ভুল পরিচয়ে গ্রেফতার
নিরপরাধ কারাবন্দি আলমাসকে মুক্তির নির্দেশ হাইকোর্টের
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম
মো. আলমাস।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দুই যুগ আগের একটি অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত মো. আলমাছের পরিবর্তে গ্রেফতার হয়ে এক বছর ধরে কারাগারে থাকা নিরপরাধ মো. আলমাসকে তাৎক্ষণিক মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রোববার এ আদেশ দেন।
নামের মিলের কারণে প্রকৃত অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিবর্তে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে উচ্চ আদালতে রিট করেন কারাগারে থাকা আলমাস।
রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুল জারি করে কারাগারে থাকা আলমাস এবং দণ্ডিত ব্যক্তির পরিচয়সহ বিস্তারিত তথ্য যাচাইয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন।
আদেশে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে তাঁর তত্ত্বাবধানে একজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে অনুসন্ধান (তদন্ত) পরিচালনা করতে বলা হয়। আদেশ পাওয়ার তারিখ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর ধারাবাহিকতায় প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা আলমাস এ মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। প্রকৃত আসামি আলমাছ বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন।
আগের ধারাবাহিকতায় রিটটি আজ আদালতের কার্যতালিকায় আদেশের জন্য ওঠে। আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. তানভীর আহমেদ ও আবদুল্লাহ আবু সাঈদ। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শিহাব উদ্দিন খান ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মহিউদ্দীন মো. হানিফ।
অনুসন্ধান প্রতিবেদনে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেফতারের পেছনে তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো দুই ব্যক্তির গ্রামের নামের সাদৃশ্য, বাবার নামের মিল এবং ২০০২ সালের মামলার নথিতে লেখা ঠিকানার ভুল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের আদি গ্রাম ঢাকার দোহার উপজেলার নয়াবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব ধোয়াইর। অন্যদিকে, গ্রেফতার হওয়া আলমাসের পরিবারের আদি গ্রাম একই উপজেলার দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন বাহ্রা। ২০০৭ সালের আগে তারা সেখানে বসবাস করতেন। নদীভাঙনের কারণে ওই বছর তাঁদের পরিবার সুন্দরীপাড়ায় চলে যায়।
দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীনে পূর্ব ধোয়াইরসহ একাধিক গ্রাম রয়েছে। ডাকঘরের নাম ব্যবহার করে ঠিকানা দেওয়ার প্রচলনের কারণে দুই ব্যক্তির ঠিকানায় বিভ্রান্তি তৈরি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, ২০০২ সালের অস্ত্র মামলার এজাহার ও এফআইআরে আসামি আলমাছের ঠিকানা ছিল পূর্ব ধোয়াইর। তবে তাকে আদালতে পাঠানোর ফরওয়ার্ডিংয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই এস এম মোস্তাক হোসেন ঠিকানা লেখেন ‘দক্ষিণ বাররা’।
রায়ের পর ২০০৪ সালের ৬ অক্টোবর জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানাতেও একই ভুল ঠিকানা বহাল থাকে। প্রতিবেদনে এটিকে তদন্ত কর্মকর্তার ‘অসতর্কতা’ এবং ‘বিভ্রান্তির বীজ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ২০০২ সালের ১৪ আগস্টের ওকালতনামা এবং ২০০৩ সালের ২০ এপ্রিলের হাইকোর্টের জামিন আদেশে আসামির ঠিকানা পূর্ব ধোয়াইর উল্লেখ করা হয়েছে। এসব নথির সঙ্গে পরবর্তী সময়ে লেখা ঠিকানার পার্থক্য অনুসন্ধান প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের বাবার নাম বিভিন্ন নথিতে মো. খলিলুর রহমান, খলিল আহমেদ ও আবুল খায়ের (খলিল) পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, গ্রেফতার হওয়া আলমাসের বাবার নাম শেখ খলিল। বাবার নামের এই সাদৃশ্যও পরিচয় শনাক্তে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আলমাসের রিট আবেদনে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেফতার ও কারাগারে রাখার ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত, তাকে আদালতে হাজির করা, তাৎক্ষণিক মুক্তি এবং পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে।
তবে অনুসন্ধান প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা বা অন্য কারও বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ কিংবা নির্দিষ্ট কারও দায় নির্ধারণ করা হয়নি। পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের আবেদনসহ রিট মামলার রুল এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

