Logo
Logo
×

Advertisement

জাতীয়

যেসব কারণে বিআরটি প্রকল্প নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম

যেসব কারণে বিআরটি প্রকল্প নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে

বিআরটি

Advertisement

যানজট এড়িয়ে সড়ক পথে গণপরিবহণে গতি আনার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল বিআরটি প্রকল্প। পরিকল্পনা ছিল, ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে নির্দিষ্ট লেনে চলবে বিশেষ বাস। এতে গাজীপুরসহ আশপাশের ১৮ জেলার মানুষের যাতায়াতের সময় কমার পাশাপাশি বাড়ার কথা ছিল সড়কের সক্ষমতা; কিন্তু ১৪ বছরেও চালু করা যায়নি সেই বাসসেবা। উল্টো নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রিতায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বেড়েছে যানজট, ভোগান্তি ও পরিবহণ ব্যয়। 

অবশেষে ৯৭ শতাংশ অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর গত ১৮ অক্টোবর প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অবকাঠামো সরিয়ে বিআরটিকে ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এজন্য করিডোরে নির্মিত ২৫টি স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করা হবে। এতে ব্যয় হবে ৪৫ কোটি টাকা। সড়কটি প্রশস্ত করতে চাওয়া হয়েছে আরও ২৭ কোটি টাকা। 

ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন সরানো, পানি নিষ্কাশন সমস্যা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতায় বিআরটির কাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। এছাড়া বিআরটি প্রকল্পের অন্যতম ব্যর্থতা হিসেবে বলা হয়েছে, বিশেষ বাস সংগ্রহ করতে না পারা। প্রথমে স্বয়ংক্রিয় দরজাযুক্ত দীর্ঘ বাস চালুর পরিকল্পনা করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে বৈদ্যুতিক বাস কেনার উদ্যোগও কার্যকর হয়নি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিলে ১৩৭টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডিজেলচালিত বাস কেনার দরপত্র আহ্বান করা হলেও শেষপর্যন্ত বাস সংগ্রহ করা যায়নি। 

অন্যদিকে স্টেশনগুলোর নকশায় বাসের দরজার অবস্থান নিয়ে অসামঞ্জস্য ছিল। বাংলাদেশের প্রচলিত বাসের দরজা বামপাশে থাকলেও বিআরটি স্টেশন তৈরি করা হয়েছিল ডানপাশে দরজাবিশিষ্ট বাসের কথা বিবেচনায় রেখে। অবশ্য বিশ্বব্যাপী বিআরটি লেনে দরজা ডান দিকেই থাকে। ডান দিকে দরজাওয়ালা বাস চালু করলে ওই বাসগুলো গাজীপুর-বিমানবন্দরের বাইরে চলতে পারবে না। ফলে গাজীপুর ও এর উত্তরের জেলার যাত্রীদের বিমানবন্দরে এসে বাস বদলিয়ে সামনে আসতে হতো।

বিআরটির আরেকটি দৃশ্যমান ত্রুটি হচ্ছে সড়কগুলো খুবই সরু। কোনো কারণে বাসে সমস্যা হলে সড়ক বন্ধ হয়ে যাবে। ডিভাইডার থাকায় অন্য বাস যাতায়াত করতে পারবে না। এছাড়া সড়ক পারাপার ছিল ঝুঁকিপূর্ণ।

বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে এ সিদ্ধান্তের আগে প্রকল্পটির কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল। দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক। 

তার প্রতিবেদনে প্রকল্পটিকে দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ‘পদ্ধতিগত ব্যর্থতার’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। 

বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান অধ্যাপক সামছুল হক প্রকল্প বাতিলের বিষয়ে বলেন, বিআরটি প্রকল্প নিয়ে সম্ভাব্য যতগুলো বিকল্প আছে, এর মধ্যে সবচেয়ে ভালো বিকল্প হচ্ছে প্রকল্পটি বাতিল করা। তিনি বলেন, বিআরটি বাস চালু হলে গাজীপুরবাসী শুধু বিমানবন্দর পর্যন্ত আসতে পারত। তাদের পুনরায় বাস বদল করার দরকার হতো, যা বাস্তবসম্মত নয়।

শুরু থেকেই পরিকল্পনায় ত্রুটি

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশা শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। নির্মাণকাজ শুরুর পর দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় যথাযথ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই। ফলে পানি জমে থাকে। বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন সরানোর পরিকল্পনাও আগে থেকে করা হয়নি। ব্যস্ত সড়কে নির্মাণকাজ চলার সময় যানবাহন সচল রাখার বিকল্প ব্যবস্থাও ছিল না।

যাত্রীদের ওঠানামার জন্য নির্মিত কয়েকটি পদচারী-সেতুতে চলন্ত সিঁড়ি ও লিফট রয়েছে; কিন্তু এসব স্থাপনার অনেকটিই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও যন্ত্রপাতিতে জং ধরেছে, কোথাও অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে। বিআরটি লেন আলাদা করতে সড়কের মাঝখানে সিমেন্টের প্রতিবন্ধক বসানো হয়েছে। কিছু স্থানে লোহার বেড়া দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে সড়কের জায়গা কমেছে। কোথাও উড়ালপথ, কোথাও সমতল সড়ক, আবার কোথাও সরু লেন থাকায় যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।

