প্রজন্ম বদলালেও চন্দরপলদের ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, অনুশাসন’ বদলায়নি
Advertisement
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪০ এএম
বাবা শিবনারায়ন চন্দরপল (বাঁয়ে), ছেলে তেজনারায়ন চন্দরপল/সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চন্দরপল, নামটা শুনলে আপনার কী মনে পড়ে? প্রথমেই মনে পড়তে পারে বেল খুলে ক্রিজে গর্ত খুঁড়ে গার্ড নেওয়ার জায়গা ঠিক করা, এরপর অদ্ভুত এক ব্যাটিং স্টান্সের বিষয়টি। শিবনারায়ন চন্দরপলের আরও একটা বিশেষত্ব ছিল, বাংলাদেশকে পেলেই জ্বলে ওঠা।
সেই চন্দরপল এখন আর নেই, অবসর নিয়েছেন বহু আগে। তার ছেলে তেজনারায়ন এখন খেলছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে, এসেছেন বাংলাদেশ সফরেও। শুধু আসেনইনি। বাবার লেগ্যাসিটাকেও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। দেখিয়েছেন, প্রজন্ম বদলে গেলেও ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, অনুশাসন’ কখনো কখনো একই থেকে যায়।
গতকাল ওয়েস্ট ইন্ডিজ যখন জবাব দিতে নেমেছে বাংলাদেশের ২৭৩ রানের, তখন ক্যারিবীয়রা শুরুটা করেছিল বেশ ঝড়ো। রান উঠছিল ওভারপ্রতি ৬-এর কাছে। ওপেনিং জুটিটা অবশ্য টেকেনি। ৪.৫ ওভারে ২৯ রান উঠেছে এই জুটিতে, ওয়ানডে মেজাজে ১৫ রান তুলে আউট হন ব্রেন্ডন কিং।
উইন্ডিজ যখন ওভাবে ব্যাট করছিল ইনিংসের শুরুতে, একেই মনে হচ্ছিল যথার্থ অ্যাপ্রোচ। উইকেটে শুরুর দিন থেকেই টার্ন পাচ্ছিলেন সফরকারী স্পিনাররা। সেখানে উইকেটে টিকে থাকার চেয়ে দ্রুত রান তোলার অ্যাপ্রোচই শ্রেয়, এমনই মনে হচ্ছিল।
এরপরই মুদ্রার উল্টো পিঠটা দেখালেন চন্দরপল। ধৈর্য্যের প্রতিমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে যান উইকেটে। একের পর এক বল আসছিল, তিনি সেসব হয় ঠেকাচ্ছিলেন, নাহয় ছেড়ে দিচ্ছিলেন, বাজে বল পেলে শাস্তিও দিচ্ছিলেন। প্রথম দিনে প্রায় কাছাকাছি প্রদর্শনী সাদমান ইসলামও দেখিয়েছেন, কিন্তু চন্দরপল তা করলেন আরও নিখুঁতভাবে। এই উইকেটেও যে টিকে থাকার মতো, টেস্ট ম্যাচের ধ্রুপদী ব্যাটিংটা করে দেখানো যায়, তা জানান দিলেন।
যেভাবে কাজটা করছিলেন, তাতে বাংলাদেশ খানিকটা ফ্ল্যাশব্যাকও পাচ্ছিল অতীতের। বাবা শিবনারায়ন যে অতীতে বহুবার তেঁতো স্বাদ দিয়েছেন দলকে! তার ক্যারিয়ার গড় যেখানে ৫১.৩৭, সেখানে বাংলাদেশের বিপক্ষে তা উঠে যেত ১৪৯.৫-এ। ১৪ ইনিংস খেলেই করেছিলেন ৪টি, ফিফটি আছে আরও ৩টি। বাংলাদেশের মাটিতে পরিসংখ্যানটা অত সমৃদ্ধ নয়, তবে ক্যারিয়ারসেরা ২০৩ রানের ইনিংসটা তিনি খেলেছিলেন এখানেই।
তবে এইসব পরিসংখ্যান ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে তার ব্যাটিংয়ের বিপরীতে থাকার অনুভূতিটা। ভালো বলেও তাকে নড়ানো যাচ্ছে না, ফাঁদ পাতলে পা দিচ্ছেন না, একের পর এক বল ঠেকিয়েই যাচ্ছেন… বিষয়টা আর যাই হোক বোলিং দলের জন্য বেশ হতাশা জাগানিয়া।
ঠিক একই অনুভূতি তার ছেলে তেজ ফিরিয়ে এনেছিলেন গেল বিকেল থেকে আজ পর্যন্ত। ব্যাটিংটা ঠিক তার বাবার মতো ওপেন চেস্ট হয়ে দাঁড়িয়ে, শেষ মুহূর্তে পজিশন বদলে করেন না। তার ব্যাটিং অনেকটাই প্রথাগত। তবে ফাঁদে পা না দেওয়া, ভালো বলেও পা না হড়কানো… সেই ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, অনুশাসন’ মেনেছেন বাবার মতো করেই।
হতেই হতো অবশ্য, বাবা শিব তো বহু বছর তাকে হাতে ধরে শিখিয়েছেন কী করে তার মতো ব্যাটিং করতে হয়! বাংলাদেশে আসার আগে তাদেরকে কী করে পড়তে হয়, এখানে কী করে খেলতে হয়, সেটাও কি শিখিয়ে দিয়েছিলেন? কে জানে!
তেজ শেষমেশ আউট হয়েছেন শরীফুল ইসলামের বলে। তবে তার আগে যা করেছেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য পরিস্থিতি আর উইকেট বিচারে তা রীতিমতো অমূল্য। ৫৬ রান তুলেছেন। তা তুলতে তিনি খেলেছেন প্রায় ৩১ ওভার। ১৮৪ বলের এই ইনিংস বাংলাদেশকে হতাশা উপহার দিয়েছে, বোলারদের মনোবলেও ভালো প্রভাব ফেলেছে তা বলাই বাহুল্য। ম্যাচ জিতে বাংলাদেশের টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের সমীকরণ মেলানোর আশাতেও বড় ধোঁয়াশা তৈরি করেছে, অন্তত এখন পর্যন্ত।
সিরিজটা কেবল শুরু হলো। এই সফরে আরও ৩ ইনিংসে ব্যাট হাতে নামতে পারেন তেজ। বাবার দেখানো-শেখানো পথ ধরে বাংলাদেশকে আরও বেশি যন্ত্রণা নিশ্চিতভাবেই উপহার দিতে চাইবেন জুনিয়র চন্দরপল।

