বুখারা থেকে সোনারগাঁ
হারিয়ে যাওয়া জ্ঞানসাম্রাজ্যের ইতিহাস
Advertisement
মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু অধ্যায় রয়েছে, যেগুলো সময়ের প্রবাহে ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে। অথচ একসময় এসব জনপদ ছিল জ্ঞান, সভ্যতা, শিক্ষা ও ইসলামি সংস্কৃতির উজ্জ্বল কেন্দ্র। সোনারগাঁ তেমনই এক বিস্মৃত গৌরবের নাম। প্রায় আটশ বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জ্ঞানপিপাসু মানুষ যে জনপদে সমবেত হতেন, সোনারগাঁ ছিল তাদের অন্যতম গন্তব্য। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে এখানে গড়ে উঠেছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র, যার খ্যাতি বাংলা ছাড়িয়ে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।
এ ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে মধ্য এশিয়ার বুখারা থেকে আগত এক জ্ঞানতাপসের নাম-শাইখ শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা (রহ.)। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট মুহাদ্দিস, ফকিহ, সুফি সাধক ও শিক্ষক। ইসলামি জ্ঞানের পাশাপাশি তার বহুমুখী জ্ঞানচর্চার কথাও ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। তার আগমন ও কর্মতৎপরতায় সোনারগাঁ তৎকালীন বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়। আজ সেই বিশাল বিদ্যাচর্চার অবকাঠামো নেই। নেই সেই দরসের মজলিস, নেই দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা শিক্ষার্থীদের কোলাহল। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে মোগরাপাড়ার দরগাবাড়ি এলাকা, আবু তাওয়ামা (রহ.)-এর সমাধি এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু প্রত্ন নিদর্শন। বাংলার মাটিতে ইসলামি জ্ঞানচর্চার সেই উজ্জ্বল অধ্যায় আজ তাই আমাদের সামনে একদিকে গৌরবের স্মৃতি, অন্যদিকে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের এক গভীর প্রশ্ন।
বুখারা থেকে বাংলার পথে
শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা (রহ.) মধ্য এশিয়ার ঐতিহাসিক নগরী বুখারায় জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন বুখারা ছিল ইসলামি জ্ঞানচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখান থেকে তিনি খোরাসানে গিয়ে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন। ইসলামি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পারদর্শিতা অর্জনের পাশাপাশি তিনি জাগতিক জ্ঞানেও আগ্রহী ছিলেন। তার পাণ্ডিত্য ও তাকওয়ার খ্যাতি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। পরবর্তীকালে জ্ঞান ও দাওয়াতের উদ্দেশ্যে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করেন। প্রায় ১২৬০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দিল্লিতে পৌঁছান বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে প্রায় এক দশক তিনি শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। এরপর দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের অনুরোধে তিনি বাংলার সোনারগাঁয়ে আসেন। প্রায় ১২৭০ খ্রিষ্টাব্দে তার সোনারগাঁয়ে আগমনের কথা বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ রয়েছে।
আবু তাওয়ামা (রহ.)-এর দিল্লি থেকে সোনারগাঁয়ে আসার কারণ নিয়ে পরবর্তীকালীন বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। কোথাও রাজনৈতিক আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে, কোথাও বাংলায় ইসলামি শিক্ষা ও দাওয়াতের প্রয়োজনীয়তাকে কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে নিশ্চিতভাবে বলা যায়-সুলতান বলবনের অনুরোধেই তিনি পরিবার ও ভাই মাওলানা হাফিজ জয়নুদ্দীনকে সঙ্গে নিয়ে সোনারগাঁয়ে আসেন।
সোনারগাঁয়ে নতুন অধ্যায়
সোনারগাঁয়ে এসে আবু তাওয়ামা (রহ.) শুধু ধর্মীয় বয়ান ও দাওয়াতের মধ্যে তার কর্মতৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি সমাজের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সুসংগঠিত জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষাব্যবস্থা। তাই তিনি এখানে একটি মাদ্রাসা ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন। এ শিক্ষাকেন্দ্রে তাফসির, হাদিস, ফিকহসহ ইসলামি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার পাশাপাশি সে সময়ের প্রচলিত জাগতিক জ্ঞানও চর্চা করা হতো। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, আবু তাওয়ামার প্রতিষ্ঠিত এ মাদ্রাসা অল্প সময়ের মধ্যেই শুধু সোনারগাঁ বা বাংলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানকেন্দ্র হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। মোগরাপাড়া অঞ্চলও তখন ইসলামি জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে আবু তাওয়ামার খানকাহ ও মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে মোগরাপাড়া একটি উল্লেখযোগ্য ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
দূরদূরান্ত থেকে জ্ঞানপিপাসুদের আগমন
আবু তাওয়ামার শিক্ষাকেন্দ্রের খ্যাতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। তার অন্যতম বিখ্যাত ছাত্র ছিলেন বিহারের প্রসিদ্ধ সুফি ও আলেম শাইখ শরফুদ্দীন ইয়াহইয়া মানেরী (রহ.)। তিনি দীর্ঘ ২২ বছর আবু তাওয়ামার কাছে অধ্যয়ন করেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
পরবর্তী বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও গবেষণামূলক লেখায় এ শিক্ষাকেন্দ্রে দূরদূরান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর সমাগমের কথা বলা হয়েছে। কিছু বর্ণনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০ হাজার বা তারও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়। তবে এ সংখ্যাটি নিশ্চিত সমসাময়িক পরিসংখ্যান হিসাবে নয়, বরং পরবর্তী ঐতিহাসিক বর্ণনা ও অনুমান হিসাবে দেখা অধিক সতর্কতাপূর্ণ।
তবে সংখ্যাটি নিয়ে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয় নিয়ে সংশয়ের অবকাশ কম-আবু তাওয়ামার মাদ্রাসা ছিল তৎকালীন বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষাকেন্দ্র এবং এর প্রভাব বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছিল।
ধর্মীয় ও জাগতিক জ্ঞানের সমন্বয়
আবু তাওয়ামার শিক্ষাদর্শের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল জ্ঞানের বহুমাত্রিকতা। তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাকেন্দ্রে শুধু ধর্মীয় বিষয়ই পড়ানো হতো না; ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি সে সময়ের বিভিন্ন জাগতিক জ্ঞানচর্চারও ব্যবস্থা ছিল। ইতিহাস তার রসায়ন, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শিতার কথা উল্লেখ করেছে এবং তার মাদ্রাসায় ধর্মীয় ও জাগতিক উভয় ধরনের শিক্ষার চর্চার কথা জানিয়েছে। পরবর্তী বিভিন্ন বর্ণনায় এ শিক্ষাকেন্দ্রে গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোল, উদ্ভিদবিদ্যা, চিকিৎসা ও অন্যান্য জ্ঞানের চর্চার কথাও পাওয়া যায়। এসব বর্ণনার সবকটিকে একই মাত্রায় নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য হিসাবে গ্রহণ না করে বলা যায়-আবু তাওয়ামার শিক্ষাব্যবস্থা ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি সে সময়ের প্রচলিত জাগতিক জ্ঞানচর্চার প্রতিও উন্মুক্ত ছিল। এখানেই সোনারগাঁয়ের শিক্ষাকেন্দ্রের ঐতিহাসিক গুরুত্ব। ইসলামি জ্ঞানকে সমাজ ও জীবনের বাস্তব প্রয়োজন থেকে বিচ্ছিন্ন না রেখে জ্ঞানের বিস্তৃত পরিসরের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্থাপনের একটি দৃষ্টান্ত এখানে দেখা যায়।
বাংলায় হাদিসচর্চার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
আবু তাওয়ামা (রহ.)-এর অন্যতম বড় অবদান ছিল বাংলায় নিয়মতান্ত্রিক ইসলামি জ্ঞানচর্চার বিকাশ। তার মাদ্রাসায় হাদিস, ফিকহ, তাফসিরসহ ইসলামি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পাঠদান করা হতো। ফলে সোনারগাঁ শুধু দাওয়াতি কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র নয়, বরং উচ্চতর ইসলামি শিক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠে। তার নামে ‘মাকামাত’ নামক তাসাউফবিষয়ক একটি গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। ফিকহবিষয়ক ফারসি পদ্যগ্রন্থ ‘নাম-ই-হক’-এর রচয়িতা হিসাবেও তার নাম পাওয়া যায়। তবে ‘নাম-ই-হক’ তার নিজের রচনা, নাকি তার কোনো শিষ্য তার শিক্ষার ভিত্তিতে গ্রন্থটি সংকলন করেছেন-এ নিয়ে ঐতিহাসিক মতভেদ রয়েছে। এ মতভেদটিও আবু তাওয়ামার জ্ঞানচর্চার ব্যাপ্তি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ইয়াহইয়া মানেরী ও উত্তরাধিকার
শাইখ ইয়াহইয়া মানেরী (রহ.) ছিলেন আবু তাওয়ামার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছাত্র। দীর্ঘদিন তার কাছে অধ্যয়ন করে তিনি পরবর্তীকালে বিহারের অন্যতম প্রসিদ্ধ সুফি-আলেম হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন। তার মতো একজন মনীষীর শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ একটি অধ্যায় সোনারগাঁয়ে অতিবাহিত হওয়া থেকেই বোঝা যায়, এ জনপদের জ্ঞানকেন্দ্রটি কতটা প্রভাবশালী ছিল।
একজন আলেমের প্রকৃত উত্তরাধিকার শুধু তার নির্মিত ভবনে নয়; তার ছাত্রদের জ্ঞান, চিন্তা, চরিত্র ও কর্মের মধ্যেই তা বেঁচে থাকে। সে অর্থে আবু তাওয়ামার সবচেয়ে বড় স্থাপনা হয়তো তার মাদ্রাসার কোনো ভবন ছিল না; বরং তার তৈরি জ্ঞানী মানুষগুলোই ছিলেন তার জীবন্ত উত্তরাধিকার।
ইন্তেকাল ও স্মৃতির অবশেষ
প্রায় তিন দশক বাংলায় অবস্থান করে আবু তাওয়ামা (রহ.) ৭০০ হিজরি বা ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দে সোনারগাঁয়ে ইন্তেকাল করেন। তাকে মোগরাপাড়ার দরগাবাড়ি এলাকায় সমাহিত করা হয়। বর্তমান দরগাবাড়ি কমপ্লেক্সকে তার খানকাহ ও মাদ্রাসার ঐতিহাসিক স্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়। তার ইন্তেকালের পরও তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাধারা কিছু সময় অব্যাহত ছিল। তার ছাত্রদের মধ্যে ইয়াহইয়া মানেরীর মতো মনীষীরা পরবর্তী সময়ে ইসলামি জ্ঞানচর্চা ও আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সোনারগাঁওয়ের সেই প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্র ধীরে ধীরে তার আগের গুরুত্ব হারায়। একসময় যে স্থানে জ্ঞানচর্চার মজলিস বসত, দূরদূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা আসত, সেখানে আজ নেই সেই বিশাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মাদ্রাসার মূল স্থাপনাও আর টিকে নেই। ছড়িয়ে থাকা কিছু প্রত্নচিহ্ন, দরগাবাড়ি এবং আবু তাওয়ামা (রহ.)-এর কবরই এখন সেই গৌরবময় অতীতের স্মৃতি বহন করছে।
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা
