পাশাপাশি মোবাইল ফোনও দেখছিলেন তিনি। এ সময় হঠাৎ একটি হলুদ রঙের স্কুলবাসকে পাশ দিয়ে যেতে দেখেন, যার দরজা খোলা ছিল।
বাসচালকের মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে দেখে তার সন্দেহ হয়, চালক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মুখ দিয়ে ফেনা বের হওয়া খিঁচুনির একটি লক্ষণ হতে পারে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে এক মুহূর্ত দেরি না করে বাসটির দিকে দৌড়ে যান আহমেদ। এরপর চলন্ত বাসে লাফিয়ে ওঠেন। সামনে বসা দুই ছাত্রীর হাতে নিজের মোবাইল ফোন ও চশমা দিয়ে দেন, যাতে দুই হাত খালি রেখে বাসটি থামানোর চেষ্টা করতে পারেন।
প্রথমে বাসটিকে পার্কিং গিয়ারে নেওয়ার চেষ্টা করার কথা ভাবেন তিনি। কিন্তু চারপাশে ভীতসন্ত্রস্ত শিশুদের চিৎকার শুনে শেষ পর্যন্ত বাসটির জরুরি ব্রেক টেনে ধরেন। এতে বাসটি থেমে যায়। এ ঘটনায় বাসের ভেতরে থাকা কোনো শিক্ষার্থী কিংবা রাস্তায় থাকা কেউ আহত হননি।
বাস থামানোর পর শিশুদের একজনকে জরুরি সহায়তার জন্য ফোন করতে বলেন এব্রো।
শুক্রবার সেন্ট পলের সরকারি স্কুল জেলা কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানায়, ওই দিন এব্রোর পরিবারের দোকানের সামনে একটি স্কুলবাসে চালকের চিকিৎসাজনিত জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। খবর পেয়ে প্যারামেডিকরা ঘটনাস্থলে যান। পরে অন্য একটি বাস এসে বাসটিতে থাকা ১৯ শিক্ষার্থীকে বাড়িতে পৌঁছে দেয়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কেটিএসপি আহমেদের চলন্ত বাসে দৌড়ে ওঠার ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করে। এরপর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আহমেদ জানান, চিকিৎসাবিষয়ক জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘গ্রেজ অ্যানাটমি’ থেকে এমন পরিস্থিতিতে কী করতে হয়, সে সম্পর্কে কিছু ধারণা পেয়েছিলেন তিনি।
শুক্রবার দ্য গার্ডিয়ানকে এব্রো বলেন, বিপদের মুহূর্তে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কুরআনের একটি আয়াতের কথাও তার মনে পড়েছিল। সূরা আল-মায়েদার ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো প্রাণের বিনিময়ে নয় কিংবা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যে কারও প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির প্রাণ রক্ষা করল।’
তিনি আরও বলেন, পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা তার মা-বাবার জন্য সেন্ট পলে ব্যবসা পরিচালনা করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ব্যাপক অভিবাসনবিরোধী অভিযান শুরুর পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এব্রো জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘অপারেশন মেট্রো’ নামের অভিযানের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় অভিবাসন কর্মকর্তারা সেন্ট পল ও পাশের মিনিয়াপোলিসে অভিযান শুরু করার পর তাদের দোকানের ব্যবসা কমে গেছে।
তবে স্কুলবাসের শিশুদের রক্ষার ঘটনায় ইরিত্রীয় ও পূর্ব আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর মানুষদের ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার সুযোগ পেয়ে স্বস্তি অনুভব করছেন আহমেদ। তার ভাষায়, তিনি ভালোভাবে ইরিত্রীয়দের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরেছেন।
এদিকে, তার সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ স্থানীয় একটি বিপণন ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান তাকে এক হাজার ডলার অনুদান দিয়েছে। এ সময় সুপারম্যানের পোশাক পরা একজন ব্যক্তিও উপস্থিত ছিলেন। তার হাতে একটি বড় আকারের প্রতীকী চেক তুলে দেওয়া হয়।
এব্রো জানান, তাকে অন্তত একটি প্যানেলে বক্তব্য দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। একজন সিটি কাউন্সিল সদস্যও ফোন করে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ইউরোপে থাকা তার এক চাচাও সংবাদমাধ্যমে খবরটি দেখে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

