Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

তানভীর-জেসমিনসহ ৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

‘মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত ছিল’

হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারি মামলার রায়: সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ৮ আসামিকে ৫-১৭ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা

Icon

মহিউদ্দিন খান রিফাত

প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

‘মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত ছিল’

Advertisement

হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. তানভীর মাহমুদ ও তার স্ত্রী কোম্পানির চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামসহ ৯ জনকে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সোনালী ব্যাংক-হলমার্ক ঋণ জালিয়াতির এক মামলায় এ কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাদের ৫ কোটি টাকা জরিমানাও করা হয়। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেছেন, হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারি দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে এক বিস্ময়কর ঘটনা। যে অপরাধীরা দেশের জনগণের আমানত, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, দেশের অর্থনীতিকে খেলা মনে করে তাদের মৃত্যুদণ্ডের মতো সাজা হওয়া উচিত। কিন্তু যে আইনে মামলা হয়েছে তাতে সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

যাবজ্জীবন দণ্ডিত অন্য সাত আসামি হলেন-তানভীরের ভায়রা ও হলমার্ক গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) তুষার আহমেদ, টি অ্যান্ড ব্রাদার্সের পরিচালক তসলিম হাসান, ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের মালিক মীর জাকারিয়া, প্যারাগন গ্রুপের এমডি সাইফুল ইসলাম রাজা, সাইফুল হাসান, নকশী নিটের এমডি মো. আবদুল মালেক ও আবদুল মতিন। বর্তমান বিধি অনুযায়ী যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ ৩০ বছর।

অপরদিকে রায়ে সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হুমায়ুন কবিরসহ (পলাতক) আরও ৭ আসামিকে ৫ বছর থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন-সাভারের হেমায়েতপুরের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. জামাল উদ্দিন সরকার, সোনালী ব্যাংক ধানমন্ডি শাখার জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুন্নেসা মেরি, সোনালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের সাবেক মহাব্যবস্থাপক ননী গোপাল নাথ ও মীর মহিদুর রহমান, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মাইনুল হক, উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) সফিজউদ্দিন এবং এজিএম মো. কামরুল হোসেন খান। এরমধ্যে জামাল উদ্দিনকে ৫ বছর কারাদণ্ড দেন আদালত। সোনালী ব্যাংকের সাবেক এমডিসহ বাকি ৭ আসামিকে পৃথক দুই ধারায় ১৭ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মঙ্গলবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১ এর বিচারক মো. আবুল কাশেম আলোচিত এ রায় ঘোষণা করেন।

রায় ঘোষণার আগে কারাগার থেকে তানভীর ও জেসমিনসহ বন্দি আসামিদের এজলাসে হাজির করা হয়। রায় শোনার পর আধা ঘণ্টা মাথা নিচু করে বসে থাকেন তানভীর ও জেসমিন দম্পতি। তারা নিজেরাও এ সময় কেউ কারও সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। তানভীরের ভায়রাও ছিলেন নিশ্চুপ।

জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে ২০১২ সালে ৪ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় পৃথক একটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলায় জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের হোটেল শেরাটন শাখা (বর্তমানে রূপসী বাংলা) থেকে ৫২৫ কোটি ৬২ লাখ ৯২ হাজার ৮০০ টাকা ঋণের নামে নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয় আসামিদের বিরুদ্ধে। এতে পরস্পরের যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থের অপব্যবহার, প্রতারণা, জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয় আসামিদের বিরুদ্ধে। মামলার তদন্ত করে আসামিদের বিচারের জন্য আদালতে চার্জশিটও দেয় দুদক।

দুদকের তদন্ত সূত্র বলছে, সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখার এমডি, ডিএমডিসহ শাখা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে রূপসী বাংলা (সাবেক শেরাটন) হোটেল শাখা থেকে হলমার্ক মোট ২ হাজার ৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে। এর মধ্যে স্বীকৃত বিলের বিপরীতে দায় (ফান্ডেড) অর্থ হচ্ছে ১ হাজার ৫৬৮ কোটি ৪৯ লাখ ৩৪ হাজার ৮৭৭ টাকা। এ ঘটনায় ২০১২ সালের ৪ অক্টোবর রমনা থানায় মামলা করে দুদক। তদন্ত শেষে ২০১৩ সালের ৭ অক্টোবর ১১টি মামলায় হলমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ, তার ভায়রা তুষার আহমেদসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়। পরে ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত ২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ও ২৭ মার্চ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। এই ১১টি মামলা বিচারের জন্য ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১-এ বদলি করা হয়। ১১টি মামলার মধ্যে মঙ্গলবার একটি মামলার রায় ঘোষণা করা হলো। এটিই হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারি মামলায় দেওয়া প্রথম কোনো রায়। বাকি ১০ মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

সোনালী ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবী মো. জাহাঙ্গীর যুগান্তরকে বলেন, হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় ১১টি মামলার মধ্যে একটির রায় হয়েছে। রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। বাকি যে ১০টি মামলা রয়েছে সেগুলোও একই ধরনের অভিযোগ। সে মামলাগুলোতেও আসামিদের যাবজ্জীবন সাজা হবে আশা করি।

দুদকের আইনজীবী মীর আহমেদ আলী সালাম বলেন, মামলার সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়া হয়েছিল। আদালত সবকিছু পর্যালোচনা করে রায় দিয়েছেন। তিনি হলমার্কের মতো একটি অস্তিত্বহীন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণের নামে সোনালী ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ তুলে দেওয়ার ঘটনাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দুর্গতি হিসাবে উল্লেখ করেন। বলেন, এ ধরনের দুর্গতি হলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে। আইন অনুযায়ী সাজা মৃত্যুদণ্ড থাকলে আদালত তাই দিতেন বলে বিচারক রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন বলে জানান তিনি।

এদিকে, রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় সঠিক হয়নি। রায়ে ব্যাংকারদের সাজা কম দিয়েছেন বিচারক। অথচ ব্যাংকের বাইরের আসামিদের যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টে আপিল করে ন্যায়বিচার পাব আশা করি।

মামলাটির পেছনের ঘটনা : হলমার্ক গ্রুপের এমডি তানভীর মাহমুদ, চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম হলমার্ক গ্রুপের কর্মচারী মীর জাকারিয়াকে ম্যাক্স স্পিনিং মিলের মালিক সাজিয়ে সোনালী ব্যাংকের হোটেল শেরাটন শাখায় ২০১১ সালে একটি হিসাব খোলেন। এতে কোনো মাস্টার এলসির অস্তিত্ব ছাড়াই মিথ্যা আইবিপি নম্বর ব্যবহার করে ওই ব্যাংকের ডিজিএম একেএম আজিজুর রহমান (মামলা চলাকালীন মৃত্যুবরণ করেন), এজিএম মো. সাইফুল হাসান, এক্সিকিউটিভ অফিসার মোহাম্মাদ আব্দুল মতিন, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার মেহেরুন্নেছা মেরী, হলমার্ক গ্রুপের জিএম তুষার আহমেদ ব্যাংক থেকে ঋণের নামে টাকা বের করার জন্য জাল পাতেন। তারা ১৪৭টি আইবিপি ভাউচারের মাধ্যমে ম্যাক্স স্পিনিং মিলস ও হলমার্ক ফ্যাশন লিমিটেডের মধ্যে ৫৮৪ কোটি টাকার সুতা রপ্তানি দেখিয়ে ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের চলতি হিসাবে (নং-৩৩০১৯৫৬৭) ৫১৫ কোটি ৬২০ লাখ ৩৮ হাজার ৬০০ টাকা জমা করে। এর মধ্যে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা হলমার্ক ডিজাইন ওয়্যার লিমিটেডের হিসাবে লেয়ারিং এবং স্থানান্তরের মাধ্যমে জমা করে আত্মসাৎ করে। এ অপরাধে আসামি এজিএম মো. সাইফুল হাসান, এক্সিকিউটিভ অফিসার মোহাম্মদ আব্দুল মতিন, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার মেহেরুন্নেছা মেরী, হলমার্ক গ্রুপের জিএম তুষার আহমেদ এবং মীর জাকারিয়া যুক্ত হন।

রায়ের আদেশে বলা হয়, হলমার্ক গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দকৃত ঋণ মঞ্জুরি লিমিট ও সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসা করার সুযোগ দিয়েছে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। হোটেল শেরাটন শাখায় ২০১১ সালে অস্বাভাবিকভাবে ঋণ ও অগ্রিম ৪৭৮% বৃদ্ধি পেলেও আইটিএফডি শাখা ২০১১ সালে কোনো পরিদর্শন কার্যক্রম গ্রহণ করেনি। বরং সাক্ষী মো. শওকত আলী, সাক্ষী মো. নুরুল ইসলাম চৌধুরী, সাক্ষী এসএইচএস আবু জাফর, সাক্ষী মো. আনিসুজ্জামানের সাক্ষ্য থেকে দেখা যায়, ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল হোটেল শেরাটন শাখা পরিদর্শন শুরু করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট টিমকে বাধা দেন ডিএমডি মাইনুল হক। তার অনুগত এজিএম সফিজ উদ্দিনকে দিয়ে পরিদর্শন করান। অথচ ওই তারিখের আগে উক্ত টিম লোকাল অফিস ও গুলশান অফিস পরিদর্শন করার সময় তিনি বাধা প্রদান করেননি।

রায়ে আরও বলা হয়, ঘটনার সময় শেরাটন শাখায় সংঘটিত অনিয়মের বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হুমায়ুন কবির জানা সত্ত্বেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। ডিজিএম মো. আজিজুর রহমানকে বিধিবহির্ভূতভাবে ৫ বৎসরের অধিককাল শাখার ম্যানেজার পদে বহাল রাখেন তিনি। এতে তিনি ব্যাংকিং নীতিমালার চরম অপব্যবহার করেন। ২০১২ সালের ২৬ জানুয়ারি ডিজিএম আবু জাফরের নেতৃত্বে এ নিয়ে একটি টিম গঠন করা হলেও ওই টিম লিডারকে শেরাটন শাখা পরিদর্শন না করে লোকাল অফিস গুলশান শাখা পরিদর্শনের জন্য নির্দেশ দেন। আর এই দুই মাসেই শেরাটন শাখায় ১৮৬০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতি হয়।

রায়ের আদেশ অংশে বলা হয়, সোনালী ব্যাংক হোটেল শেরাটন শাখা ম্যানেজার একেএম আজিজুর রহমান কর্তৃক আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য খাতে অবৈধ উপায়ে ঋণ প্রদান ও ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতি সাধন করেন। তা সত্ত্বেও সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অডিট ও পরিদর্শন-২ এর শাখা পরিদর্শক মো. কামরুল হাসান খান হোটেল শেরাটন শাখার কার্যক্রমকে উদ্দেশ্যে প্রণোদিতভাবে প্রশংসামূলক প্রতিবেদন দাখিল করেন। অথচ বিগত ২০০৯ সালের ২০ অক্টোবর শাখা পরিদর্শক মো. রফিকুল ইসলাম খান অডিট করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, শাখায় বৈদেশিক কার্যক্রমে অদূর ভবিষ্যতে বিরাট দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পূর্ববর্তী অডিটের সর্তকবার্তা আসামি মো. কামরুল হাসান খান আমলে আনেননি। উলটো প্রশংসাপূর্বক অসত্য মিথ্যা প্রতিবেদন দাখিল করেন। এভাবে ব্যাংকের কর্মকর্তারাই ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ত্বরান্বিত করেন।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ভয়ের বদলে তোয়াক্কা না করার সংস্কৃতি চালু নিয়ন্ত্রণে আসছেই না আইনশৃঙ্খলা

নিয়ন্ত্রণে আসছেই না আইনশৃঙ্খলা

উচ্ছেদ নিয়ে রণক্ষেত্র মিরপুর

উচ্ছেদ নিয়ে রণক্ষেত্র মিরপুর

প্রবেশ পাশ নিয়ে যাচ্ছে তাই অবস্থা অরক্ষিত সচিবালয়, শঙ্কা নিরাপত্তা নিয়ে

অরক্ষিত সচিবালয়, শঙ্কা নিরাপত্তা নিয়ে

সংবাদ সম্মেলনে মাহ্দী আমিন আন্তর্জাতিক পরিসরে জাতীয় স্বার্থকে অটুট রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক পরিসরে জাতীয় স্বার্থকে অটুট রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম