৩০-এর আগেই ধমনিতে প্লাক, নীরবে বাড়ছে হৃদরোগের ঝুঁকি
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হৃদরোগের ঝুঁকি মধ্যবয়সে গিয়ে তৈরি হয়, এমন ধারণা প্রচলিত থাকলেও নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণ বয়সেই ধমনিতে চর্বি ও কোলেস্টেরল জমতে শুরু করতে পারে। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রতি ১৩ জন পুরুষের একজনেরও বেশি এবং প্রতি ১৫ জন নারীর প্রায় একজনের ধমনিতে এমন আস্তরণের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে এসব তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাক হবেই। বরং উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই হৃদরোগের ঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব তুলে ধরেছে গবেষণাটি।
চলতি বছর আগস্টের শেষ দিকে দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত গবেষণাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্পেন ও ডেনমার্কের ১৮ থেকে ৭০ বছর বয়সী ১৬ হাজার ৮০৮ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করেন গবেষকরা। অংশগ্রহণকারীদের আগে থেকে পরিচিত কোনো হৃদরোগ ছিল না। বিভিন্ন ধমনির বিস্তারিত ইমেজিংয়ের মাধ্যমে তাদের শরীরে চর্বির আস্তরণ বা প্লাকের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়।
এতে দেখা যায়, সব বয়স মিলিয়ে ৫৭ দশমিক ১ শতাংশের ধমনিতে প্লাক রয়েছে। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে পুরুষদের ৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং নারীদের ৬ দশমিক ৭ শতাংশের ক্ষেত্রে এটি শনাক্ত হয়।
ধমনিতে কীভাবে জমে চর্বির আস্তরণ
অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস হলো ধমনির দেয়ালে কোলেস্টেরল ও অন্যান্য উপাদান জমে আস্তরণ তৈরির একটি ধীরগতির প্রক্রিয়া। বিশেষ করে এলডিএল বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরল ধমনির দেয়ালে জমা হতে পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় শরীরে প্রদাহ তৈরি হয় এবং সময়ের সঙ্গে চর্বি, প্রদাহজনিত কোষ, তন্তুযুক্ত টিস্যু ও ক্যালসিয়াম মিলে প্লাক গড়ে ওঠে।
বহু বছর ধরে এই প্রক্রিয়া চললেও কোনো উপসর্গ নাও দেখা দিতে পারে। ধমনিতে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকায় আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে বুঝতে পারেন না। তবে কোনো একপর্যায়ে প্লাক অস্থিতিশীল হয়ে ফেটে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। এই জমাট রক্ত হৃদযন্ত্রের ধমনি বন্ধ করে দিলে হার্ট অ্যাটাক এবং মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল ব্যাহত হলে ইস্কেমিক স্ট্রোক হতে পারে।
শৈশবেও শুরু হতে পারে হৃদরোগের প্রক্রিয়া
গবেষকদের মতে, অনেকের ক্ষেত্রে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসের প্রাথমিক পরিবর্তন শৈশব ও কৈশোরেই শুরু হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে শিশুদের ধমনিতে বড়দের মতো বাধা সৃষ্টিকারী পরিণত প্লাক তৈরি হয়ে যায়। বরং রোগের প্রাথমিক পরিবর্তন অনেক আগে থেকেই শুরু হতে পারে, যা দীর্ঘদিন উপসর্গহীন থাকে।
ভারতের বেঙ্গালুরুর স্পর্শ হাসপাতালের প্রধান হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও মেডিকেল ডিরেক্টর ডা. রঞ্জন শেঠি বলেন, কৈশোর থেকেই কারও এলডিএল কোলেস্টেরল বেশি থাকলে তা বছরের পর বছর ধমনিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করার অস্বাভাবিকতা, ধূমপান ও অতিরিক্ত শরীরের চর্বিও এই ঝুঁকি বাড়ায়।
বংশগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের ইতিহাসের কারণে যাদের শরীরে শৈশব থেকেই কোলেস্টেরল অত্যধিক থাকে, তাদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে কোলেস্টেরলের সংস্পর্শে থাকার কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কিশোরদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে তুলনামূলক কম বয়সে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় আলোচনা হয়েছে। জিনগত বৈশিষ্ট্য, শরীরের গঠন, ইনসুলিন প্রতিরোধ, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম ও শৈশবের পরিবেশ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
দক্ষিণ এশীয়দের কারও কারও শরীরে স্বাভাবিক বিএমআই থাকলেও পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমতে পারে। এটি ইনসুলিন প্রতিরোধ ও বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে বাইরে থেকে অতিরিক্ত মোটা মনে না হলেও কারও শরীরে হৃদরোগের ঝুঁকিসংশ্লিষ্ট উপাদান থাকতে পারে।
এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ট্রাইগ্লিসারাইড বেশি, ভালো কোলেস্টেরল বা এইচডিএল কম এবং কিছু ক্ষেত্রে লিপোপ্রোটিন(এ) বেশি থাকার প্রবণতাও দেখা যায়। এসব উপাদান হৃদরোগের ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারতের কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে করা বিভিন্ন গবেষণায় স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করার অস্বাভাবিকতা এবং কোলেস্টেরলের সমস্যার মতো ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে। ১৬টি ভারতীয় গবেষণার ১৯ হাজারের বেশি কিশোর-কিশোরীর তথ্য নিয়ে করা একটি পর্যালোচনায় বিপাকীয় সিনড্রোমের হার প্রায় ৩ দশমিক ৪ থেকে ৫ শতাংশ পাওয়া যায়। তবে গবেষণাভেদে রোগ নির্ণয়ের মানদণ্ড আলাদা হওয়ায় এই হারকে পুরো ভারতের জাতীয় চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ফাস্টফুড নয়, অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার, পরিশোধিত শর্করা, চিনিযুক্ত পানীয়, ঘন ঘন নাশতা এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়াও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সবার কি ধমনির পরীক্ষা করানো প্রয়োজন?
গবেষণাটি সুস্থ কিশোর-কিশোরীদের সবার নিয়মিত ধমনির ইমেজিং পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেয় না। ধমনিতে প্লাক শনাক্ত হলেই যে ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাক হবে, তা নিশ্চিত নয়। আবার সবার ক্ষেত্রে এ ধরনের পরীক্ষা করলে হৃদরোগ প্রতিরোধে উপকার হবে, এমন প্রমাণও এই গবেষণা দেয়নি। কিছু উন্নত ইমেজিং পরীক্ষায় খরচের পাশাপাশি অপ্রত্যাশিত ফলাফল ও সিটি স্ক্যানের ক্ষেত্রে বিকিরণের ঝুঁকিও থাকতে পারে।
ডা. রঞ্জন শেঠির মতে, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অল্প বয়সে হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস কিংবা বংশগত কোলেস্টেরলজনিত সমস্যার সন্দেহ থাকলে শিশু-কিশোরদের চিকিৎসকের পরামর্শে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

-6addb87bb5643.jpg)