তাদের সুপরিকল্পিত ছক, ঢাকায় জড়ো করা হয়েছিল ক্যাডার বাহিনী
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম
আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ছবি: এআই দিয়ে পরিমার্জিত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন চলতি বছরের ডিসেম্বরে। আর সেই মাসকে টার্গেট করে দেশে তার দল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলো সুপরিকল্পিত ছক কষছে। তারই ধারাবাহিকতা দেখা গেল রাজধানীতে পোশাক শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপে ‘আপাতত’ সেই ছক ভেস্তে গেছে।
পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের আড়ালে পুরো খাতকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্তের তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাজধানীর মিরপুরে পোশাক শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে পুরো পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করার এক ভয়ংকর চক্রান্তের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গত ৩ নভেম্বর কালশী-পূরবী মোড়ে ‘শিহা ডিজাইন বাংলাদেশ লিমিটেড’ কারখানার সামনে ডিএমপি কনস্টেবল সালমানের ওপর নৃশংস হামলা ও সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার ১৯ আসামির তথ্যের ভিত্তিতে এই ষড়যন্ত্রের রূপরেখা বেরিয়ে আসে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দাবি, এই তাণ্ডব কোনো সাধারণ শ্রমিক অসন্তোষ ছিল না; এর নেপথ্যে বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম মান্নান কচি, সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লা এবং সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপিসহ একটি প্রভাবশালী চক্রের প্রত্যক্ষ ইন্ধন, অর্থায়ন ও অভ্যন্তরীণ আঁতাত ছিল। সিসিটিভি ফুটেজ এবং আসামিদের ব্যবহৃত ১৬টি অ্যানক্রিপ্টেড হোয়াটসঅ্যাপ-মেসেঞ্জার গ্রুপের অডিও বার্তা ফরেনসিক বিশ্লেষণ করে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্যাডার ভাড়া এনে এবং গুজবের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ ও নাশকতা চালিয়ে গার্মেন্ট শিল্পকে ধ্বংসের পাঁয়তারা করেছিল।
ডিবির তদন্তে দেখা যায়, কালশীর ‘শিহা ডিজাইন বাংলাদেশ লিমিটেড’ কারখানাটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচির মালিকানায় ছিল। পরে তিনি কাগজে-কলমে সরে দাঁড়ালেও কারখানাটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় পাঁচ সদস্যের একটি সিন্ডিকেটের হাতে। এই সিন্ডিকেটে রয়েছেন সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম ও আবু হাসান মুহম্মদ তারিক। এছাড়া রয়েছেন আতিকুল ইসলামের শ্যালক নুরুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ও মুশতাক আহমেদ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবির প্রধান শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা কচি, সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লা, তার ভাগিনা আলিফ মোল্লা, সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপি, মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের প্রচার সম্পাদক আক্তার রনি এবং ১০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলরসহ বেশ কয়েকজন এই আন্দোলনে অর্থায়ন এবং নেপথ্যে ইন্ধন জুগিয়েছেন। শ্রমিকদের ঢাল বানিয়ে পুরো তৈরি পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করার সুপরিকল্পিত ছক ছিল এটি। ডিবির এই কর্মকর্তা জানান, গ্রেফতারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই সহিংসতার নেপথ্যে থাকা শীর্ষ পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আসামিদের মোবাইল ফোন জব্দ করে অন্তত ১৬টি গোপন হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জার গ্রুপের সন্ধান পেয়েছে। ‘চেতনা মুক্তিযুদ্ধ’, ‘শেখ হাসিনা রিজার্ভ ফোর্স’, ‘ঢাকা জেলা গেরিলা ৭১’, ‘হাসু আপার বাংলা’, ‘শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন’ ও ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ গেরিলা’-র মতো নানা নামে খোলা এসব গ্রুপে ছদ্মবেশে নাশকতার পরিকল্পনা আদান-প্রদান করা হতো। আলামত নিশ্চিহ্ন করতে বেশকিছু বার্তা ডিলিট করা হলেও ডিবির ফরেনসিক টিম অডিও ও ছবি উদ্ধার করেছে।
তদন্তে জানা যায়, মিছিলে অংশ নেওয়া ও গাড়িতে আগুন দেওয়ার ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালে তা দেখে সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লার ভাগিনা আলিফ মোল্লা ও জুয়েল মোল্লা অর্থ পাঠাতেন। ১ নভেম্বর পল্লবীতে পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়ে সেই ভিডিও ধারণ করে শীর্ষ নেতাদের কাছে পাঠান কক্সবাজারের যুবলীগ নেতা মুয়াজ্জেম শাহরিয়ার নেওয়াজ।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা আরও জানান, পোশাক খাতের স্বাভাবিক দাবি-দাওয়াকে পুঁজি করতে পঞ্চগড়, কক্সবাজার ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ক্যাডার এনে ঢাকায় জড়ো করা হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, পঞ্চগড় কলেজ ছাত্রলীগের নেতা নাহিদ হাসানও মাঠে সক্রিয় ছিলেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতা আকতার রনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেন যে, গাজীপুরে দুজন পোশাক শ্রমিকের লাশ পাওয়া গেছে। এই ভুয়া খবর ও গুজব দ্রুত ছড়িয়ে দিয়ে হাজার হাজার সাধারণ শ্রমিককে উত্তেজিত করে রাস্তায় নামানো হয়।
গত ৩ নভেম্বর কালশী মোড়ে ডিএমপি কনস্টেবল সালমানকে ঘিরে ধরে বেধড়ক ও নৃশংস মারধর করা হয়। বিভিন্ন স্থানের ৪-৫টি ভিন্ন অ্যাঙ্গেলের সিসিটিভি ফুটেজ নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে এই হামলায় সরাসরি জড়িত ৮ জনকে গ্রেফতার করেছে ডিবি। তারা হলেন আশিক জুলহাস, আরাফাত ইসলাম জিসান, মো. রশিদ আলী, সোহেল রানা, মিলন বাবু, আনারুল ইসলাম, মো. রানা ও মনছুর আলী। এর আগে ১ নভেম্বর গ্রেফতার হওয়া আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১১ নেতাকর্মীকে তিন দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
জানতে চাইলে ডিবির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা আলিফ মোল্লা ও জুয়েল মোল্লার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। তাদের হোয়াটসঅ্যাপ ঘেঁটে অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রেফতারকৃত নাশকতাকারীরা মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভয়েস মেসেজভিত্তিক অ্যাপস ব্যবহার করত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আসা অডিও বার্তায় দেখা যায়, নাশকতাকারীদের দূর থেকে টেলিফোনে নির্দেশ দিয়ে নির্দিষ্ট পয়েন্টে জড়ো করা হতো। একটি অডিও বার্তায় গ্রেফতার হওয়া নাহিদকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনারা সবাই ১২ নম্বর ইলিয়াস মোল্লার মার্কেটের সামনে আসেন... এখানে পুলিশ একদিকে চলে গেছে, আমাদের সুযোগ নিতে হবে... আজকের দিনটা করতে পারলে আমাদের নাম হবে।’