বিআরটি প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। অন্যান্য দেশের তুলনায় ৩ গুণ ব্যয় হয়েছে এতে। প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় তিন দফা সংশোধনের পর বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকায়। প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় বৃদ্ধি পায় ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকার বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১০৯ শতাংশ। সওজ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পে ক্রমপুঞ্জীভূত ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। অনুমোদিত ব্যয়ের প্রায় ৬৬ শতাংশ খরচ হলেও যাত্রী পরিবহণের জন্য বিআরটি চালু করা সম্ভব হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও তা অনুমোদন পায়নি।শেষ পর্যন্ত এটি বাতিল করেছে সরকার।

এদিকে গাজীপুর-বিমানবন্দর বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিল এবং এর অবকাঠামো সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্তটি সঠিক হয়নি বলে  জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সংগঠনটি বলছে, এ বিষয়ে সরকার সবচেয়ে খারাপ বিকল্পটি বেছে নিয়েছে। সরকার এর মধ্য দিয়ে ১৪ বছর ধরে নির্মাণ কাজের দুর্ভোগ পোহানো গাজীপুর ও উত্তরার বাসিন্দাদের প্রতি সুবিচার করেনি।

বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান এক বিবৃতিতে সিদ্ধান্তটিকে টেকসই, জ্বালানি সাশ্রয়ী ও সবার ব্যবহার উপযোগী গণপরিবহণের ইতিহাসে ‘কালো দিন’ হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন।

বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, সিদ্ধান্তটি ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারী এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নির্মাণ লবির স্বার্থের পক্ষে গেছে। এটি গাজীপুর ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান এবং ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহণ পরিকল্পনার প্রস্তাবনার পরিপন্থি।

অধ্যাপক শামসুল হক জানান, প্রকল্পটি কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত হওয়ার কথা ছিল। সেটা তো হচ্ছে না, তাহলে গাজীপুরবাসী যে স্বপ্ন দেখেছিল, তা বাস্তবে রূপ পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিআরটি প্রকল্পের বর্তমান অবস্থান ক্যানসারের ফোর্থ স্টেজের রোগীর মতো। ওই পর্যায়ে চিকিৎসক হয়ে পরিবারের সদস্যদের বাস্তবতা বলে দেওয়া নৈতিকতার পরিচয় বহন করে। আর আশ্বস্ত করে টাকা খরচ করানো অনৈতিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। একজন প্রকৌশলী হিসাবে নৈতিক দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। কেউ না বুঝে যদি চালুর ব্যাপারে মতামত ব্যক্ত করেন, সেটা তাদের ব্যাপার।

এ বিষয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দীন হাসান যুগান্তরকে বলেন, সরকারকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে প্রকল্পটি চালু করতে। এটা করা গেলে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ধারণাটি বাংলাদেশেও জনপ্রিয়তা পাবে। পাশাপাশি মানুষ সুবিধা ভোগ করবে। বিষয়টি সরকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। 

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

আধুনিক বিআরটির বৈশিষ্ট্য কী কী, আর কোন কোন দেশে আছে?

আধুনিক বিআরটির বৈশিষ্ট্য কী কী, আর কোন কোন দেশে আছে?

সেই মাদ্রাসাশিক্ষকের জামিন নামঞ্জুর

সেই মাদ্রাসাশিক্ষকের জামিন নামঞ্জুর

গাজীপুরে মাদ্রাসার ৬ শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা

গাজীপুরে মাদ্রাসার ৬ শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা

গাজীপুরসহ ১৮ জেলার যানজট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনার দাবি

গাজীপুরসহ ১৮ জেলার যানজট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনার দাবি

গাজীপুরে পোশাক কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে

গাজীপুরে পোশাক কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে

নিয়ন্ত্রণে যোগ দিয়েছে ফায়ার সার্ভিসের আরও ৪ ইউনিট

গাজীপুরে পোশাক কারখানায় আগুন নিয়ন্ত্রণে যোগ দিয়েছে ফায়ার সার্ভিসের আরও ৪ ইউনিট

আরও পড়ুন

উচ্চকক্ষে অর্ধেক আসন ভোটের অনুপাতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব

উচ্চকক্ষে অর্ধেক আসন ভোটের অনুপাতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব

ঢাকা থেকে দাম্মাম ও রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত

ঢাকা থেকে দাম্মাম ও রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত

আধুনিক বিআরটির বৈশিষ্ট্য কী কী, আর কোন কোন দেশে আছে?

আধুনিক বিআরটির বৈশিষ্ট্য কী কী, আর কোন কোন দেশে আছে?

যেসব কারণে বিআরটি প্রকল্প নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে

যেসব কারণে বিআরটি প্রকল্প নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম