Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

বিপর্যস্ত পৃথিবী সাজাবে পবিত্র মনের মানুষ

Icon

আমিনুল ইসলাম হুসাইনী

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২০, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিপর্যস্ত পৃথিবী সাজাবে পবিত্র মনের মানুষ

Advertisement

আজ পুরো পৃথিবী থমকে আছে। থেমে গেছে মানুষের প্রাণচাঞ্চল্যতা। যে মানুষ বনের পশুকে এতদিন খাঁচায় বন্দি করে রাখত, সেই মানুষই এখন খাঁচাবন্দি হয়ে পড়েছে।

এ পরিণতি কেন হল? এ যে আমাদেরই পাপাচারের ফসল। আমাদের দম্ভ, ঔদ্ধত্য এতটাই বেড়ে গিয়েছিল, নিজেদের স্রষ্টার সমকক্ষ ভাবতে শুরু করেছিলাম। বিজ্ঞান, প্রযুক্তির ওপর ভরসা করে আমরা এক আল্লাহর ওপর ভরসা করা ছেড়ে দিয়েছি। ভুলে গিয়েছিলাম আমরা মানুষ।

আর মানুষকে আল্লাহতায়ালা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে পাঠিয়েছিলেন পৃথিবী রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য; কিন্তু আমরা মানুষ যেন আর মানুষ নেই। দেখতে মানুষের মতো হলেও আদতে আমরা এক একটা দানবে পরিণত হয়েছি।

আমাদের ভেতরটা কালো। অথচ সেখানে থাকার কথা ছিল হেরার আলো। ভেতরে অন্ধকার পুষে বাইরে আমরা আলোর ফেরিওয়ালা সেজেছি। ধর্ম আমাদের কাছে কেবলই আনুষ্ঠানিকতা, লোক দেখানো। নিজেকে প্রকাশ করার জন্য আমরা রোজা-নামাজ, হজ-জাকাত, দান-দক্ষিণা করলেও ধর্মের মূলনীতি মানবিকতায় আন্তরিক হইনি একবিন্দুও।

মুখে মুখে আমরা ধর্ম জপলেও ধর্মের প্রাণপুরুষ, মানবতার ফেরিওয়ালা মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শের ধারে কাছেও ঘেঁষি না। আর সে জন্যই আমরা ভিন্ন মতের, ভিন্ন পথের, ভিন্ন দেশের মানুষের গলা কাটি। যুদ্ধ বাধাই। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেই। দেশান্তরিত হতে বাধ্য করি।

অথচ রাসূল (সা) সব ধর্মের, সব মতের মানুষের সঙ্গেই মিশেছেন। সদাচারণ করেছেন। কারণ তাঁর কাছে মানবতাই ছিল পরম ধর্ম। ধর্ম-বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সব মানুষই যে আল্লাহর সৃষ্টি। আল্লাহই তো মানুষকে ধর্মে, বর্ণে বৈচিত্র্য করেছেন। পবিত্র কোরআনেই বলা হয়েছে, ‘যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে তোমাদের সবাইকে এক উম্মত করে দিতেন; কিন্তু এমনটি তিনি করেননি- যাতে করে বিভিন্ন ধর্মের মাধ্যমে তোমাদের পরীক্ষা নেয়া যায়’ (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৪৮)।

মানুষ স্রষ্টার এ বৈচিত্র্যকে বৈষম্য বানিয়ে ধর্মে ধর্মে, গোত্রে গোত্রে, বর্ণে বর্ণে, দেশে দেশে যুদ্ধ বাধিয়ে পৃথিবীকে ধ্বংসের প্রান্তে নিয়ে এসেছে। এসব যুদ্ধবিগ্রহে কত অসহায় নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। কাক কখনও কাকের মাংস খায় না; কিন্তু মানুষ? মানুষ হয়ে মানুষের রক্তচোষা থেমে নেই।

অথচ আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘যে অকারণে কাউকে হত্যা করে, সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করল’ (সূরা মায়িদাহ, আয়াত ৩২)। যেখানে শুধু একজনকে হত্যা করলে পুরো মানবজাতিকে হত্যার শামিল বলা হয়েছে, সেখানে এত এত মানুষের প্রাণনাশের জন্য আল্লাহ কতটা রাগ হতে পারেন, তা আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালেই বোঝা যায়।

আল্লাহতায়ালা মানুষকে তাদের আত্মরক্ষা, আত্মোন্নতির জন্য সৃজনশীলতা ও আবিষ্কারের ক্ষমতা দিয়েছেন। সঙ্গে পৃথিবীবাসীর প্রতি মানুষের দায়িত্ব-কর্তব্য, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির কথাও বলেছেন। কিন্তু মানুষ এসব ভুলে গিয়ে শুধু আবিষ্কারের নেশায় মেতে উঠেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে একের পর এক মারণাস্ত্র আবিষ্কার করেছে। এ জন্যই আল্লাহ বলেছেন, ‘ক্ষমতা পেলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে কলহ বাধিয়ে বসবে’ (সূরা মুহাম্মদ, আয়াত ২২)।

