বিএনপি ভুল করলে পথ হারাবে বাংলাদেশ
Advertisement
সাইদুর রহমান
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:২০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ পরিবর্তন হয়েছে। দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। বলা যেতে পারে, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াতের। কিন্তু এই মুহূর্তে বিএনপির মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে- দলের ভেতরেই কে বিএনপি, কে জামায়াত তা নির্ণয় করা।
২০১৪ সালের পর থেকে জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে অনুপস্থিত থাকার কারণে বিএনপির রাজনীতিতে মিশে যায় বড় একটি অংশ। অন্যদিকে নতুন কর্মীদের আওয়ামী এবং ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করানো হয়। আর বড় একটি অংশ নিজেদের রাজনীতি থেকে গুটিয়ে রাখেন। যারা চিহ্নিত ছিলেন, তারা লুকিয়ে গোপনে রাজনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখেন।
বিএনপি-জামায়াতসহ মুক্তিকামী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বিতাড়িত হয় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। তবে ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি বড় আদর্শিক সংকটে পড়েছে। বিএনপির রাজনীতির আদর্শ রপ্ত করে জামায়াত দলটির আদর্শের একটি অংশের মালিকানা দাবি করে বসেছে। সেই মালিকানা হলো মুসলিম জাতীয়তাবাদ। যেটি বিএনপির রাজনীতির অর্ধেক দর্শন। এমনকি ভারত বিরোধিতার রাজনীতিও ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে।
বিএনপির বুদ্ধিবৃত্তিক, সৃজনশীলতা, নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে অগোচরেই কিছু কিছু জায়গায় জামায়াতের বিচরণ ঘটেছে। বিএনপির নামে বিভিন্ন সেক্টরে জামায়াত প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। যেমনটি আগেই হয়েছে আওয়ামী লীগে। জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশলের কাছে সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগ আগেই পরাজিত হয়েছে। বিএনপি এখন উপলব্ধি করা শুরু করেছে। তবে আওয়ামী লীগে যেমন ভারতীয়রা প্রভাব বিস্তার করত, ঠিক উলটো বিএনপির ভেতরেই প্রবেশ করা শুরু করেছে।
আরও একটি উদ্বেগজনক তথ্য হলো- সোশ্যাল মিডিয়ায় যে বট আইডির কথা শোনা যায় সেটি কিন্তু পরিচালিত হয় ভারত থেকে। বাংলাদেশে বট আইডির ৮০ শতাংশ ভারত থেকে পরিচালিত, বাকিগুলো উত্তর কোরিয়া এবং তুরস্ক থেকে। এই বট আইডি পরিচালনার জন্য প্রতি মাসে খরচ করা হয় ৮ কোটির ওপরে টাকা। এই বট আইডিগুলো ব্যবহার করা হয় বিএনপির বিরুদ্ধেই। পরিকল্পিতভাবে জাতীয়তাবাদীপন্থিদের চরিত্র হরণে এই আইডিগুলো ব্যবহৃত হয়।।
জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূল সমস্যা হলো- ‘কেউ হঠাৎ করে এসে দলের গুণগান গাইলেই বিএনপি হওয়া যায়।’ দলের লোক তাকে নিয়ে মাতামাতি শুরু করেন; কিন্তু তারা কখনই দলীয় আদর্শিক রাজনীতিতে মনোযোগী হয়নি। বরং ব্যক্তিগত সম্পর্ককে দলীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। কোনো বামপন্থি বা ইসলামপন্থি মতাদর্শের মানুষকে হঠাৎ করে নিজের মনে করা বিএনপির মূল সমস্যা। চীনের মাও সে-তুং বলে গেছেন- ‘আদর্শ ছাড়া রাজনীতি অন্ধ, আর অর্থনীতি ছাড়া রাজনীতি পঙ্গু।’ জামায়াতে ইসলামী অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক ফোর্স হিসেবে রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী। তেমনি আওয়ামী লীগও। ইচ্ছা করলেও আপনি জামায়াত বা আওয়ামী লীগ হতে পারবেন না, কিন্তু আপনি ইচ্ছে করলেই বিএনপি হতে পারবেন। কারণ বিএনপি কখনই কাউকে কোনো দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শৈশবকাল, পারিবারিক রাজনৈতিক দর্শন, শিক্ষাজীবন, সর্বশেষ সোশ্যাল মিডিয়ার কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক তৎপরতা বা রাজনৈতিক আদর্শকে আমলে নেয় না।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কিংবা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নামে গুণগান গাইলেই বিএনপি হয়ে যাওয়ার গতানুগতিক রাজনীতি পরিহার করতে হবে। বিএনপিকে আদর্শিক ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কে আওয়ামী লীগ, কে বাম বা কে জামায়াত তা নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হলে বিএনপি চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ঝুঁকির মুখে পড়বে। ইসলামের নামে নব্য আরেকটি ফ্যাসিবাদ কায়েমের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকবে। বিএনপি ভুল করলেই বাংলাদেশ পথ হারাবে- সবার আগে এ কথাটি মনে রাখতে হবে বিএনপিকেই।
দেশীর রাজনৈতিক কৌশলের পাশাপাশি কূটনৈতিক অঙ্গনেও বিএনপিকে এগিয়ে যেতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া এবং পাকিস্তানের গভীর দৃষ্টি বাংলাদেশের দিকে। শক্তিশালী দেশগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানো শুরু করেছে। নানান কৌশলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেশগুলো তাদের অপরিহার্য করে তুলেছে। বিভিন্ন মাধ্যমে রাজনৈতিক বিনিয়োগের কথাও শোনা যায়। এখানেও ভেবে চিন্তে বিএনপিকে পা ফেলতে হবে। বাংলাদেশের প্রশ্নে কোনো ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না।
জামায়াত আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ একটি রাজনৈতিক দল। যাদের হাতে আছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ, কোচিং সেন্টার থেকে শুরু করে সবকিছুই। ভারতে প্রতিষ্ঠিত জামায়াতের রাজনৈতিক কার্যক্রম পৃথিবীর চারটি দেশে দৃশ্যমান রয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তানের মধ্যে একমাত্র আফগানিস্তানে নব্বই দশকে একবার ক্ষমতায় যেতে পেরেছিল। পরবর্তী ইতিহাস যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান। জনকল্যাণ এবং বাস্তবমুখী রাজনীতির অনুপস্থিতির কারণে জামায়াত কখনই কোনো দেশেই রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। কিন্তু বাংলাদেশে জামায়াত তাদের রাজনীতির কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। সেটির প্রতিফলন প্রতিনিয়ত তাদের কার্যক্রমে পাওয়া যাচ্ছে।
রাজনৈতিক দলের মধ্যেই বিএনপি আর্থিকভাবে খুবই দুর্বল। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত এই দলটির বড় বড় ধনী নেতাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থাকলেও দলের নামে কিছুই নাই। বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গায় এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। জেনারেশন-জেড প্রজন্মকে এখনো পুরোপুরি আকৃষ্ট করতে পারেনি বিএনপি। নেতাদের ব্যক্তিগত তদবির দলীয়ভাবে চালিয়ে দেওয়ার রাজনীতি দলগতভাবে বিএনপকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বিএনপিকে আরও সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে। এখন থেকেই আগামীর ভাবনার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। আলফা প্রজন্মকে টার্গেট করে মাস্টারপ্ল্যান করতে হবে। দলকে করতে হবে আরও গণমুখী। আওয়ামী লীগকে বিগত সময়ে বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে হয়তো দেখা হতো। ইতোমধ্যেই আওয়ামী লীগের শূন্যস্থান দখল করেছে জামায়াতে ইসলামী। এখন বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের সঙ্গে বড় একটি অংশ জামায়াতে ইসলামী। সেটি মেনেই বিএনপিকে সামনে অগ্রসর হতে হবে। প্রতিপক্ষ হিসেবে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে এক ধরনের এবং জামায়াতের ক্ষেত্রে আরেক ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
বিএনপির ক্ষেত্রে বড় সুবিধা বিএনপিই স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক দল। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বা জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে। ফলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারক বা বাহকের একমাত্র দাবিদার বিএনপিই। গতানুগতিক আধিপাত্য বা কর্তৃব্যবাদী রাজনীতি থেকে বিএনপির বেরিয়ে আসতে হবে। একাডেমিক স্টাইলে রাজনৈতিক চর্চা শুরু করতে হবে। কর্মীদের হতে হবে ভদ্র এবং বিনয়ী। ত্যাগীদের মূল্যায়ন করতে হবে। দলে ও একে-অপরের মধ্যে থাকা বিভক্তি অনিবার্যভাবে পরিহার করতে হবে।
সামনের দিনগুলোয় পুরাতন ধারার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বিএনপিকে নতুন ধারার রাজনীতি করতে হবে। জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ধ্বংস করতে পারলে বাংলাদেশের সক্রিয়তা ধ্বংস করা যাবে। অতএব সবাইকে বুঝতে হবে- বিএনপি টিকলে বাংলাদেশ টিকবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট টিকে থাকবে।
লেখক: সাইদুর রহমান, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
