নবীজির সুন্নত ‘কাইলুলা’: দুপুরের আরামদায়ক বিশ্রাম ও এর বহুমুখী উপকারিতা
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসলামি জীবনব্যবস্থা মানুষের শরীর, মন ও আত্মাকে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে প্রতিটি বিষয়ের সুন্দর দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে একটি সুন্নত হলো— দুপুরের কিছুক্ষণের বিশ্রাম বা ‘কাইলুলা’। যান্ত্রিক ও ব্যস্ততার এই যুগে অনেকেই এই চমৎকার সুন্নতটি সম্পর্কে আজ উদাসীন। অথচ প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের দৈনন্দিন রুটিনের এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিচে কাইলুলার পরিচয়, গুরুত্ব, সুন্নতি পদ্ধতি এবং এর উপকারিতা আলোচনা করা হলো।
১. কাইলুলা কী এবং রাসুল (সা.)-এর যুগের রুটিন
দুপুরের দিকে অর্থাৎ সূর্য ঢলে যাওয়ার সামান্য পূর্বে কিংবা পরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া বা হালকা ঘুমিয়ে নেওয়াকে আরবিতে ‘কাইলুলা’ বলা হয়। বিখ্যাত আরবি ভাষাবিদ ইবনুল আসীরের (রহ.) মতে, মধ্যাহ্নে শুয়ে বিশ্রাম নেওয়াই হলো কাইলুলা; সে সময় ঘুম আসুক কিংবা না আসুক, বিশ্রাম নেওয়াটাই হলো মূল বিষয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের দৈনন্দিন জীবনে এটি একটি নিয়মিত অভ্যাস ছিল। সাধারণ দিনগুলোতে তারা সাধারণত জোহরের নামাজের আগেই আহার সম্পন্ন করতেন এবং কাইলুলা করতেন। তবে জুমার দিন এই রুটিনে কিছুটা ভিন্নতা থাকত। হজরত সাহল (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
كُنَّا نُصَلِّي مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْجُمُعَةَ، ثُمَّ نَقِيلُ
‘জুমার দিন আমরা নবী কারিম (সা.)-এর সঙ্গে প্রথমে জুমার নামাজ আদায় করতাম, তারপর কাইলুলা করতাম (দুপুরের বিশ্রাম নিতাম)।’ (বুখারি ৯৪০)
বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) তার বিশ্ববিখ্যাত হাদিস ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ফাতহুল বারি’তে উল্লেখ করেছেন যে, এই বর্ণনা প্রমাণ করে কাইলুলা করা সাহাবিদের সাধারণ ও নিয়মিত অভ্যাস ছিল, কেবল জুমার দিন সময়ের ভিন্নতার কারণে এর সময়সূচিতে সামান্য পরিবর্তন আসত।
২. কাইলুলার সুমহান উপকারিতা ও শক্তির উৎস
নবীজি (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম শেষ রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন। এরপর ফজর নামাজ শেষ করে প্রয়োজনীয় কাজে ব্যস্ত হয়ে যেতেন। ফজরের পর ঘুমানোর কোনো অভ্যাস তাদের ছিল না। তাই মধ্যাহ্নের এই স্বল্পকালীন বিশ্রাম বা কাইলুলা তাদের শারীরিক ক্লান্তি দূর করে দিনের বাকি সময় কর্মতৎপর থাকতে সাহায্য করত। পাশাপাশি, রাতের বেলা তাহাজ্জুদ আদায়ের জন্য সতেজতা অর্জনেও এটি বিরাট ভূমিকা রাখত। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
قِيلُوا فَإِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَقِيلُ
‘তোমরা কাইলুলা কর; কারণ শয়তান কাইলুলা করে না।’ (আল-মুজামুল আওসাত ৩৯২১)
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) ইরশাদ করেছেন—
اسْتَعِينُوا بِطَعَامِ السَّحَرِ عَلَى صِيَامِ النَّهَارِ، وَبِالْقَيْلُولَةِ عَلَى قِيَامِ اللَّيْلِ
‘আপনারা সাহরি খাওয়ার মাধ্যমে দিনের রোজা রাখার শক্তি অর্জন করুন এবং দুপুরে কাইলুলার মাধ্যমে রাতের কিয়াম তথা তাহাজ্জুদ আদায়ের শক্তি লাভ করুন।’ (ইবনে মাজাহ ১৬৯৩, ইবনে খুজাইমা)
৩. দিনের বিভিন্ন সময়ের ঘুমের প্রভাব
দিনের কোন সময়ে ঘুমানো উপকারি আর কোন সময়ে ক্ষতিকর, সে বিষয়ে প্রখ্যাত তাবেয়ি হজরত খাওয়ার ইবনে জুবাইর (রা.) চমৎকার একটি অনুসিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তিনি বলেন—
সকালবেলার ঘুম: দিনের প্রথম ভাগের ঘুম মানুষের মানসিক প্রফুল্লতা ও বরকত জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়।
মধ্যাহ্নের ঘুম (কাইলুলা): এটি একটি অত্যন্ত উত্তম স্বভাব ও সুন্নত, যা শরীরকে সতেজ করে।
শেষভাগের ঘুম (আসরপরবর্তী ঘুম): দিনের শেষভাগের এই ঘুম মানুষের মধ্যে বুদ্ধিহীনতা বা নির্বুদ্ধিতা তৈরি করতে পারে।
৪. খাবার ও কাইলুলার সঠিক সম্পর্ক
অনেকের মাঝে এই ভুল ধারণা রয়েছে যে, খাওয়ার পরপরই ঘুমানো বুঝি কাইলুলা। আসলে তা নয়। কাইলুলা হলো মূলত দিনের মধ্যভাগের একটি বিশ্রাম, খাওয়ার পরবর্তী অলসতা নয়। মধ্যাহ্নের আগে বা পরে কিছুক্ষণ শুয়ে বিশ্রাম নিলেই এই সুন্নত আদায় হয়ে যায়।
প্রখ্যাত গবেষক ও লেখক ডাক্তার মুহাম্মদ আবদুল হাই (রহ.) তাঁর ‘উসওয়ায়ে রাসুল আকরাম (সা.)’ গ্রন্থে লিখেছেন, সুযোগ ও অবসর থাকলে সুন্নতের অনুসরণের নিয়তে দুপুরে খাবারের পর কিছুক্ষণ শুয়ে থাকা বা বিশ্রাম নেওয়া উত্তম। এটিকে কাইলুলা বলা হয়। তবে এই আমলের জন্য গভীর ঘুম শর্ত নয়, কেবল শুয়ে বিশ্রাম নিলেই সুন্নত আদায় হয়ে যাবে।
কাইলুলা কেবল একটি শারীরিক বিশ্রামের নাম নয়, এটি প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি সুমহান সুন্নত। এই সুন্নত অনুসরণের মাধ্যমে আমরা যেমন শারীরিক ক্লান্তি দূর করে দৈনন্দিন কাজে উদ্যম ফিরে পেতে পারি, তেমনি পরকালের পাথেয় তাহাজ্জুদ আদায়ের শক্তিও অর্জন করতে পারি। তাই ব্যস্ততার মাঝেও কিছুটা সময় বের করে এই বরকতময় সুন্নতটি আমাদের জীবনে চর্চা করা উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নতের ওপর আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