মানুষ শুধু কলহই সৃষ্টি করেনি। সীমালঙ্ঘন করে পৃথিবীকে করেছে দোজখের গর্ত। এ জনই করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছে। যার প্রকোপে পুরো পৃথিবী এখন থরথর করে কাঁপছে। নেতিয়ে পড়েছে ক্ষমতাধর নেতারাও। কোথায় আজ তাদের সেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি? যার ভরসা করে মানুষ নিজেদের স্রষ্টার সমান ভাবতে শুরু করেছিল। কোথায় তাদের সাবমেরিন, যুদ্ধ যুদ্ধ সাজ? আজ সবকিছুই মুখ থুবড়ে পড়েছে।

সেই সিরিয়ান শিশুটির কথা আজ খুব মনে পড়ছে। সেই শিশুটি বলেছিল, ‘আমি আল্লাহকে সব বলে দেব’। সেই শিশুটি সত্যি আল্লাহকে সব বলে দিয়েছে। বলে দিয়েছে সেই পাখিটির কথা, যে পাখিটি উড়তে গিয়ে মিসাইলের আঘাতে টুকরো টুকরো হয়ে পড়েছে। আল্লাহ সেই শিশুটির কথা শুনেছেন। তাই থামিয়ে দিয়েছেন মানুষের সব রণডঙ্কা। শুধু থামিয়েই দেননি, স্তব্ধ করে দিয়েছেন সব কোলাহল।

যে মানুষ পৃথিবীকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা করছিল, আল্লাহতায়ালা এ করোনাভাইরাসের মাধ্যমে সেই মানুষ জাতিকেই পৃথিবী থেকে মুছে দেয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। আল্লাহতায়ালার রাগ বড়ই কঠিন। এ জন্যই রাসূল (সা.) এ ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করতে চায়, আল্লাহ তার ক্ষতি করেন। তেমনিভাবে যে ব্যক্তি অন্যের ওপর কঠিন হয়, আল্লাহ তার ওপরও কঠিন হন’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস নম্বর ২৩৭১।)

মানুষ কি শুধু মানুষ হত্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল? প্রকৃতিও যে তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। মানুষ নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, নদী ভরাট, পাহাড় কাটা, পানি দূষণ আর প্রযুক্তির বিষবাষ্প বাতাসে ছড়িয়ে ঘটিয়েছে জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তন। ফলে পৃথিবী এখন বিপর্যস্ত।

মহান আল্লাহ আমাদের কত সুন্দর একটি পৃথিবী দিয়েছিলেন। সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলায় সুশোভিত এ পৃথিবীতে মানুষ যেন সুস্থ, স্বাচ্ছন্দ্য ও সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে পারে- এ জন্য যা যা প্রয়োজন সব কিছুই তিনি বিছিয়ে দিয়েছিলেন এ বিশ্বলয়ের পরতে পরতে। অথচ মানুষ স্রষ্টার দেয়া উপহার এ নয়নাভিরাম পরিবেশকে নিজের হাতেই নষ্ট করেছে। তাই আল্লাহ আজ মানুষের টুঁটি চেপে ধরেছেন। মানুষকে ঘরবন্দি করে প্রকৃতির মুখে হাসি ফুটিয়েছেন।

মানুষ আজ ঘরবন্দি থাকায় মিল ফ্যাক্টরির কালো ধোঁয়ায় নীল আকাশ কালো হয় না। বাতাসে ভাসে না রাসায়নিক বিষ। নোংরা হয় না নদী-সাগরে পানি। তাই সাগরের প্রাণীরা এখন খেলা করে তীর ঘেঁষে ঘেঁষে। সমুদ্রসৈকতে ফোটে সাগর লতা। মানুষ ছাড়াও যে পৃথিবী সুন্দর থাকতে পারে, আল্লাহতায়ালা যেন করোনাভাইরাসের মাধ্যমে তাই-ই দেখাচ্ছেন।

এখন আমাদের হাতেই সিদ্ধান্ত। এ সুন্দর পৃথিবীতে আমরা থাকতে চাই কি চাই না? যদি চাই, তাহলে অবশ্যই আমাদের হৃদয় শুদ্ধ করতে হবে। হত্যা নয়, পৃথিবীর সব সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে।

সর্বোপরি সব পাপাচার ছেড়ে ফিরে আসতে হবে সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে। তবেই আমরা এ বিপদ থেকে রেহাই পাব। পবিত্র কোরআনেও সে কথাই বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর দিকে ফিরে এসো! নিশ্চয় তোমরা সফল হবে’ (সূরা নূর : ৩১)।

লেখক : প্রাবন্ধিক

Advertisement

করোনা

Advertisement

আরও পড়ুন

বুখারা থেকে সোনারগাঁ হারিয়ে যাওয়া জ্ঞানসাম্রাজ্যের ইতিহাস

হারিয়ে যাওয়া জ্ঞানসাম্রাজ্যের ইতিহাস

মিসওয়াক নবীজির প্রিয় সুন্নত

মিসওয়াক নবীজির প্রিয় সুন্নত

নজরুলের ইসলামি সংগীতে আল্লাহপ্রেমের অনুরণন

নজরুলের ইসলামি সংগীতে আল্লাহপ্রেমের অনুরণন

শিক্ষাঙ্গন হোক শিশুর নিরাপদ আশ্রয়

শিক্ষাঙ্গন হোক শিশুর নিরাপদ আশ্রয়

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম