লন্ডনে বসে ঢাকার মাঠের জন্য কাঁদেন বড় বাদল
Advertisement
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৩:২৫ পিএম
সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একটা সময় ছিল, ঢাকার ফুটবল মানেই ছিল তারকা। মাঠে নামার আগেই গ্যালারিতে উত্তেজনা। কোন দলের ১০ নম্বর কে, কোন স্ট্রাইকার বল পেলেই গোলের গন্ধ পাওয়া যায়—এসব নিয়ে চলত আলোচনা। ফুটবলাররা তখন শুধু ফুটবলার ছিলেন না, ছিলেন ঘরের মানুষের মতো আপন। তাদের জন্য গ্যালারি ভরাত মানুষ। তাদের খেলা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসত দর্শক।
সেই সময়েরই এক নাম জাকির হোসেন বাদল। ঢাকার ফুটবলে যাকে সবাই চিনতেন ‘বড় বাদল’ নামে। একই সময়ে আর এক বাদলও উঠে এসেছিলেন। তাই নামের বিভ্রান্তি এড়াতেই একজন হয়ে গেলেন বড় বাদল, অন্যজন ছোট বাদল (বাদল রায়)। পরে মোহামেডানের সাদা-কালো জার্সিতে বাদল রায় হয়ে ওঠেন ঢাকার ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা।
সময়ের স্রোত বদলেছে। মাঠ বদলেছে। বদলে গিয়েছে ফুটবলের ভাষাও। একদিন যাদের ঘিরে শহরের চায়ের দোকান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আড্ডা পর্যন্ত সরগরম থাকত, তাদের অনেকেই এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে। কেউ স্থায়ী হয়েছেন বিদেশে, কেউ সন্তানদের কাছে। পুরনো সতীর্থদের সঙ্গে দেখা হয় কালেভদ্রে। আর টেলিভিশনের পর্দায় দেশের ফুটবলের খবর দেখেই ফিরে যেতে হয় সেই পুরনো দিনে।
কমনওয়েলথ গেমসের ব্যস্ততা শেষ করে লন্ডনে ফিরেছি। মাঠের আলো নিভেছে, ক্রীড়াবিদেরা ফিরছেন নিজেদের দেশে। অথচ এই ক্রীড়া-উন্মাদনার মধ্যেই বিদেশের মাটিতে দেখা হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের কত পুরনো মুখের সঙ্গে। তাদের গল্পে কখনও সাফল্যের আলো, কখনও দীর্ঘশ্বাস। সেই দীর্ঘশ্বাসটাই সবচেয়ে বেশি শোনা গেল বড় বাদলের কণ্ঠে।
লন্ডনে থাকেন জাকির হোসেন বাদল। একসময় ঢাকার মাঠ মাতানো সেই ফুটবলার এখন দূরদেশে বসে বাংলাদেশের ফুটবলের খবর রাখেন। মাঠের পুরনো দিনের কথা উঠতেই কণ্ঠে ফিরে এল অন্য এক সময়ের আবেশ। বলছিলেন, ‘অন্য খেলার কথা বলে কী লাভ। আমাদের সময় কি ফুটবল ছিল! আর এখন কী? ভাবলেই মনটা কেঁদে ওঠে।’
একটি ছোট বাক্য। অথচ তার মধ্যে আটকে আছে একটা গোটা যুগের গল্প।
সেই যুগে ফুটবল ছিল মানুষের আবেগের বড় জায়গা। আবাহনী-মোহামেডান মানে শুধু ৯০ মিনিটের ম্যাচ নয়, ছিল পাড়া-মহল্লার বিভাজন, বন্ধুত্বে তর্ক, পরিবারের মধ্যে রসিকতা, অফিসে বাজি। মাঠে একজন খেলোয়াড়ের সামান্য ভুলে গ্যালারি থেকে উঠত হাহাকার, একটি গোলেই বদলে যেত গোটা শহরের মেজাজ।
আজকের ফুটবলের সঙ্গে সেই সময়ের তুলনা করতে গিয়ে বাদলের কণ্ঠে তাই আক্ষেপ। তার অভিযোগ শুধু মাঠের খেলাকে ঘিরে নয়, ব্যবস্থাপনা নিয়েও, ‘গত এক যুগের বেশি সময় একই ব্যক্তি ফেডারেশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। অথচ ফুটবলের কোনও মানোন্নয়ন হয়নি। ফুটবলাররা তাদের মান ও যোগ্যতার চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ পাচ্ছে ক্লাব থেকে। কিন্তু জাতীয় দলে কিছু করতে পারছে না।’
অভিযোগের ভাষা কঠিন। তার পিছনে যে কষ্ট, সেটি আরও গভীর। তিনি এমন একটি সময় দেখেছেন, যখন ফুটবলার হওয়ার অর্থ ছিল মানুষের ভালোবাসা পাওয়া। শুধু অর্থের অঙ্ক দিয়ে জনপ্রিয়তা মাপা যেত না।
ঢাকার ফুটবলের সেই জৌলুসের কথা উঠলে তাই একের পর এক নাম ফিরে আসে। বাদল রায়, এনায়েতুর রহমান, মহসীন, আসলাম, বাবলু, খোরশেদ বাবুল, আশীষ ভদ্র—কত নাম! তাদের ঘিরে তৈরি হয়েছিল এক বিশেষ ফুটবল-সংস্কৃতি। পুরনো দিনের ফুটবল নিয়ে লেখা স্মৃতিচারণেও সেই তারকাদের জনপ্রিয়তার ছবি উঠে এসেছে।
বড় বাদলের গল্পটা অন্য রকম। নামের পাশে ‘বড়’ শব্দটি ছিল শুধু পরিচয়ের জন্য নয়, একটি সময়ের স্মারকও। তিনি ছিলেন সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি, যখন ঢাকার মাঠে ফুটবল ছিল শহরের সবচেয়ে বড় বিনোদনগুলির একটি।
আজ লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে সেই মানুষটির মুখে বাংলাদেশের ফুটবলের কথা শুনলে মনে হয়, দূরত্ব কখনও কখনও মানুষকে আরও বেশি কাছে নিয়ে আসে। দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও তিনি এখনও শুনতে পান ঢাকার গ্যালারির আওয়াজ। দেখতে পান সবুজ মাঠ। চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুরনো সতীর্থ, পুরনো প্রতিপক্ষ, পুরনো দর্শক।
তারপর বর্তমানের ফুটবলের কথা মনে পড়লেই দীর্ঘশ্বাস, ‘আমাদের সময় কি ফুটবল ছিল। আর এখন কি।’ বড় বাদলের এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো তার নিজের কাছেও নেই। কিন্তু প্রশ্নটি রয়ে যায় বাংলাদেশের ফুটবলের কাছেই।
যে মাঠ একদিন মানুষকে টেনে আনত, সেই মাঠ যদি একদিন মানুষকে ভুলিয়ে দেয়, তাহলে কষ্টটা শুধু একজন সাবেক ফুটবলারের নয়। কষ্টটা একটি সময়ের।
লন্ডনের কোনো এক সন্ধ্যায়, দেশের মাঠ থেকে বহু দূরে বসে বড় বাদল সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের কথাই হয়তো মনে করেন। মনে করেন সেই গ্যালারি, সেই করতালি, সেই গোলের পর উচ্ছ্বাস। তারপর বর্তমানের ফুটবলের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে একটাই দীর্ঘশ্বাস, ‘ভাবলেই মনটা কেঁদে ওঠে।’


