ঋণের জটিল ফাঁদ
Advertisement
মনির হোসেন
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশে স্থবির অর্থনীতিতে ঋণের চাকাই কেবল সচল। সংকট মোকাবিলায় যেন ভরসা হয়ে উঠেছে ঋণের বোঝা। প্রতিবছর ঋণের সুদ পরিশোধেই লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে। বর্তমানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে বাংলাদেশের ঋণ ২২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা।
এই ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ। মাথাপিছু সরকারি ঋণ ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা। অর্থনৈতিক দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া। কিন্তু দেশ দুটির তুলনায় জিপিডির অনুপাতে বাংলাদেশের ঋণ ১০ শতাংশেরও বেশি।
এমন বাস্তবতা সামনে রেখে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এরই মধ্যে ঋণের ফাঁদে পড়েছে দেশ। তারপরও আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর কাছে আরও ১২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ চেয়েছে সরকার। অর্থাৎ, অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় সরকার ঋণকেই একমাত্র বিকল্প হিসাবে দেখছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সমস্যা শুধু ঋণের অঙ্কেই নয়, ঋণ শোধের সক্ষমতায়ও রয়েছে। উন্নয়নের নামে যে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, সেই ঋণ কতটা উৎপাদন বাড়াচ্ছে, কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করছে-এর বিজ্ঞানভিত্তিক মূল্যায়ন নেই। একদিকে রাজস্ব ঘাটতি, অন্যদিকে স্থবির বিনিয়োগ। অর্থনীতির চাকা যখন ধীর, তখন ঋণের চাকা ছুটছে দুরন্ত গতিতে। সঠিকভাবে এর ব্যবস্থাপনা করতে ব্যর্থ হলে এই ঋণ ভবিষ্যতের জন্য ভয়ংকর ফাঁদ তৈরি করবে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতির অবস্থা বেশ খারাপ। বিনিয়োগ স্থবির, জ্বালানি সংকট, সরকারের আয় কমছে এবং খেলাপি ঋণ বাড়ছে। শেখ হাসিনার আমল থেকে এই অধোগতি শুরু। বর্তমান সরকারেরও আয় বাড়ছে না; কিন্তু খরচ করতে হচ্ছে। আমার বিবেচনায় ইতোমধ্যে দেশ ঋণের ফাঁদে পড়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে।
তিনি আরও বলেন, ঋণ পরিশোধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। বরং সাম্প্রতিক সময়ে আরও খারাপ অবস্থা দেখা যাচ্ছে। যেমন: মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বাড়ছে না। কিন্তু মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। অর্থনীতির জন্য এটি ভয়ংকর। এর ফলে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বাড়ে, বৈষম্য সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতির উন্নয়নে দ্রুত কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যমুনা সেতুর শেয়ার বিক্রি এবং বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের মতো বড় প্রকল্প ইজারা দিতে হবে বলে আমি মনে করি। এতে সরকারের হাতে কিছু টাকা আসবে।
২০০৮-০৯ অর্থবছরে আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতা নেয়, তখন সরকারের ঋণ ছিল ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে প্রায় ১৯ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছায়। অর্থাৎ ১৬ বছরে আ.লীগ সরকার প্রায় সাড়ে ১৬ লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থ বিভাগের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশীয় ঋণ ১২ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণ ৯ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। ওই ১৬ বছরে ঋণের অঙ্ক বেড়েছে কয়েক গুণ।
আইএমএফ-এর হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের ঋণ ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ। সংস্থাটির মূল্যায়নে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কারণ হিসাবে দুর্বল রাজস্ব আহরণ, সুদের বাড়তি ব্যয় এবং দেশীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা উঠে এসেছে। অন্যদিকে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া। আলোচ্য সময়ে জিডিপির অনুপাতে ভিয়েতনামের ঋণ ৩২ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ায় ২০ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বরছেন, এসব কারণে ঋণের সুদ মেটাতেই বাড়ছে বাজেটে চাপ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সুদ পরিশোধের ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। তাদের মতে, ঋণের টাকায় উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় না বাড়লে সামনে ভয়ংকর বিপদ আছে। তাদের মতে, এর সমাধান ঋণ নেওয়া বন্ধ করা নয়, ঋণের ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা।
কর ফাঁকি বন্ধ, করের আওতা বাড়ানো, অপচয়ী প্রকল্প বাদ দেওয়া এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিকল্প নেই। এসব ঋণ উন্নয়নের সিঁড়ি হবে, নাকি অর্থনীতির গলার ফাঁস-সেই সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে। শ্রীলংকা একসময় বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও ঋণ সংকটে পড়েছিল। কিন্তু ঋণ পুনর্গঠন, আর্থিক শৃঙ্খলা ও অর্থনীতিতে সংস্কারের কারণে উত্তরণ হয়েছে। আফ্রিকার দেশ ঘানাও বড় ঋণ সংকটে পড়েছিল। পরে দেশটি ঋণ পুনর্গঠন করে। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনে।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, সরকারের উচ্চঋণের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করেছে। বিপরীতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে দেশি ও বিদেশি ঋণ নিতে হবে। বিশেষ করে এডিপি বাস্তবায়নে ঋণের ওপর নির্ভরতা বেশি। চলতি বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ৩ লাখ কোটি টাকা। বাজেটের হিসাবে রাজস্ব দিয়ে নিয়মিত ব্যয় মেটানোর পর উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশই ঋণের মাধ্যমে জোগান দিতে হবে।
সরকারি সূত্র বলছে, বর্তমানে রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। বিদায়ি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে এনবিআর। বিপরীতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ৪৬ শতাংশ। অথচ দেশের অর্থনীতির বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা ঋণ নেয়।
ওই বছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও যা ৪৭ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা বেশি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশি ঋণের সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই সুদ পরিশোধে যে অর্থ লাগবে, তা মোট বাজেটের প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
এদিকে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা নিয়ে বরাবরই উদ্বেগ জানিয়ে আসছে আইএমএফ। সংস্থাটির সবশেষ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সরকারি ঋণ ও বৈদেশিক ঋণ-দুটিই মাঝারি মানের ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ছে। সংস্থাটি আরও বলেছে, রাজস্ব আয় বাড়ানোই ঋণের চাপ কমানোর অন্যতম প্রধান পথ। এছাড়াও আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করা এবং বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, বর্তমানে দেশের ঋণ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তবে এ পরিস্থিতি একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিনে পুঞ্জীভূত হয়েছে। আগে যেসব ঋণ নেওয়া হয়েছিল, তা সঠিক কাজে খরচ না করে লুটপাট ও অপচয় করায় এমনটি হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। এটি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে না পারলে দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপয় কী-এর জবাবে তিনি বলেন, সবার আগে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, আগামী দিনে শুধু উৎপাদনশীল খাত ছাড়া অন্য কোনো খাতে (যেমন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন) নতুন ঋণ নেওয়া যাবে না। তৃতীয়ত, দুর্নীতি ও অর্থের অপচয় কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।
প্রতিবছর বাজেটের ঘাটতি পূরণেও নতুন ঋণ নিতে হচ্ছে। আবার আগের ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে সরকারের অর্থের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা এটিকে ঋণের ফাঁদ বলছেন। ২০২৭ থেকে কিস্তির চাপ বাড়বে। সরকারি হিসাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে পরিশোধ করতে হবে প্রায় ৪ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার।
২০২৭-২৮ অর্থবছরে এই পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৫ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। ২০২৮-২৯ অর্থবছরে তা ৭ দশমিক ৫৬৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ আগামী কয়েক বছরে শুধু বিদেশি ঋণ পরিশোধের জন্যই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হবে।
