Logo
Logo
×

Advertisement

রাজনীতি

এনসিপিতে বড় ভাঙন, ১৪ কেন্দ্রীয় নেতার পদত্যাগ

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম

এনসিপিতে বড় ভাঙন, ১৪ কেন্দ্রীয় নেতার পদত্যাগ

Advertisement

রাজনৈতিকভাবে বেশ চাপের মধ্যে পড়েছে নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। প্রথম ঘটনাটি ঘটে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ঐক্য গঠনের মধ্য দিয়ে। ওই ঘটনার সূত্র ধরে এনসিপির কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতারা পদত্যাগ শুরু করেন। বর্তমানে এ পদত্যাগের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে গেছে-কেন্দ্রীয়সহ সারা দেশের এনসিপির পরিচিত মুখগুলোর প্রায় অধিকাংশ নেতাই পদত্যাগ করেছেন। 

এছাড়া দলের প্রধান নাহিদ ইসলামের হলফনামায় দেখানো আয় নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এনসিপি থেকে শীর্ষ নেতাদের চলে যাওয়া কিংবা পদত্যাগ, দলটির জন্য বিরাট ক্ষতি। যেসব শীর্ষ নেতা দলে রয়েছেন, তারাও কেন ব্যর্থ হচ্ছেন দল থেকে পদত্যাগকারীদের ঠেকাতে।

এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়াও জুলাই অভ্যুত্থানে সম্পৃক্ত যোদ্ধা, শহীদ পরিবার ও আহতদের অনেকেই বলছেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় যাওয়ার পর থেকেই একের পর এক কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরের শীর্ষ নেতারা পদত্যাগ করছেন। আবার দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই দলের এমন সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচনি কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। জামায়াতের সঙ্গে জোট করাকে চরম আদর্শবিরোধী ও রাজনৈতিকভাবে ‘আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’ হিসাবে দেখছেন দলের একাংশ, যারা একের পর এক পদত্যাগ করছেন। অপরদিকে দলে থাকা শীর্ষ নেতাদের অনেকেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন।

বৃহস্পতিবার রাতে একরাশ ক্ষোভ ও অভিমান নিয়ে এনসিপির সব ধরনের পদ-পদবি থেকে পদত্যাগ করেন দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, মুখপাত্র, যুগ্ম সদস্য সচিব ও মিডিয়া সেলের প্রধান মুশফিক উস সালেহীন। পলিসি অ্যান্ড রিসার্চ উইংয়ের কো-লিড হিসাবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। একই দিন পদত্যাগ করেন দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন।

এদিকে শুক্রবার বেশ কয়েকজন এনসিপি নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, দল থেকে পদত্যাগের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আরও যারা পদত্যাগ করবেন, তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করছেন। ইতোমধ্যে পদত্যাগ করা শীর্ষ নেতাদের অনেকেই বলেছেন, যে দলটি জুলাই অভ্যুত্থান তথা ছাত্র-জনতার শহীদি রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত হলো, সেই দলটি জুলাই যোদ্ধা তথা সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভাঁওতাবাজি করছে।

অপরদিকে, ১ জানুয়ারি রাতেই পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ। তিনি দলটির পলিসি ও রিসার্চ উইংয়ের প্রধানের দায়িত্বেও ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়াশোনা শেষে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর করেছেন। এনসিপি গঠনের পর থেকেই তিনি দলটির পলিসি ও রিসার্চবিষয়ক যাবতীয় কাজ করে আসছিলেন। খালেদ সাইফুল্লাহ ডা. তাসনিম জারার স্বামী। ডা. তাসনিম জারাও ২৮ ডিসেম্বর এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ঢাকা-৯ সংসদীয় আসনে এনসিপির মনোনীত প্রার্থীও ছিলেন তিনি। এনসিপি থেকে পদত্যাগের পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে ঢাকা-৯ আসনে নির্বাচন করছেন তিনি।

এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও মিডিয়া সেলের প্রধানের পদ থেকে সদ্য পদত্যাগ করা মুশফিক উস সালেহীন যুগান্তরকে বলেন, ভেতরে মতবিরোধ চরমে পৌঁছেছে এবং তা প্রকাশ্যে বিভক্তির রূপ নিচ্ছে। মূলত জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি আসন সমঝোতা এবং জোটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই এনসিপির ভেতরে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে। আসলে এনসিপি যে উদ্দেশ্য-আদর্শ নিয়ে গঠিত হয়েছিল, সেই জায়গায় দলটি এখন নেই। এনসিপি এখন যা করল, তা মূলত পুরোনো বন্দোবস্তের যে দলগুলো রয়েছে তাদের সঙ্গেই এক ধরনের আপস করল। এই আপসের ফলে যেটা হলো, নতুন ধারার রাজনীতি, নতুন বন্দোবস্তের যে রাজনীতি করার সম্ভাবনা ছিল তা আর এনসিপিতে রইল না। এনসিপি আসলে পুরোনো বন্দোবস্তের রাজনীতিতেই ঢুকে পড়ল। নতুন ধারার রাজনীতি নির্মাণের ক্ষেত্রে এনসিপি কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে।

জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক দল এনসিপি গঠিত হয়েছে। শহীদ পরিবার তথা আহতদের প্রত্যাশা ছিল এ দলটির ওপর। এখনো আছে, কিন্তু দলটির ভেতর যে হারে সংকট, অসন্তোষ দানা বাঁধছে তাতে আমরা আশাহত হচ্ছি। পরিচিত মুখগুলো দল থেকে পদত্যাগ করছে। যে মুখগুলো জুলাই আন্দোলন-সংগ্রামে সাহসী প্রদীপ হিসাবে জ্বলেছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহীদ পরিবারের আরেক সদস্য বলেন, এনসিপিতে এমন ভাঙন-পদত্যাগ আমাদের চাওয়া-পাওয়াকেও অনিশ্চিত করে তুলছে। সরকার ইতঃপূর্বে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলোর অধিকাংশ বাস্তবায়ন করেনি। জুলাইয়ের পক্ষের রাজনৈতিক দল হিসাবে পরিচিত এনসিপি থেকেও আমরা সহযোগিতার আশ্বাস পাচ্ছি না। দলটির জৌলুস দিন দিন তলানিতে ঠেকছে।

এনসিপির একাধিক নেতার অভিযোগ, জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দলটির ‘বিশেষ’ দুই ব্যক্তির কথাই সবচেয়ে বড় ছিল। ওই দুই শীর্ষ নেতা কেন্দ্রীয় অধিকাংশ নেতাদের উপেক্ষা করেই সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছেন। ফলে অনেকেই নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। শুক্রবার দলটির শীর্ষস্থানীয় এক নেত্রী যুগান্তরকে বলেন, ‘পদত্যাগ না করলেও ইতোমধ্যে দলের সব ধরনের কার্যক্রম থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি। দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা করজোড়ে বলেছেন, আমি যেন অন্তত পদত্যাগ না করি। আমি পদত্যাগ করলেই দলের কেন্দ্রীয়, বিভাগীয় ও বিভিন্ন জেলায় এনসিপির নেতৃত্বে থাকা নেত্রীদের অধিকাংশই একযোগে পদত্যাগ করবেন।’

এদিকে এনসিপি থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৪ জন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেছেন। আবার অনেকে পদত্যাগ না করলেও দল থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন আসনে ঘোষিত কিংবা সম্ভাব্য একাধিক প্রার্থীও পদত্যাগের ঘোষণা দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে পদত্যাগ করা কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে রয়েছেন-তাসনিম জারা, তাজনূভা জাবীন, ফারহাদ আলম ভূঁইয়া, আরিফ সোহেল, আজাদ খান ভাসানী, আসিফ নেহাল, মীর হাবিব আল মানজুর, মারজুক আহমেদ, মীর আরশাদুল হক, খালেদ সাইফুল্লাহ, খান মো. মুরসালীন, মুশফিক উস সালেহীন, ওয়াহিদুজ্জামান ও আল আমিন টুটুল।

