২৫ জাতের ধান উদ্ভাবন সেন্টু হাজংয়ের
স্বীকৃতি না পেলে কী আসে-যায়!
Advertisement
রফিক মজিদ, শেরপুর
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নেই কোনো আধুনিক গবেষণাগার, উন্নত যন্ত্রপাতি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণারও নেই সুযোগ। তবু নিজের সীমিত সামর্থ্য ও অদম্য আগ্রহকে পুঁজি করে ২১ বছর ধরে ধানের নতুন জাত উদ্ভাবন ও দেশি ধান সংরক্ষণে কাজ করে যাচ্ছেন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার কৃষক সেন্টু চন্দ্র হাজং। নিজের মাত্র ১২ কাঠা জমিতে ৪৪০টি পরীক্ষামূলক প্লট তৈরি করে এ পর্যন্ত ২৫টি ধানের জাত উদ্ভাবনের দাবি করেছেন তিনি। তার উদ্ভাবিত ধান চাষ করে উপকৃত হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। তবে দীর্ঘদিনের এই উদ্যোগের পরও উদ্ভাবিত জাতগুলোর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও সরকারি বিশেষ সহায়তা মেলেনি। উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের চাটকিয়া গ্রামের বাসিন্দা সেন্টু। তার বয়স ৫৫ বছর। কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠা সেন্টু এসএসসি পাশের পর অর্থাভাবে আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। তবে অদম্য আগ্রহ নিয়ে ধানের জাতের পরীক্ষামূলক গবেষণায় যুক্ত হন তিনি। বর্তমানে নিজের বসতঘরের পাশের জমিতেই চলছে তার গবেষণা।
স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে ২০০৫ সালে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ধানের জাত নিয়ে পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করেন সেন্টু। নতুন জাত উদ্ভাবনে তিনি সংকরায়ণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। একটি জাত উদ্ভাবন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং এর উপযোগিতা যাচাই করতে কখনো সাত থেকে আট বছর লেগে যায়। কোনো পরীক্ষা ব্যর্থ হলেও দমে যান না তিনি। নতুন উদ্যমে শুরু করেন পরবর্তী পরীক্ষা। তার উদ্ভাবিত জাতগুলো সেন্টু-১ থেকে সেন্টু-২৫ পর্যন্ত পরিচিত। এসবের মধ্যে সেন্টু শাইল, পাঁচ ধরনের সেন্টু পাইজাম, তিন ধরনের চিনি শাইল ও তুলশিমালা উল্লেখযোগ্য।
স্থানীয় কৃষক করিম মিয়া বলেন, ‘আমি দেড় একর জমিতে সেন্টু পাইজাম ধান রোপণ করেছি। এ ধানের ফলন ভালো, ভাতও খেতে সুস্বাদু। এ কারণে প্রতিবছরই আমি এই ধান চাষ করি।’
হারিয়ে যেতে বসা দেশি ধানের জাত সংরক্ষণেও কাজ করছেন সেন্টু। তিনি নিজের জমিতে প্রতিবছর বগি, হালই, গোলাপি, মালঞ্চি, ময়নাগিড়ি, মালসিরা, অনামিয়া, পারিজাত, আপচি, কাইশাবিন্নি, মারাক্কাবিন্নি, শংবিন্নি, দুধবিন্নি, বিরই, চাপাল ও খাসিয়াবিন্নিসহ বিভিন্ন দেশি জাতের ধান পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করেন তিনি। বর্তমানে ঢেপা, চাপাল, পুরাবিন্নি ও নেদরাবিন্নিসহ আরও কয়েকটি জাত নিয়ে গবেষণা করছেন। চাষে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে গোবর ও নিজস্বভাবে তৈরি কেঁচো কম্পোস্ট সার ব্যবহার করেন তিনি।
সেন্টু যুগান্তরকে বলেন, ‘দেশি ধানের অনেক জাত হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অথচ এসব ধানের রয়েছে স্বতন্ত্র স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য। আমার গবেষণাগার নেই, আধুনিক যন্ত্রপাতিও নেই। নিজের ভাঙা ঘরে বসেই এসব কাজ করে যাচ্ছি।’ উদ্ভাবিত ধানের বীজের প্রত্যয়ন না পাওয়ায় প্যাকেটজাত করে বাজারে বিক্রি করতে পারছেন না তিনি। সরকারিভাবে একটি গবেষণাগার ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পেলে গবেষণার ফলাফল আরও ভালোভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে সেন্টুর প্রত্যাশা। এ বিষয়ে নালিতাবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বলেন, উপজেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন সম্প্রতি
সরেজমিন সেন্টু হাজংয়ের উদ্ভাবনী কাজ পরিদর্শন করেছেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘আশা করি তিনি (সেন্টু) স্বীকৃতি পাবেন। যতটুকু জেনেছি সেন্টু বাবুর ধান দেশের বিভিন্ন স্থানে চাষাবাদ করা হচ্ছে।’
