একান্ত সাক্ষাৎকারে আইজিপি
জনবান্ধব পুলিশ গড়াই প্রধান লক্ষ্য
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রভাব, বিতর্ক এবং ২০২৪ সালের আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ পুলিশ। ভঙ্গুর চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অপরাধ দমন, থানাকে জনবান্ধব করা ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে বর্তমান পুলিশ প্রশাসন।
দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা, বিতর্কিত ও পলাতক পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনাসহ নানা বিষয় নিয়ে যুগান্তরকে একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিজ কার্যালয়ে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি খোলামেলা কথা বলেছেন নানা স্পর্শকাতর বিষয়ে। যুগান্তরের পাঠকদের জন্য চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো-
যুগান্তর : রাজধানীর মোহাম্মদপুরসহ অপরাধের হটস্পটগুলো নিয়ে কী ভাবছেন?
আইজিপি : আমি আইজিপি হিসাবে যোগদানের পর থেকেই অপরাধের হটস্পটগুলোতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনছি। কিন্তু তারা অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বের হয়ে আসছে। বের হওয়ার পর ফের অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। অপরদিকে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালীরা অল্পবয়সিদের ব্যবহার করছে। প্রভাবশালীরাও তালিকাভুক্ত হচ্ছে। সবার বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যুগান্তর : খুলনায় রাতে পুলিশ সদস্যদের একা না চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদেরই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা?
আইজিপি : খুলনার বিষয়টি দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নয়। সেখানে যৌথ অভিযান হচ্ছে। এসপি বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছেন। দেশে এখন নিরাপত্তাজনিত কোনো সমস্যা নেই।
যুগান্তর : দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না কেন?
আইজিপি : বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা খুবই কম। অনেকের মধ্যে আইন না মানার প্রবণতা আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে সবাইকে আইন মানার পাশাপাশি দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
যুগান্তর : বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন? স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনটি?
আইজিপি : ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ পুলিশ একটি কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। সেই পরিস্থিতি থেকে বাহিনী এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ সদস্যরা এখন আত্মবিশ্বাস ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমরা সার্বিক নিরাপত্তা, অপরাধের ধরন, জননিরাপত্তা, জনজীবনের স্বাভাবিকতা এবং জনগণের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিচ্ছি।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণ, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও সহিংসতা প্রতিরোধ, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত উত্তেজনা প্রশমন এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে গুজব ও অপতথ্যের বিস্তার রোধ, দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কার্যকর ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।
যুগান্তর : সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, দখল-পালটা দখল এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বাড়ার বিষয়ে পুলিশের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ কী?
আইজিপি : সংঘটিত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য আইনসম্মত উপায়ে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ চলছে। অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। স্পষ্টভাবে বলতে চাই, অপরাধ দমনে পুলিশের পদক্ষেপ হবে পেশাদার, নিরপেক্ষ ও আইনানুগ। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং জনগণের সহযোগিতায় সংঘাতের ঝুঁকি কমানো ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
যুগান্তর : দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নানা ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে যে দ্বিধা তৈরি হয়েছিল, তা থেকে আস্থা ফিরিয়ে আনতে কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন?
আইজিপি : ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলন চলাকালে পুলিশের কিছু সদস্যের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ পুলিশ ও জনগণের মধ্যকার সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার ও জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে আমরা পেশাদারত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং মানবিক আচরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।
দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, মানবাধিকার সমুন্নত রাখা, নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করা এবং রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থেকে সবার জন্য সমানভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করে যাচ্ছি। থানায় আগত সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে শোনা, ভুক্তভোগীদের সহায়তা প্রদান এবং পুলিশি সেবাকে আরও সহজ ও জনবান্ধব করাও আমাদের অগ্রাধিকার।
পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা কথার মাধ্যমে নয়, কাজের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনতে হবে। অতীতের ভুল পদক্ষেপগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে, দায়িত্বশীল আচরণ, নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে সেই আস্থা আমরা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ পুলিশকে ভয় নয়, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসাবে দেখবেন।
যুগান্তর : দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও নানা বিতর্কের মুখে থাকা পুলিশ বাহিনীকে একটি নিরপেক্ষ ও পেশাদার বাহিনীতে রূপান্তর করতে আপনার প্রধান কৌশলগুলো কী?
আইজিপি : পুলিশকে নিরপেক্ষ, পেশাদার ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে আমরা নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ ও কর্মমূল্যায়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায্যতাকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো-ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে আইন, বিধিবিধান ও স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। এ ক্ষেত্রে পুলিশে ফিট লিস্টভিত্তিক মূল্যায়ন ও প্রাথমিক বাছাই প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে।
জেলা পুলিশ সুপারসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের যোগ্যতা ও প্রাসঙ্গিক মানদণ্ড মূল্যায়নের জন্য ফিট লিস্ট কমিটির মাধ্যমে কাজ করা হচ্ছে। এই ফিট লিস্ট কমিটি নির্ধারিত কার্যপরিধির মধ্যে স্বাধীনভাবে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করছে। এর উদ্দেশ্য হলো-সঠিক কর্মকর্তাকে সঠিক দায়িত্বে পদায়ন করা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ভালো কাজের যথাযথ স্বীকৃতি এবং অপরাধ বা অসদাচরণের ক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
যুগান্তর : মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়ন, কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি এবং কাজের মান নিশ্চিত করতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?
আইজিপি : মানসিক চাপ মোকাবিলা, পেশাগত হতাশা হ্রাস, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং দায়িত্ব পালনে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিং এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে কর্মপরিবেশের উন্নয়ন, দায়িত্ব ও কর্মঘণ্টার যথাযথ ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও লজিস্টিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে সদস্যদের পেশাগত উদ্দীপনা বাড়ানোর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, পুলিশ সদস্যদের জন্য এমন একটি পেশাগত পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে তারা মানসিকভাবে দৃঢ়, দায়িত্বশীল, দক্ষ ও মানবিক থেকে জনগণকে সর্বোত্তম সেবা দিতে সক্ষম হবেন।
যুগান্তর : বিগত সময়ে পদবঞ্চিত বা ক্ষতিগ্রস্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের পুনর্মূল্যায়ন এবং চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের পরিকল্পনা কী?
আইজিপি : অতীতে কোনো কর্মকর্তা পদোন্নতি, পদায়ন, বদলি কিংবা অন্য কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বৈষম্য বা অনিয়মের শিকার হয়ে থাকলে, প্রযোজ্য বিধিবিধান ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের ভিত্তিতে তার বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কর্মকর্তার জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা, বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন, চাকরির রেকর্ড, শৃঙ্খলাজনিত তথ্য এবং প্রাসঙ্গিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পুলিশের প্রশাসনিক কাঠামো ও স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিভিন্ন ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে মাঠপর্যায়ে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দায়িত্ব বণ্টন এবং প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে বর্তমানে একটি শক্তিশালী চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
যুগান্তর : মাদক, কিশোর গ্যাং, সাইবার অপরাধ এবং সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধ দমনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে বিশেষ কোনো প্রকল্প বা রোডম্যাপ হাতে নেওয়া হয়েছে কিনা?
আইজিপি : অপরাধ দমনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়, ডিজিটাল ফরেনসিক, সিসিটিভি ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত উপকরণের কার্যকর ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সাইবারসংক্রান্ত অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট গঠন করা হয়েছে।
সাইবার পুলিশ ইউনিটে অত্যাধুনিক ও কার্যকরী প্রযুক্তির ব্যবহার ও দক্ষ জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তথ্যের নিরাপত্তা ও আইনগত সুরক্ষা বজায় রেখে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগাম ঝুঁকি শনাক্ত করে অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
যুগান্তর : সাধারণ মানুষ যাতে মামলা, জিডি বা থানায় সেবা নিতে এসে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে থানার পরিবেশ উন্নত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
আইজিপি : থানায় অভিযোগ গ্রহণ ও সেবা প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ করা; সেবাপ্রত্যাশীদের সঙ্গে সৌজন্যপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করা; নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা প্রদান এবং সেবার মান নিয়মিত তদারকির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রতিটি জেলায় একটি থানাকে ‘জিরো কমপ্লেইন’ থানা হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। থানায় প্রদত্ত সেবা আরও কার্যকরভাবে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং কোনো অনিয়মের অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে থানাকে জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা আমাদের লক্ষ্য।
যুগান্তর : সভা-সমাবেশ বা আন্দোলনের ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ না করে আধুনিক ও মানবিক উপায়ে ক্রাউড কন্ট্রোলের জন্য নতুন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কি?
আইজিপি : এ ক্ষেত্রে আইনসম্মত, মানবিক ও পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা হচ্ছে। যে কোনো পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা ও সর্বোচ্চ সংযমের নীতি গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। বলপ্রয়োগ একান্ত প্রয়োজন হলে তা আইনসম্মত, পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত নয়-এটি নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের মানবাধিকার, সংঘাত নিরসন, উত্তেজনা প্রশমন এবং আধুনিক জনসমাগম ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হলো-জননিরাপত্তা বজায় রেখে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত এড়ানো এবং নাগরিকের অধিকার যথাসম্ভব সুরক্ষিত রাখা।
যুগান্তর : তথ্য পাচারকারী পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
আইজিপি : যেসব পুলিশ সদস্য চাকরিতে থেকে ভেতরের তথ্য বাইরে পাচার করছে, তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এরই মধ্যে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অতীতে যেসব পুলিশ সদস্য দলীয় লেজুড়বৃত্তি করেছেন তারা এখন পলাতক। পলাতক পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কর্মরত যাদের যোগাযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যুগান্তর : ষড়যন্ত্রকারী পুলিশ সদস্যদের বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
আইজিপি : পুলিশে ষড়যন্ত্রকারীর সংখ্যা হাতেগোনা। কোনো ষড়যন্ত্রকারীই আইনের বাইরে থাকবে না। গুজব ছড়ানো হচ্ছে-ফ্যাসিবাদ আমলের ১৭ বছরে যাদের নিয়োগ হয়েছে, তাদের চাকরি থাকবে না। এ ধরনের গুজব যারা ছড়াচ্ছে তাদেরও চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যুগান্তর : মাঠ পুলিশের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
আইজিপি : কোনো গুজব, মিসইনফরমেশন ও ষড়যন্ত্রে কান না দিয়ে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করুন। অনিচ্ছাকৃত কোনো ভুল হলে দায়মুক্তি পাবেন। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে অপেশাদার কাজে জড়িত হলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ইতঃপূর্বে যারা ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে টেলিসংলাপে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ থেকে সবাইকে শিক্ষা নিতে হবে। এক সময় মাদকের স্পট থেকে টাকা নেওয়া হতো। টাকার বিনিময়ে আসামি ছেড়ে দেওয়া হতো। এখন এসব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
যুগান্তর : ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির আশঙ্কা আছে কি?
আইজিপি : নিষিদ্ধ সংগঠন এর আগে বেশ কয়েকবার দেশকে অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। তাদের সেই সক্ষমতা নেই। তারা অনলাইনে যে ধরনের প্রচারণা চালাচ্ছে তাতে জনগণ কান দিচ্ছে না। সুতরাং দেশে ডিসেম্বরকেন্দ্রিক কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই।
যুগান্তর : দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সার্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আগামী দিনগুলোতে পুলিশ কীভাবে স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখবে?
আইজিপি : বাংলাদেশ পুলিশ আইনানুগ, নিরপেক্ষ, পেশাদার এবং জনস্বার্থকেন্দ্রিক ভূমিকা পালন করবে। লক্ষ্য অর্জনে অপরাধপ্রবণ এলাকা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, উসকানিমূলক অপতথ্য ও সাইবারভিত্তিক অপরাধের বিষয়ে আইনানুগ পদক্ষেপ এবং কমিউনিটি ও বিট পুলিশিং ব্যবস্থা জোরদারের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন সহিংসতা, ভয়ভীতি, অবৈধ দখল কিংবা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতার কারণ না হয়, সে জন্য আইন অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
যুগান্তর : ১৫তম বিসিএসের পর দীর্ঘ পুলিশ জীবনের অভিজ্ঞতা এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকালে আপনার রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় অর্জন বা ছাপ কোনটি দেখতে চান?
আইজিপি : একজন পুলিশ কর্মকর্তার সাফল্য শুধু কতটি অভিযান পরিচালিত হলো বা কতটি অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটিত হলো, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সাফল্য হলো-তার দায়িত্ব পালনের ফলে প্রতিষ্ঠানটি কতটা দক্ষ, পেশাদার, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব হয়ে উঠল এবং ভবিষ্যতের জন্য কতটা কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রেখে যাওয়া গেল।
আমার সবচেয়ে বড় অর্জন হবে, দায়িত্ব শেষে যখন ফিরে তাকাব, তখন যদি বলতে পারি-আমি এমন একটি পুলিশ সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পেরেছি, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্ব, ভয়ের চেয়ে আস্থা এবং আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে জনসেবা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। জনগণের সর্বোচ্চ বিশ্বাস অর্জন এবং একটি উন্নত, মানবিক ও দায়িত্বশীল পুলিশ বাহিনী গঠনে অবদান রাখাই হবে আমার দীর্ঘ কর্মজীবনের সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার।

