চাকরির নামে কম্বোডিয়ায় পাচার, পর্নোগ্রাফিতে বাধ্য করা হতো যুবকদের
Advertisement
খুলনা ব্যুরো
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে খুলনার তরুণদের কম্বোডিয়ায় পাচারের অভিযোগ উঠেছে একটি দালালচক্রের বিরুদ্ধে। কম্পিউটারের কাজ দেওয়ার কথা বলে বিদেশে নেওয়ার পর তাদের চীনা ও থাই মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হতো। পরে জিম্মি করে অনলাইনে মেয়েদের সঙ্গে যৌন চ্যাটিংসহ পর্নোগ্রাফিক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হতো। নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে চালানো হতো নির্যাতন।
চলতি মাসের প্রথম দিকে পাচারচক্রের মূলহোতা জিহাদ আলী লস্কর জজ ও তার স্ত্রী সুমাইয়া সুমিকে গ্রেফতার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তারা খুলনার দৌলতপুরের বাসিন্দা। কম্বোডিয়া থেকে কোনোমতে বেঁচে ফেরা মোস্তাকিম হাসান কাজীসহ দুজন এসব তথ্য জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চিহ্নিত মানব পাচারকারী জিহাদ ও তার স্ত্রী সুমি বেশ কিছুদিন ধরে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদ পেতে আসছিল। চক্রটি খুলনার একাধিক তরুণকে কম্পিউটারসংক্রান্ত কাজ ও প্রতি মাসে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা বেতনের প্রতিশ্রুতি দেয়। সহজ-সরল তরুণরা তাদের কথায় বিশ্বাস করে জমিজমা বিক্রি ও ঋণ করে একেকজন ৬ থেকে সাড়ে ৬ লাখ টাকা তুলে দেন এই দম্পতির হাতে। কিন্তু কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পরই তরুণদের সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়। এয়ারপোর্ট থেকেই তাদের অপহরণের আদলে নিয়ে গিয়ে ২ থেকে ৫ হাজার ডলারে বিক্রি করে দেওয়া হয় চীনা ও থাই মাফিয়াদের আস্তানায়। ফ্ল্যাট ও বিভিন্ন হোটেলে এই যুবকদের দিয়ে অনলাইনের মাধ্যমে মেয়ে সেজে সেক্সুয়াল চ্যাটিং করানোসহ আপত্তিকর ও পর্নোগ্রাফিক অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হতো। পাচারকারীদের শেখানো স্ক্রিপ্ট ও নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালেই নেমে আসত নির্যাতন।
ভুক্তভোগী মোস্তাকিম হাসান কাজী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ‘আমাদের ভালো কাজের কথা বলে নিয়ে জিম্মি করা হয়। মাফিয়াদের অনৈতিক নির্দেশমতো কাজ করতে না পারায় তারা আমার ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালায়। অনলাইনে মেয়েদের সঙ্গে অনৈতিক কাজ করতে বাধ্য করা হতো। রাজি না হলে শরীরে ভারী ইলেকট্রিক শক দেওয়া হতো এবং দিনের পর দিন না খাইয়ে ঘরে আটকে রাখা হতো।’
মোস্তাকিম বলেন, ‘খুলনা ছাড়াও বাংলাদেশের অনেক যুবক কম্বোডিয়ায় এই প্রতারণার শিকার হচ্ছে। তাদের ঘরের ভেতর জিম্মি করে মাফিয়ারা এসব কাজ করছে। আমরা যখন কম্বোডিয়ায় ছিলাম তখন দালালচক্রের সদস্য জজ কম্বোডিয়ায় ছিল। অসুবিধার কথা তাকে বললেও সে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত খুলনার অনেককেই কম্বোডিয়ায় নেওয়া হয়েছে।
আরেক ভুক্তভোগী মনিরুল ইসলাম মুকুল জানান, ‘মাফিয়াচক্রের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো পথ ছিল না। সেখান থেকে উদ্ধার পেতে বা দেশে ফিরতে হলে দিতে হতো বিপুল অঙ্কের অর্থ।
খুলনার দুই ছেলেকে থাইল্যান্ডের মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। কম্বোডিয়া থেকে থাইল্যান্ডে যাওয়ার পথে তারা বর্ডারে গোলাগুলির শিকারও হয়। পরে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ পরিশোধ করে তারা কোনোমতে দেশে ফেরার সুযোগ পায়।’
জজ দম্পতির হাতে খুলনার অনেক তরুণ প্রতারণার শিকার হয়। তাদের মধ্যে অন্তত চারজন বাংলাদেশে ফেরত এসে একত্রিত হয়ে খুলনার আদালতে মামলা করেন। পিবিআই খুলনা মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে অভিযান চালায়। ৩ আগস্ট ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুর এলাকা থেকে জিহাদ ও সুমি গ্রেফতার হয়। পরে তারা ১৬৪ ধারায় আদালতে কম্বোডিয়ায় পাচার করার বিষয়টি স্বীকার করে।
খুলনার পিবিআই পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন জানান, তাদের গ্রেফতারে প্রাথমিক তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়। তারা আদালতে অপরাধের কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়।


