আধুনিক বিআরটির বৈশিষ্ট্য কী কী, আর কোন কোন দেশে আছে?
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম
বিআরটি। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিআরটি মানে আমরা সবাই জানি বাস র্যাপিড ট্রানজিট। বাংলায় দ্রুতগতির গণপরিবহণ। নগর ও পরিবহণ পরিকল্পনাবিদদের, কাছে বিআরটি এর মানে Better Regeneration of Towns and Territories। নগর পরিকল্পনাবিদরা একে দ্রুত বর্ধনশীল, ঘনবসতিপূর্ণ ও অপেক্ষাকৃত কম আয়ের শহরের জন্য গেইম চেইঞ্জার মনে করেন। এটি নিছক একটি যোগাযোগ অবকাঠামো ও পরিবহণ সেবা নয়। বরং নগর পরিবহণের প্রথাগত অভিজ্ঞতার বিপরীতে কি নতুন সংযোজন করলো, সন্নিহিত নগর কেন্দ্র ও ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী নতুন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত উন্নয়ন সম্ভাবনা তৈরি করল, আর কত কম খরচে এসব সম্ভাবনা তৈরি করল তার ওপর।
যানজট এড়িয়ে সড়ক পথে গণপরিবহণে গতি আনার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল বিআরটি প্রকল্প। পরিকল্পনা ছিল, ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে নির্দিষ্ট লেনে চলবে বিশেষ বাস। এতে গাজীপুরসহ আশপাশের ১৮ জেলার মানুষের যাতায়াতের সময় কমার পাশাপাশি বাড়ার কথা ছিল সড়কের সক্ষমতা; কিন্তু ১৪ বছরেও চালু করা যায়নি সেই বাসসেবা। উল্টো নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রিতায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বেড়েছে যানজট, ভোগান্তি ও পরিবহণ ব্যয়।
অবশেষে ৯৭ শতাংশ অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর গত ১৮ অক্টোবর প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অবকাঠামো সরিয়ে বিআরটিকে ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এজন্য করিডোরে নির্মিত ২৫টি স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করা হবে। এতে ব্যয় হবে ৪৫ কোটি টাকা। সড়কটি প্রশস্ত করতে চাওয়া হয়েছে আরও ২৭ কোটি টাকা।
ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন সরানো, পানি নিষ্কাশন সমস্যা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতায় বিআরটির কাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) প্রতিবেদন মতে, আধুনিক বিআরটির বৈশিষ্ট্য হলো পাঁচটি— (১) বাসের জন্য নির্দিষ্ট লেন, (২) প্রিপেইড বোর্ডিং, (৩) প্ল্যাটফর্ম লেভেলে বোর্ডিং, (৪) উচ্চ ধারণক্ষমতা সম্পন্ন আর্টিকুলেটেড বাস এবং (৫) সমন্বিত ভূমি ব্যবহার ও পরিবহণ ব্যবস্থা। বিআরটি মেট্রো রেলের অর্ধেক যাত্রী বহন করতে পারে, মোটামুটি ঘণ্টাপ্রতি ২০-৩৫ কিলোমিটার গতিবেগে চলে; কিন্তু নির্মাণ খরচ মেট্রোরেলের এক দশমাংশ। এ কারণে উন্নত দেশগুলোতে এর কদর বাড়ছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের এক গবেষণা মতে, দেশের ১টি শহরে (চট্টগ্রাম) বিআরটি overdue, ৬টিতে (রাজশাহী, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, নোয়াখালী) এখনই দরকার, অদূর ভবিষ্যতে দরকার হবে আরও ১৩টিতে। এ গবেষণা যখন করা হয় তখন ঢাকা-গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জে বিআরটির কাজ চলমান ছিল। তাই এ তিন শহরকে এ গবেষণার আওতা হতে বাদ রাখা হয়; কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আজ দেশের প্রথম বিআরটি প্রকল্প ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর বন্ধ হয়ে গেল। এই প্রকল্প তো ২০১২ সালে শুরু হয়ে ২০১৬ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
পৃথিবীতে বিআরটির যাত্রা ১৯৭৪ সালে ব্রাজিলের কুরিচিবা শহরে। ১৮৬৩ সালে লন্ডনে শুরু হবার পর এখন বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০৫টি শহরে MRT (মেট্রো রেল, টিউব, স্কাইট্রেন ইত্যাদি নানা নামে) রয়েছে। সংখ্যার বিচার নি:সন্দেহে বিআরটি বৃদ্ধির হার বেশি। ২০০০ সালের পর বিআরটির সংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩৮৩%।
গ্লোবাল বিআরটি ডেটা নামে একটি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, বিশ্বের ১৯১টি শহরে বিআরটি ব্যবস্থা চালু আছে। এসব বিআরটিতে প্রতিদিন সোয়া তিন কোটি যাত্রী যাতায়াত করে। প্রতিবেশি ভারতে ১৩টি শহরে বিআরটি ব্যবস্থা চালু আছে। দেশটির ২২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এসব বিআরটি ব্যবস্থায় প্রতিদিন যাত্রী পরিবহণ করে প্রায় পাঁচ লাখ। চীনে বিআরটিতে চলে প্রায় ৪৪ লাখ এবং তাইওয়ানে চলাচল করে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ যাত্রী।
এদিকে গাজীপুর-বিমানবন্দর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিল এবং এর অবকাঠামো সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্তটি সঠিক হয়নি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সংগঠনটি বলছে, এ বিষয়ে সরকার সবচেয়ে খারাপ বিকল্পটি বেছে নিয়েছে। সরকার এর মধ্য দিয়ে ১৪ বছর ধরে নির্মাণ কাজের দুর্ভোগ পোহানো গাজীপুর ও উত্তরার বাসিন্দাদের প্রতি সুবিচার করেনি।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান এক বিবৃতিতে সিদ্ধান্তটিকে টেকসই, জ্বালানি সাশ্রয়ী ও সবার ব্যবহার উপযোগী গণপরিবহণের ইতিহাসে ‘কালো দিন’ হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন।
বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, সিদ্ধান্তটি ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারী এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নির্মাণ লবির স্বার্থের পক্ষে গেছে। এটি গাজীপুর ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান এবং ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহণ পরিকল্পনার প্রস্তাবনার পরিপন্থি।

