ব্যালন ডি’অর জয়ের লড়াইয়ে শীর্ষে যে পাঁচ তারকা
Advertisement
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর বিজয়ীর নাম ঘোষণার সময় ঘনিয়ে আসছে। আগামী ২৬ অক্টোবর জানা যাবে, উসমান দেম্বেলের পর ফুটবলের মর্যাদাপূর্ণ এই ব্যক্তিগত পুরস্কার কার হাতে উঠছে।
পুরস্কারটি ঘিরে আলোচনার মধ্যে নিউইয়র্ক টাইমস-এর বিশ্লেষণে এগিয়ে থাকা পাঁচ ফুটবলার হলেন হ্যারি কেইন, মাইকেল অলিসে, লামিনে ইয়ামাল, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও রদ্রি।
ব্যালন ডি’অরের চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণ করবেন ১০০ জন সাংবাদিক। খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অবদান, দলীয় সাফল্য, জেতা শিরোপা এবং মাঠ ও মাঠের বাইরের আচরণ বিবেচনায় নিয়ে তারা ১ থেকে ১০ পর্যন্ত নম্বর দেবেন।
লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো কিংবদন্তিরা ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের কাছে এই পুরস্কার জয়ের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তবে ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে শুধু ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানই নয়, বড় ম্যাচে পারফরম্যান্স ও দলীয় অর্জনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পুরস্কারের জন্য বিবেচিত সময় গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত হলেও নতুন মৌসুমের শুরুতে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সও আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিভিন্ন বেটিং প্রতিষ্ঠানের হিসাবেও লামিনে ইয়ামালকে অন্যতম ফেবারিট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে দ্য অ্যাথলেটিকের বিশ্লেষণে শীর্ষ পাঁচের মধ্যে অবস্থান পেয়েছেন অন্য চার তারকাও।
১. হ্যারি কেইন — বায়ার্ন মিউনিখ ও ইংল্যান্ড
২০২৫-২৬ মৌসুমে গোলের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন হ্যারি কেইন। বুন্দেসলিগা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে তার গোলসংখ্যা ৫৬, সঙ্গে রয়েছে আটটি অ্যাসিস্ট। অন্যান্য প্রতিযোগিতায় বায়ার্নের হয়ে আরও ১১ গোল এবং ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচে ছয় গোল যোগ করলে সব মিলিয়ে ৬৫ ম্যাচে তার গোল দাঁড়ায় ৭৩টি।
গোল করার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেও নিজের কার্যকারিতা দেখিয়েছেন ৩৩ বছর বয়সি এই স্ট্রাইকার। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের পাঁচটি নকআউট ম্যাচে করেছেন ছয় গোল। জার্মান কাপ ডিএফবি-পোকালের ফাইনালেও হ্যাটট্রিকের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তিনি।
বিশ্বকাপেও দুর্দান্ত ছন্দে ছিলেন কেইন। শেষ ৩২-এর ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে জোড়া গোল করার পর পরের রাউন্ডে মেক্সিকোর বিপক্ষে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেন।
তবে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালে প্রত্যাশা অনুযায়ী খেলতে না পারা এবং পিএসজির কাছে হেরে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে বায়ার্নের বিদায় তার পুরস্কার জয়ের পথে বাধা হতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে দুর্দান্ত মৌসুম কাটালেও বড় দলীয় শিরোপার অভাব তার জন্য নেতিবাচক দিক।
তারপরও নতুন মৌসুমে কেইনের পারফরম্যান্স অব্যাহত রয়েছে। বায়ার্নের হয়ে ১০ ম্যাচে করেছেন নয় গোল। ইংল্যান্ডের হয়ে নেশনস লিগের চার ম্যাচে তার গোল ছয়টি।
২. মাইকেল অলিসে — বায়ার্ন মিউনিখ ও ফ্রান্স
২০২৫-২৬ মৌসুমে গোল ও অ্যাসিস্টের সম্মিলিত হিসাবে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের খেলোয়াড়দের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে ছিলেন মাইকেল অলিসে। পেনাল্টি বাদ দিয়ে গোল ও অ্যাসিস্টের হিসাব বিবেচনায় তার পারফরম্যান্স ছিল বিশেষভাবে নজরকাড়া। লিগ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে ৫৩ ম্যাচে ২০ গোল করার পাশাপাশি ৩২টি অ্যাসিস্ট করেছেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড।
বিশ্বকাপে এক আসরে সর্বোচ্চ সাতটি অ্যাসিস্টের রেকর্ডও গড়েছেন অলিসে। জাতীয় দলের হয়ে বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচ মিলিয়ে আরও নয় ম্যাচে করেছেন পাঁচ গোল। উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে তার রয়েছে একটি হ্যাটট্রিকও।
আক্রমণে সৃজনশীলতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরির দক্ষতা অলিসেকে আলাদা করেছে। বায়ার্ন মিউনিখ ও ফ্রান্সের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। ওপেন প্লে ও সেট পিস—দুই ক্ষেত্রেই সুযোগ তৈরির পাশাপাশি রক্ষণেও অবদান রেখেছেন এই ২৪ বছর বয়সি তারকা।
তবে কেইনের মতো অলিসের ক্ষেত্রেও বড় প্রতিযোগিতায় দলীয় সাফল্যের ঘাটতি ব্যালন ডি’অর জয়ের পথে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তারপরও গত মৌসুমের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাকে ইউরোপের অন্যতম আলোচিত আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।
চলতি মৌসুমেও নিজের ছন্দ ধরে রেখেছেন অলিসে। বায়ার্নের হয়ে ১০ ম্যাচে করেছেন নয় গোল, আর ফ্রান্সের হয়ে চার ম্যাচে চার গোল।
৩. লামিনে ইয়ামাল — বার্সেলোনা ও স্পেন
অল্প বয়সেই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা হয়ে উঠেছেন লামিনে ইয়ামাল। ২০২৫-২৬ মৌসুমে তার পারফরম্যান্সে এসেছে আরও উন্নতি। আগের মৌসুমে লা লিগা ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ মিলিয়ে ৪৮ ম্যাচে ১৪ গোল ও ১৬টি অ্যাসিস্ট করেছিলেন তিনি। পরের মৌসুমে মাত্র ৩৮ ম্যাচে গোল করেছেন ২২টি, সঙ্গে রয়েছে ১৫টি অ্যাসিস্ট।
তবে চোটের কারণে পুরো মৌসুমে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে ইয়ামালের জন্য। মৌসুমের শুরুতে পাবালজিয়া এবং শেষ দিকে হ্যামস্ট্রিংয়ের সমস্যায় ভুগেছেন তিনি। বিশ্বকাপেও এর প্রভাব পড়ে। সৌদি আরবের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে গোল করার পাশাপাশি ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে সতীর্থকে দিয়ে গোল করান। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি।
তা সত্ত্বেও ইয়ামালের বয়স, দক্ষতা ও আক্রমণাত্মক সামর্থ্য তাকে ব্যালন ডি’অরের অন্যতম দাবিদার করে তুলেছে। চলতি মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে ১১ ম্যাচে করেছেন নয় গোল ও ১০টি অ্যাসিস্ট। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিরতিতে স্পেনের হয়ে চার ম্যাচে তার গোলসংখ্যা চার।
নতুন মৌসুমের শুরুতে এমন পারফরম্যান্স ইয়ামালকে শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাতারে নিয়ে এসেছে। বয়সের কারণে ভবিষ্যতেও একাধিকবার এই পুরস্কার জয়ের সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন তিনি।
৪. কিলিয়ান এমবাপ্পে — রিয়াল মাদ্রিদ ও ফ্রান্স
বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের জানান দিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। টুর্নামেন্টে ১০ গোল করে টানা দ্বিতীয়বার গোল্ডেন বুট জিতেছেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায়ও নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন তিনি। ২২ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা ২২।
জাতীয় দলের পাশাপাশি রিয়াল মাদ্রিদের হয়েও ব্যক্তিগতভাবে সফল মৌসুম কাটিয়েছেন ২৭ বছর বয়সি এমবাপ্পে। লা লিগা ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ মিলিয়ে ৪২ ম্যাচে করেছেন ৪০ গোল। দলের বিভিন্ন সমস্যার মধ্যেও অনেক ম্যাচে আক্রমণের প্রধান ভরসা ছিলেন তিনি।
কোচ হিসেবে জাবি আলোনসোর অধীনে মৌসুম শুরু করলেও শেষ দিকে আলভারো আরবেলোয়ার অধীনে খেলেছে রিয়াল মাদ্রিদ। কিন্তু এমবাপ্পের ব্যক্তিগত সাফল্য সত্ত্বেও বড় দলীয় শিরোপার অভাব তার ব্যালন ডি’অর জয়ের সম্ভাবনায় প্রভাব ফেলতে পারে। টানা দ্বিতীয় মৌসুমে বড় কোনো ক্লাব শিরোপা না পাওয়া এবং বিশ্বকাপে চতুর্থ স্থানে শেষ করাও তার জন্য নেতিবাচক দিক।
অবশ্য নতুন মৌসুমে আবারও গোলের ধারায় রয়েছেন এমবাপ্পে। জোসে মরিনিওর অধীনে ক্লাব ফুটবলে ১১ ম্যাচে করেছেন ১১ গোল। ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের দিক থেকে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সমানে পাল্লা দিচ্ছেন। তবে ব্যালন ডি’অর জিততে তার গোলসংখ্যার পাশাপাশি দলীয় সাফল্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
৫. রদ্রি — বার্সেলোনা ও স্পেন
২০২৫-২৬ মৌসুমে রদ্রির যাত্রা ছিল চোটের বাধা পেরিয়ে ছন্দে ফেরার গল্প। অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট বা এসিএল চোটের কারণে আট মাস মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডারকে। মাঠে ফেরার পরও হ্যামস্ট্রিং ও হাঁটুর সমস্যায় ভুগেছেন তিনি। ফলে ম্যানচেস্টার সিটির প্রিমিয়ার লিগের প্রথম ১৭ ম্যাচের ১১টিতে খেলতে পারেননি।
তবে ২০২৬ সালের শুরু থেকে ধীরে ধীরে নিজের পুরোনো ফর্ম ফিরে পেতে থাকেন রদ্রি। পেপ গার্দিওলার অধীনে ম্যানচেস্টার সিটির মাঝমাঠে ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি দ্রুত আক্রমণ গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
মার্চ ও এপ্রিলে আর্সেনালের বিপক্ষে লিগ ও কারাবাও কাপের ফাইনালে সিটির সাফল্যে অবদান ছিল তার। চোটের সমস্যা থাকা সত্ত্বেও চেলসির বিপক্ষে এফএ কাপের ফাইনালেও ভালো পারফরম্যান্স করেন এই মিডফিল্ডার।
বিশ্বকাপে স্পেনের হয়ে রদ্রির পারফরম্যান্স তার পুরস্কার জয়ের দাবিকে আরও শক্তিশালী করেছে। মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করে দলকে শিরোপা জেতাতে সহায়তা করেন তিনি। টুর্নামেন্ট শেষে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বলও জেতেন ৩০ বছর বয়সি এই তারকা।
তবে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে পুরো মৌসুমে তার খেলার সময় ছিল মাত্র ২ হাজার ১৮৫ মিনিট, যা পূর্ণ ৯০ মিনিটের হিসাবে ২৪টির কিছু বেশি ম্যাচের সমান। চোটের কারণে মাঠে কম সময় কাটানো তার ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানকে প্রভাবিত করতে পারে।
বর্তমানে বার্সেলোনায় খেলছেন রদ্রি। নতুন ক্লাবে মানিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। গত সপ্তাহে রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে ৫-২ গোলের জয়ে বার্সেলোনার হয়ে নিজের প্রথম গোল করেন এই মিডফিল্ডার।
ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, বিশ্বকাপের সাফল্য এবং মাঝমাঠে তার প্রভাব—সব মিলিয়ে ব্যালন ডি’অরের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন রদ্রি।