ডা. তাসনিম জারা ও তাজনূভা জাবীনের পদত্যাগের বিষয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ২৮ ডিসেম্বর দলীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘কেউ দলে থাকবে কিনা বা নির্বাচন করবে কিনা, সেটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।’ নাহিদ ইসলামের এমন বক্তব্যের পর এনসিপি থেকে আরও প্রায় ১০ জন পদত্যাগ করেছেন। এর আগে গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক মেজর (অব.) আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ও কেন্দ্রীয় সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন পদত্যাগের ঘোষণা দেন। পদত্যাগের কারণ হিসাবে তাদের বক্তব্য ছিল, এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বের কিছু সদস্য নিয়মিতভাবে সেনাবাহিনী ও প্রাক্তন সেনা সদস্যদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্য করেন এবং শত্রুভাবাপন্ন অবস্থান নেন। তারা এ বিষয়ে একাধিকবার নেতৃত্বকে অবহিত করলেও কোনো সংশোধনীমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, নতুন গড়ে উঠা এনসিপিতে ভাঙন কিংবা শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগ নিঃসন্দেহে বড় ধরনের ক্ষতি। তবে এনসিপি থেকে বলা হচ্ছে, জামায়াতের সঙ্গে জোট শুধু নির্বাচনি বিষয়। আদর্শিক কিংবা বিশ্বাসের নয়। নিশ্চয়, এমন বক্তব্যের প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারছেন না পদত্যাগকারীরা। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, দলটির নেত্রীরা জামায়াতে ইসলামীর প্রতি একেবারেই বিশ্বাসী নন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারী শক্তি ছিল সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো। জোট ইস্যুকে নিয়ে এনসিপির নারী নেতৃত্বে থাকা একটি বড় শক্তি সরে পড়ছেন। দলটি থেকে ভাঙন সৃষ্টি হবে না, শীর্ষ নেতারা পদত্যাগও করবে না-এমনটাও নিশ্চিত করতে হবে দলে থাকা শীর্ষ নেতাদের। নতুবা দল শক্তিহীন হয়ে পড়বে।

Advertisement

Advertisement

ঘটনাপ্রবাহ: ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন


আরও পড়ুন

সম্পর্কিত খবর

বোমা বিস্ফোরণে ঝলসে গেলেন জামায়াত নেতা

বোমা বিস্ফোরণে ঝলসে গেলেন জামায়াত নেতা

আন্দোলনে ফ্যাসিস্টরা অনুপ্রবেশ করলে দায় সরকারের: নাহিদ ইসলাম

আন্দোলনে ফ্যাসিস্টরা অনুপ্রবেশ করলে দায় সরকারের: নাহিদ ইসলাম

শ্রমিক আন্দোলনে আওয়ামী অপতৎপরতার দায় জামায়াত আমিরের: রাশেদ খান

শ্রমিক আন্দোলনে আওয়ামী অপতৎপরতার দায় জামায়াত আমিরের: রাশেদ খান

জামায়াতের বিবৃতি বিভ্রান্তিমূলক, নারীদের অন্তর্ভুক্তিতে শুভঙ্করের ফাঁকি: টিআইবি

জামায়াতের বিবৃতি বিভ্রান্তিমূলক, নারীদের অন্তর্ভুক্তিতে শুভঙ্করের ফাঁকি: টিআইবি

জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে এনসিপি

জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে এনসিপি

আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল: জামায়াত নেতার পদ স্থগিত

আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল: জামায়াত নেতার পদ স্থগিত

আরও পড়ুন

সরকারের প্ল্যান শুধু দফায় দফায় সবকিছুর দাম বাড়ানো: মঞ্জু

সরকারের প্ল্যান শুধু দফায় দফায় সবকিছুর দাম বাড়ানো: মঞ্জু

আন্দোলনে ফ্যাসিস্টরা অনুপ্রবেশ করলে দায় সরকারের: নাহিদ ইসলাম

আন্দোলনে ফ্যাসিস্টরা অনুপ্রবেশ করলে দায় সরকারের: নাহিদ ইসলাম

শ্রমিক অসন্তোষ ঘিরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিকারীদের রুখে দেওয়ার ডাক

শ্রমিক অসন্তোষ ঘিরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিকারীদের রুখে দেওয়ার ডাক

শ্রমিক আন্দোলনে আওয়ামী অপতৎপরতার দায় জামায়াত আমিরের: রাশেদ খান

শ্রমিক আন্দোলনে আওয়ামী অপতৎপরতার দায় জামায়াত আমিরের: রাশেদ খান

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম