মিসওয়াক নবীজির প্রিয় সুন্নত
Advertisement
আশিকুজ্জামান নাঈম
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সকালবেলার নরম আলোয় একজন মুমিন যখন ওজুর জন্য দাঁড়ান, তখন শুধু শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই পবিত্রতার প্রস্তুতি নেয় না; পবিত্রতার স্পর্শ লাগে মুখেও। সেই পবিত্রতার এক অনন্য সুন্নতি উপায় মিসওয়াক। ছোট্ট একটি কাঠি, অথচ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রিয় নবী (সা.)-এর জীবনের অসংখ্য আমল, পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা এবং আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহৎ পথ।
রাসূলে আকরাম (সা.)-এর অত্যন্ত প্রিয় সুন্নত ছিল মিসওয়াক। তিনি শুধু নামাজ বা ওজুর সময়ই মিসওয়াক করতেন না; বরং তাঁর দৈনন্দিন জীবনের নানা মুহূর্তে মিসওয়াকের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘মিসওয়াক মুখের পবিত্রতা ও রবের সন্তুষ্টির মাধ্যম।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৮৯)।
ওয়াসিলা ইবনুল আসকা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমাকে মিসওয়াকের আদেশ করা হয়েছে। আমার ধারণা হতে লাগল, এ সম্পর্কে আমার ওপর কুরআন নাজিল হবে বা ওহি নাজিল হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ৩১২২)।
প্রিয় নবী (সা.)-এর জীবনের ছোট-বড় নানা মুহূর্তে মিসওয়াকের ব্যবহার ছিল। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন ঘরে প্রবেশ করতেন, প্রথমে মিসওয়াক করতেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৩)।
ভাবা যায়, ঘরে প্রবেশের মতো সাধারণ একটি মুহূর্তেও তিনি মিসওয়াককে গুরুত্ব দিয়েছেন! এটি শুধু দাঁত পরিষ্কার করার অভ্যাস ছিল না; বরং পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্য ও সুন্নতের প্রতি তাঁর গভীর যত্নের প্রকাশ ছিল।
হজরত আয়েশা (রা.) আরও বলেন, ‘দিনে বা রাতে যখনই রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘুম থেকে জাগ্রত হতেন, ওজুর আগে মিসওয়াক করে নিতেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২৪৯০০)। অর্থাৎ ঘুম থেকে জেগে ওঠার পরও মিসওয়াক ছিল তাঁর অভ্যাসের অংশ। এতে বোঝা যায়, মিসওয়াককে শুধু ওজু-নামাজের একটি আনুষ্ঠানিক আমল হিসাবে দেখলে এর ব্যাপ্তি ও গুরুত্ব দুটিই সীমিত করে ফেলা হয়।
মিসওয়াকের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ গুরুত্বারোপের আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর সরাসরি নির্দেশে। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘আমি তোমাদের অধিকমাত্রায় মিসওয়াকের নির্দেশ দিয়েছি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৮৮)। আরেক হাদিসে হজরত যায়েদ ইবন খালেদ আল-জুহানি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমার উম্মতের জন্য কষ্টের আশঙ্কা না হলে তাদের ওপর মিসওয়াককে প্রত্যেক নামাজের জন্য আবশ্যক করে দিতাম।’ (সুনানে আবু দাউদ)। এ হাদিসটি মিসওয়াকের গুরুত্ব বোঝার জন্য যথেষ্ট। রাসূলুল্লাহ (সা.) উম্মতের কষ্টের কথা বিবেচনা করে আবশ্যক করেননি; কিন্তু এর প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করেছেন।
ওজু মুমিনের পবিত্রতার প্রস্তুতি। আর সেই প্রস্তুতিতে মিসওয়াকের রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমার উম্মতের ওপর যদি কষ্টের আশঙ্কা না হতো, তাহলে আমি তাদের প্রত্যেক ওজুর সময় মিসওয়াক করা আবশ্যক করে দিতাম।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ৯৯২৮)। এ হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়-ওজু শুধু হাত-মুখ ধোয়ার নাম নয়; বরং এটি বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতার প্রস্তুতি। আর মিসওয়াক সেই প্রস্তুতিকে আরও পরিপূর্ণ করে।
মিসওয়াকের আমল শুধু ওজু বা নামাজের সময়ের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর, ওজুর সময়, মসজিদে প্রবেশের আগে, দাঁত হলুদ হয়ে গেলে, মুখের গন্ধ পরিবর্তিত হলে, দীর্ঘসময় চুপ থাকার পর এবং কুরআন তিলাওয়াতের সময় মিসওয়াক করার কথা ফকিহগণ উল্লেখ করেছেন।
আমরা আধুনিকতার সব উপকারী উপকরণ গ্রহণ করব, কিন্তু তার ভিড়ে সুন্নতকে হারিয়ে ফেলব না। কারণ মুমিনের সৌন্দর্য শুধু তার পোশাকে নয়; তার জীবনের প্রতিটি ছোট আমলেও সুন্নতের ছাপ থাকা উচিত।
আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে রাসূলে আকরাম (সা.)-এর সুন্নত অনুসরণ করার এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তা ধারণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
