আলোচিত সিনহা হত্যা মামলার রায় আজ
Advertisement
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলার রায় আজ। ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের টেকনাফের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে সিনহা নিহত হন। হত্যা মামলা হওয়ার পর ২০২১ সালের ২৭ জুন বিচার শুরু হয়। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের শেষ দিন ১২ জানুয়ারি কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত মোহাম্মদ ইসমাইল এ রায়ের দিন ধার্য করেন।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে সিনহা মো. রাশেদ খান নিহত হন। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় দুটি ও রামু থানায় একটি মামলা করে। সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং মাদক আইনে এসব মামলা করা হয়। টেকনাফ থানার দুই মামলায় সিনহার সঙ্গী সাইদুল ইসলাম সিফাতকে আসামি করা হয়। আর রামু থানায় মাদক আইনে করা মামলায় সিনহার অপর সফরসঙ্গী শিপ্রা দেবনাথকে আসামি করা হয়।
সিনহা হত্যার ৫ দিন পর ৫ আগস্ট কক্সবাজার আদালতে সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস হত্যা মামলা করেন। এ মামলায় টেকনাফ থানার বহিষ্কৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ পুলিশের ৯ সদস্যকে আসামি করা হয়। লিয়াকতকে প্রধান আসামি করা হয়। অন্য আসামিরা হলেন- বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কনস্টেবল কামাল হোসেন, কনস্টেবল আবদুল্লাহ আল মামুন, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) লিটন মিয়া, উপ-পরির্দশক (এসআই) টুটুল ও কনস্টেবল মোহাম্মদ মোস্তফা। চারটি মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাব।
৬ আগস্ট অভিযুক্ত নয় পুলিশ সদস্যের মধ্যে সাতজন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পুলিশের করা মামলার তিন সাক্ষী টেকনাফের মারিশবুনিয়া এলাকার নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আয়াজ ও নিজাম উদ্দিনকে ১১ আগস্ট গ্রেফতার করা হয়। ১৮ আগস্ট এপিবিএনের তিন সদস্য সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) শাহজাহান মিয়া, কনস্টেবল মো. রাজীব ও কনস্টেবল আব্দুল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর কনস্টেবল রুবেল শর্মাকে গ্রেফতার করে র্যাব। কারাগারে থাকা ১৪ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্ত কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে ওসি (বহিষ্কার) প্রদীপ ও কনস্টেবল রুবেল শর্মা ছাড়া অন্যরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ২০২১ সালের ২৪ জুন কনস্টেবল সাগর দেব আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।
১৩ ডিসেম্বর র্যাব-১৩ কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) খাইরুল ইসলাম ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। একইদিন পুলিশের করা তিনটি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এসব মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে আদালত সিফাত ও শিপ্রাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন। ৩১ ডিসেম্বর অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আদালত পলাতক কনস্টেবল সাগর দেবের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তামান্না ফারাহর আদালত থেকে মামলাটি জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেনের আদালতে বদলি করা হয়।
২৭ জুন আদালত ১৫ আসামির বিরুদ্ধে বিচারকাজ শুরুর আদেশ দেন। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে আদালতের বিচার কার্যক্রম স্থগিত থাকায় ধার্য দিনগুলোতে সাক্ষ্যগ্রহণ সম্ভব হয়নি। এরপর ২৩ আগস্ট থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮ দফায় ৮৩ জনের মধ্যে ৬৫ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। ৬ ও ৭ ডিসেম্বর আসামিরা ফৌজদারি কার্যবিধি ৩৪২ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দেন। ৯ থেকে ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত মামলায় উভয়পক্ষের আইনজীবীরা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের শেষ দিনে আদালত ৩১ জানুয়ারি (আজ) মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম। আর আসামিদের পক্ষে প্রধান কৌঁসুলি ছিলেন অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত।
পিপি ফরিদুল আলম বলেন, হত্যার বিষয়টি প্রমাণে আমরা সক্ষম হয়েছি। আমাদের আশা সর্বোচ্চ শাস্তি পাবেন ওসি প্রদীপ ও অভিযুক্তরা। স্বল্প সময়ে সিনহা হত্যার রায় দেশে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অপকর্ম জেনে যাওয়ায় সিনহাকে হত্যা করেন ওসি প্রদীপ : ওসি প্রদীপ ও তার পেটোয়া বাহিনীর নানা অপকর্ম সিনহা মো. রাশেদ জেনে যাওয়ায় তাকে হত্যার ছক কষা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী সিনহাকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে তথ্য উঠে এসেছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, মেজর পদ থেকে স্বেচ্ছায় অবসরের পর ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে দেশিয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে কাজ করছিলেন সিনহা। এজন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে তিনি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করছিলেন। টেকনাফে গিয়ে তিনি প্রদীপ ও তার পেটোয়া বাহিনীর নানা অপকর্ম জেনে ফেলেন। এসব তথ্য ফাঁস হলে নিজের পেশাগত জীবনের ক্ষতি হতে পারে-এমন আশঙ্কা থেকে তাকে হত্যা করেন ওসি প্রদীপ।
অভিযোগপত্রের ১২ পৃষ্ঠার তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়-ওসি প্রদীপের হুমকির বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব না দিয়ে সিনহা এবং তার সঙ্গীরা নীলিমা রিসোর্টে অবস্থান করে প্রামাণ্যচিত্রের কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। এ সময় প্রদীপের সন্দেহ হয়-সেনাবাহিনীর সাবেক অফিসার পরিচয় দিয়ে সিনহা টেকনাফ থানা এলাকায় তার নানা কুকর্ম জেনে গেছেন। তার কুকর্মের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে সিনহা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের লোকজনের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করছেন। এসব অপকর্ম প্রকাশ পেলে চাকরির বড় ক্ষতি হবে অনুধাবন করে বিষয়টি প্রদীপ বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে জানান। নির্যাতনে ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়িতে সাদা পোশাকে পুলিশ পাঠিয়ে এবং সিনহার টিমের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেন প্রদীপ। এরই ধারাবাহিকতায় পরিকল্পিতভাবে সিনহা মো. রাশেদকে হত্যা করা হয়। অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘পরিকল্পিত ঘটনা’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার বাদী ও সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বলেন, সিনহাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। প্রধান দুই আসামি প্রদীপ-লিয়াকতের সর্বোচ্চ সাজা চান তিনি। বাকি আসামিদের সাজা অপরাধের ভিত্তিতে হোক। তিনি আরও বলেন, আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত হলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হবে। এ রায়ের মাধ্যমে দেশের মানুষ জানবে-অপরাধী যে-ই হোক না কেন অপরাধ করলে শাস্তি ভোগ করতেই হবে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মুনীর উল গিয়াস বলেন, সিনহা হত্যা মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে কড়া নিরাপত্তা থাকবে। মোতায়েন করা হবে অতিরিক্ত ফোর্স। বিচার চলাকালে আদালত প্রাঙ্গণে সর্বসাধারণের চলাচল সীমিত রাখা হবে। সিনহা হত্যা মামলার ১৫ আসামি কক্সবাজার কারাগারে আছেন। সকালে তাদের আদালতে আনা হবে।
সিনহা হত্যা মামলার রায় শুনতে টেকনাফের জাদিমুরার ফরিদুল আলম কক্সবাজার এসেছেন। তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ী অভিযোগ তুলে প্রদীপের নেতৃত্বে পুলিশ তার এক ভাইকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ক্রসফায়ারে হত্যা করেন।
সিনহা হত্যার রায় উপলক্ষ্যে কক্সবাজারে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরাও এসেছেন।
