স্বপ্ন হারে না, হারে শুধু প্রস্তুতি
Advertisement
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কমনওয়েলথ গেমসে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ কে? অস্ট্রেলিয়া? ইংল্যান্ড? কানাডা? ভারত? স্কোরবোর্ড বলবে, হ্যাঁ।
কিন্তু ট্র্যাক, সুইমিং পুল, বক্সিং রিং কিংবা জিমন্যাস্টিকস হলের ভেতরে দাঁড়ালে অন্য উত্তর শোনা যায়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ কোনো দেশের পতাকা নয়। সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ অসম সুযোগ।
স্কটস্টাউন স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের লুশাদ ইসলামের স্টার্টিং ব্লকের পাশের লেনে দাঁড়িয়ে থাকা স্প্রিন্টারটির সঙ্গে দূরত্ব শুধু কয়েক ইঞ্চি। সেই কয়েক ইঞ্চির পেছনে লুকিয়ে ছিল কয়েক হাজার দিনের ব্যবধান।
একজন ছোটবেলা থেকেই বিশ্বমানের ট্র্যাকে দৌড়েছেন। তার পাশে থেকেছেন স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট, বায়োমেকানিক্স বিশেষজ্ঞ, পুষ্টিবিদ, মনোবিজ্ঞানী, ফিজিও। বছরে দশ-বারোটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা তার কাছে স্বাভাবিক। বাংলাদেশের অ্যাথলেট? সীমিত সরঞ্জাম, অপ্রতুল বাজেট, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অভাব আর অনিশ্চিত প্রস্তুতি নিয়েই তাকে একই বন্দুকের শব্দে দৌড় শুরু করতে হয়।
শুরুর লাইন এক। সেখানে পৌঁছানোর রাস্তা এক নয়। বাংলাদেশের কমনওয়েলথ ইতিহাসে ছয়টি পদক এসেছে। সবই শুটিং থেকে। এই পরিসংখ্যান যেমন গর্বের, তেমনি একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও আছে,অন্য খেলাগুলো কেন পারল না? উত্তরটি প্রতিভার ঘাটতিতে নয়। উত্তরটি প্রস্তুতির ব্যবধানেই লুকিয়ে।
সামিউল ইসলাম রাফি গ্লাসগোয় নিজের ব্যক্তিগত সেরা টাইমিং করেছেন। শিরিন আক্তার মৌসুমের সেরা সময় দৌড়েছেন। লুশাদ ইসলাম নিজের সীমা ভাঙার চেষ্টা করেছেন। জিন্নাত ফেরদৌস শেষ ঘণ্টা পর্যন্ত লড়েছেন। জিমন্যাস্ট শিশির আহমেদ আন্তর্জাতিক মানের মঞ্চে নিজের রুটিন শেষ করেছেন। বক্সার সেলিম কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গেছেন। তাদের লড়াই ছিল প্রতিপক্ষের পাশাপাশি সেই অদৃশ্য ব্যবধানের বিরুদ্ধে, যা চোখে দেখা যায় না।
বিশ্বের বড় বড় দেশের অ্যাথলেটদের কাছে কমনওয়েলথ গেমস আরেকটি প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশের অনেক অ্যাথলেটের কাছে এটি জীবনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। এই পার্থক্যই সবচেয়ে কঠিন।
অর্থও এখানে নীরব প্রতিপক্ষ। বিদেশে প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম, আন্তর্জাতিক এক্সপোজার, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থ। তার চেয়েও বড় বিষয় ধারাবাহিকতা। একজন খেলোয়াড় ভালো ফল করার পরও সেই সাফল্য ধরে রাখার মতো কাঠামো অনেক সময় তৈরি হয় না। কোচ বদলায়, পরিকল্পনা বদলায়, লক্ষ্য বদলায়। মাঝপথেই থেমে যায় অনেক স্বপ্ন।
তবু বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদেরা হার মানেন না। তাদের প্রতিটি ব্যক্তিগত সেরা টাইমিং, প্রতিটি সাহসী লড়াই, শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা দেশের সম্ভাবনার সাক্ষ্য। আতিকুর রহমান ও আবদুস সাত্তার নিনি, আসিফ হোসেন খান, আবদুল্লাহ হেল বাকিরা দেখিয়েছেন সুযোগ পেলে বাংলাদেশও জিততে পারে। সমস্যা প্রতিভায় নয়, সেই প্রতিভাকে বিশ্বমানের পথে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থায়।
যেদিন বাংলাদেশের একজন অ্যাথলেটও একই মানের ট্র্যাক, বৈজ্ঞানিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আর পরিকল্পনা নিয়ে কমনওয়েলথ গেমসের স্টার্ট লাইনে দাঁড়াবেন, সেদিন হয়তো স্কোরবোর্ডের ইতিহাস বদলাবে ।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ কোনো দেশ নয়। সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ অপূর্ণ প্রস্তুতি। সবচেয়ে বড় শক্তি,সব সীমাবদ্ধতার পরও দেশের পতাকা বুকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার সাহস।

