পদবাণিজ্য
গাজীপুরের যুবলীগ নেতা সাইফুলের সম্পদের পাহাড়
Advertisement
মুহাম্মদ আবুল কাশেম, গাজীপুর
প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
টেলিফোনের এক প্রান্ত থেকে বলছিলেন ‘আপনি সাইফুলরে ৩০ লাখ দিছেন, আমারে ৩০ ট্যাহাও দেয়োন লাগতো না। আপনে যে ট্যাহা দিছেন, এইড্যা কি মন্ত্রীর নলেজে দিয়া লইছিলেন?’ অন্যপ্রান্ত থেকে জবাব আসে-‘আমার এই টাকা দেওয়ার সাক্ষী আছে বহু। আমি দিছি ৩০ লাখ, আলম পাশা দিছে ২০ লাখ।’ গাজীপুরে এ রকম কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। গাজীপুর মহানগর যুবলীগের ২ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক সুমন আহমেদ টেলিফোনে কথা বলছিলেন যুবলীগের পদপ্রত্যাশী কাইয়ুম সরকারের সঙ্গে।
এলাকায় শান্ত বাবু নামে পরিচিত সুমন আহমেদের বাড়ি চান্দনা চৌরাস্তায় এবং কাইয়ুম সরকারের বাড়ি গাজীপুরের টঙ্গীর তিস্তা গেট এলাকায়। এলাকাবাসীর ধারণা কাইয়ুমের কাছ থেকে তথ্য আদায় এবং তা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই কাজটি করেছেন শান্ত বাবু। ভাইরাল হওয়া ফোনালাপের কণ্ঠস্বর নিজেদের বলে স্বীকার করলেও এর বেশি মন্তব্য করতে রাজি হননি দুজনের কেউই। তবে অতি অল্প সময়ে সাইফুল এত সম্পত্তির মালিক হয়েছেন কীভাবে-এমন প্রশ্ন শান্ত বাবুরও।
তিনি বলেন, যাদের কাছ থেকে পদ নেওয়ার নামে টাকা নিয়েছেন তাদের একটি লিস্ট আছে তার কাছে।
অডিও ক্লিপে দু’জনের কথোপকথন থেকে জানা যায়, কাইয়ুম সরকার পদ পাওয়ার জন্য মহানগর যুবলীগের ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলামকে ৩০ লাখ টাকা দিয়েছেন। আলম পাশা নামে এক যুবলীগ নেতা দিয়েছেন ২০ লাখ। দু’জনের কথোপকথনের অডিও ক্লিপের সূত্র ধরে যুবলীগ নেতা সাইফুলের পদ বাণিজ্যের অনুসন্ধান চালিয়ে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে একসময়কার দরিদ্র সাইফুলের বিপুল বিত্তবৈভবের তথ্য। মোবাইল ফোন চুরি করতে গিয়ে ধরা খেয়েছিলেন তিনি। পুলিশের মাদক ব্যবসায়ীর তালিকাতেও তার নাম রয়েছে।
গাজীপুর মহানগরের টঙ্গীর কাঁঠালদিয়া এলাকার ঘরজামাই ওয়াজ উদ্দিনের ছেলে যুবলীগ নেতা সাইফুল ইসলাম এক সময় মামাতো ভাইয়েদের পুরোনো জামাকাপড় গায়ে দিয়ে স্কুলে যেতেন বলে ওই ভাইরাই জানিয়েছেন। পরে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা অবস্থায় নানা বাড়ির আত্মীয়স্বজনের অর্থানুকূল্যে ব্যানার-ফেস্টুন বানাতেন। সেই সাইফুল মাত্র এক দশকের ব্যবধানে বনে গেছেন ধনাঢ্য ব্যক্তিতে। তার প্রায় ৩০ বিঘা জমির ওপর একটি রিসোর্ট রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় জমি ক্রয় করে তৈরি করেছেন অন্তত ডজনখানেক বাড়ি, মার্কেট, গরুর খামার। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে সাইফুলের সম্পত্তির বিবরণ। ওই প্রতিবেদনে যুবলীগের পদ বাণিজ্যের কথাও বলা হয়েছে।
কে এই সাইফুল : শ্রীপুর উপজেলার গোসিঙ্গা ইউনিয়নের খিলপাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া ওয়াজ উদ্দিনের ছেলে সাইফুল ইসলাম। সংসারে সচ্ছলতা আনার জন্য স্বাধীনতার পরে তার বাবা টঙ্গীর কাঁঠালদিয়া এলাকায় চলে যান। সেখানে প্রয়াত হাজী বোদাই মাদবরের কন্যা তারাবানুকে বিয়ে করে সংসার গড়েন। ওয়াজ উদ্দিন স্থানীয় অলিম্পিক টেক্সটাইল কারখানায় কেরানি পদে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু করেন কর্মজীবন। প্রভাবশালী বোদাই মাদবর তার জামাতা ওয়াজ উদ্দিনকে একখণ্ড জমি দেন বসবাস করার জন্য। এরই মধ্যে ২ ছেলে ও ১ মেয়ে সন্তানের জন্ম হয় তাদের সংসারে। ওয়াজ উদ্দিনের দুই ছেলের মধ্যে সাইফুল ইসলাম বড় ও শফিকুল ইসলাম শিমুল ছোট। নানা বাড়ির ছোট্ট একটি ঘরে থাকতেন তিনি। বাবার কেরানি পদে চাকরির টাকায় তাদের সংসরাই চলত না। সাইফুল ১৯৯৪ সালে এসএসসি পাশ করার পর ভর্তি হন টঙ্গী সরকারি কলেজে। শুরু করেন ছাত্রলীগের রাজনীতি। কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন করে জয়ী হন। পরে উত্তরায় অবস্থিত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। সাইফুলের মামাতো ভাই হাজী সেলিম মিয়া বলেন, ‘আমার ছোট ভাই নূর মুহাম্মদ মামুনের জামা কাপড় পরে সাইফুল কলেজে যেত। নির্বাচনের সব পোস্টার আমরাই ছাপিয়ে দিতাম। দারিদ্র্যের সঙ্গেই সাইফুলের ঘরবসতি ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে শত কোটি টাকার মালিক হয়ে যাওয়ার নেপথ্য কাহিনি জানা নেই আমাদের। এলাকার লোকজন প্রশ্ন করে, উত্তর দিতে পারি না।’
কীভাবে উত্থান? ২০০৬ সালের নভেম্বরে উত্তরার রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স থেকে চোরাই মোবাইল ফোনসেটসহ র্যাবের হাতে ধরা পড়েছিলেন তিনি। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বদলে যেতে থাকে সাইফুলের ভাগ্যের চাকা। জনবহুল টঙ্গী এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ঝুট ব্যবসা আর দখলবাজি করতে থাকেন সমানতালে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১৫ সালের ১৫ জুলাই গাজীপুর মহানগর যুবলীগের আহবায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই কমিটির ১নম্বর যুগ্ম আহ্বায়কের পদ বাগিয়ে নেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে অর্থের বিনিময়ে পদটি বাগিয়েছিলেন সাইফুল। টঙ্গীর আবদুল বারেক নামে আওয়ামী লীগের এক নেতা জানান, এই পদ পাওয়ার পর সাইফুল বহু জায়গায় বলে বেড়িয়েছেন, জীবনে যা উপার্জন করেছিলেন সব চলে গেছে এই পদ আনতে। পদ পাওয়ার পর দলীয় কর্মসূচিতে তাকে মাঠে পাওয়া না গেলেও মহানগরের অলিগলিতে বড় বড় বিলবোর্ড-ফেস্টুন লাগাতেন নিয়মিত। কিছুটা পরিচিতি আসার পর শুরু করেন পদবাণিজ্য। বিভিন্ন ওয়ার্ডে যুবলীগের সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদকের পদ প্রত্যাশীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
মহানগরের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের আহ্বায়ক আশরাফুল আলম এনামুল বলেন, পদ দেওয়ার নামে সাইফুল আমার কাছ থেকে দফায় দফায় ১৯ লাখ টাকা নিয়েছেন। কিন্তু পদ দিতে পারেননি। সাইফুল আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। মহানগরের ২৬ ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি সাইদুল ইসলাম বলেন, গাজীপুর সদর থানা যুবলীগের সভাপতির পদ দেওয়ার কথা বলে সাইফুলের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতাকে সাড়ে ১০ লাখ টাকা দিয়েছি।
অভিযোগ রয়েছে, টঙ্গী মুদাফা এলাকার এক বাসিন্দাতে পশ্চিম থানা যুবলীগের সভাপতি পদ দেওয়ার কথা বলে ৩০ লাখ টাকা নিয়েছেন সাইফুল। কুনিয়াতারগাছ এলাকার বাসিন্দাকে গাছা থানা যুবলীগের সভাপতির পদ দেওয়ার কথা বলে ৪০ লাখ টাকা নিয়েছেন। টঙ্গীর মধুমিতা এলাকার এক বাসিন্দাকে টঙ্গী পূর্ব থানা যুবলীগের সভাপতি পদ দেওয়ার কথা বলে নিয়েছেন ২৫ লাখ টাকা। পদপ্রত্যাশী এক নেতা বলেন, ‘সাইফুল আমাকে ওয়ার্ডের সভাপতি করবে বলে ৭ লাখ টাকা নিয়েছে। আমি নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলাম। পরে অর্ধেক টাকা ফেরত দিয়েছে।’
টঙ্গী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক বলেন, ‘পদ দেওয়ার কথা বলে সাইফুল বহু মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। কী বলব-আমার ছেলে আনিসুল হক রবীনের কাছ থেকেও ৩ লাখ টাকা নিয়েছে পদ দেবে বলে। ১ লাখ করে ৩ বারে ৩ লাখ টাকা নিয়েছে। কিন্তু পদ দিতে পারেনি।’
এদিকে রাজনীতিতে নিজের পরিচয় আকর্ষণীয় ও চমকপ্রদভাবে তুলে ধরতে একশর মতো আসল-নকল মুক্তিযোদ্ধাকে ঘর করে দিয়েছেন সাইফুল। প্রতিবাড়ি খরচ ও করেছেন লাখ পাঁচ থেকে সাত লাখ পর্যন্ত টাকা। কিন্তু এই টাকার নির্দিষ্ট কোনো উৎস নেই।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাইফুল যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি বাণিজ্যে জড়িত নই। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা। মাদক বাণিজ্যে আমার পরিবারের কেউ জড়িত নয়।’
২০১৫ সালে যুবলীগের রাজনীতিতে এসে এত সম্পদ কীভাবে করলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ব্যবসা করে সম্পদ অর্জন করছি। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। কত হাজার কোটি টাকা লোন করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করেছি সব আমার আয়কর বহিতে উল্লেখ আছে।
