বার্ন ইউনিটে আহতরা ট্রমায় ভুগছেন
শাহরীন ও শাহিনের একাধিক অপারেশন লাগবে
Advertisement
যুগান্তর রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০১৮, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় আহতরা বিষম ট্রমায় ভুগছেন। বারবার আঁতকে উঠছেন তারা। আপনজন কিংবা চিকিৎসকদের প্রতিও বিশ্বাসী হতে পারছেন না। এদিকে রোববার নেপাল থেকে আসা আহত শাহিন বেপারীকেও বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে।
বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে বার্ন ইউনিটের ৬ষ্ঠ তলার কেবিন-২ এ ভর্তি করা হয় শাহিন বেপারীকে। এরপর বার্ন ইউনিটের সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেনের নেতৃত্বে চিকিৎসকরা প্রায় ঘণ্টাব্যাপী তাকে দেখেন। পরে ডা. সামন্ত লাল সেন সাংবাদিকদের জানান, বিমান দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ৬ জনকে দেশে ফিরিয়ে এনে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। রোববার আনা হয়েছে শাহিন বেপারীকে। তার শরীরের প্রায় ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ পুড়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে ক্ষতও রয়েছে। শাহিন কিংবা বাকি ৫ জনের মধ্যে কাউকেই আমরা শঙ্কামুক্ত বলছি না। মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা তাদের যথাযথ চিকিৎসা প্রদান করছেন। প্রধানমন্ত্রী এসব রোগীর খোঁজখবর নিচ্ছেন। বিকাল পৌনে ৬টার দিকে কেবিনে থাকা শাহিন বেপারীকে এই প্রতিবেদক সালাম জানালে, তিনি উত্তর
দেন। আশা করি আপনি ভালো হয়ে উঠবেন- বলতেই তিনি বলেন, আপনারা দোয়া করেন, আমি দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই।
এ সময় তার স্ত্রী রিমা যুগান্তরকে বলেন, আমার স্বামী বেঁচে আছেন, এ জন্য আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া। তার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে, তারপরও তিনি দোয়া চেয়েছেন। মাথা, পিঠ, গলা, বুকে ব্যান্ডেজ। পা দুটি অনেক ফোলা, মুখটিও ফুলে আছে। বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন রিমা।
রিমা জানান, শাহিনের দুর্ঘটনার বিষয়ে তাদের ১১ বছরের মেয়ে সূচনা সব জেনেছে। তার বাবার জন্য ১২ মার্চ থেকেই শুধু কান্না করছে। এখন তার শরীরে অনেক জ্বর। বৃদ্ধ বাবা শাহজাহান বেপারী ছেলের এমন অবস্থা দেখে শুধুই কাঁদছিলেন। তাকে কেউই সান্ত্বনা দিতে পারছিলেন না। একবার কেবিনের ভেতর প্রবেশ করেন, আবার বের হন। ছেলের সামনে কাঁদতে না পেরে বারান্দায় এসে কান্না করছিলেন। শাহজাহান বেপারী জানান, তার ছেলে ব্যবসা করেন। তারা ২ ভাই, ৪ বোন। শাহিন তৃতীয়।
এদিকে আহত কামরুন নাহার স্বর্ণার রোববার বেশ কয়েকটি এক্সরে করা হয়েছে। বেলা আড়াইটার দিকে এ পরীক্ষাগুলো করা হয়। আহত শাহরীন আহমেদের পোড়াস্থান শুকিয়ে উঠছে। রোববার দুপুরে তার ব্যান্ডেজ খুলে পুনরায় ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। অপরদিকে আনমুন নাহার অ্যানি তার সন্তান ও স্বামীর জন্য বিলাপ করছেন। দুপুরে নামাজে বসে প্রিয় স্বামী ও সন্তানের জন্য দোয়া করেন তিনি।
ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের পরিচালক প্রফেসর ডা. আবুল কালাম যুগান্তরকে জানান, আহতদের মধ্যে শাহরীন ও নতুন আসা শাহিন বেপারীর একাধিক অপারেশন লাগবে। তাদের মানসিক অবস্থা আরেকটু স্থিতিশীল হলেই অপারেশন করা হবে।
ঢামেক হাসপাতালের মানসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর আবদুল্লাহ আল মামুন যুগান্তরকে জানান, বার্ন ইউনিটে ভর্তি আহত ৬ জনের মধ্যেই বিষম ট্রমা কাজ করছে। তারা ভয় পাচ্ছেন। কোনো কিছুতে বিশ্বাসী হতে পারছেন না। বিশেষ করে আনমুন নাহার অ্যানি, বিষমভাবে ভেঙে পড়ছেন।
বিপদ আমায় ছাড়ছে না : নিহত শিশু তামারা প্রিয়ম্ময়ীর ছবি আর ভিডিও দেখে দেখে কান্না করছিলেন তার নানা সালাহ উদ্দিন। বললেন, বিপদ আমায় ছাড়ছে না। তিনি জানান, ২০১৭ সালের ২৮ আগস্ট তার একমাত্র ছেলে মেহবুব হোসেন অপি (১৭) পানিতে পড়ে মারা যান। ছেলের শোকে তিনিসহ তার স্ত্রী নাজমা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার ওপর বিমান দুর্ঘটনায় আমাদের প্রাণের টুকরো তামারা প্রিয়ম্ময়ী ও তার বাবা ফারুক আহমেদ প্রিয়ক তাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেছে। তিনি বলেন, তারা যে দিন নেপালে যাবেন তার একদিন আগে নাতনির জন্য এক ছড়ি কলা ও সাড়ে ৫ কেজি গরুর দুধ নিয়ে আমি তাদের বাসায় যাই। সারাদিন নাতনির সঙ্গে খেলা করেছি। আড়াই বছরের নাতনি ২০টি ইংরেজি কবিতা মুখস্থ বলতে পারত। শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নাম ইংরেজিতে বলতে পারত। ও আমায় বলেছিল, নানাভাই আমি তোমার জন্য অনেক মজা নিয়ে আসব। এমনটা বলতে বলতে আমাকে চুমু খেত। এসব বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
